রসায়নশাস্ত্রের জনক যে মুসলিম বিজ্ঞানী

আপডেট : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০১:৪২ এএম

মানবসভ্যতার অগ্রযাত্রায় কিছু নাম যুগের সীমানা অতিক্রম করে আলোর মতো উজ্জ্বল হয়ে থাকে। তারা কেবল নিজেদের সময়কে প্রভাবিত করেন না, পরবর্তী শতাব্দীর চিন্তাধারাকেও গড়ে দেন নীরবে, গভীরভাবে। বিজ্ঞানের ইতিহাসে তেমনই এক উজ্জ্বল নাম মুসলিম বিজ্ঞানী জাবির ইবনে হাইয়ান। তিনি এমন এক সময়ে জন্মেছিলেন, যখন জ্ঞানচর্চা ছিল অনুসন্ধিৎসু মনের এক মহাযাত্রা। পরীক্ষাগার তখনো আধুনিক রূপ পায়নি, যন্ত্রপাতি ছিল সীমিত, কিন্তু কৌতূহল ছিল সীমাহীন। সেই সীমাহীন অনুসন্ধিৎসাকেই তিনি রূপ দেন পদ্ধতিগত গবেষণায়। পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষাকে তিনি জ্ঞানের ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। রসায়নকে রহস্যময় আলকেমির গণ্ডি থেকে বের করে আনেন বিশ্লেষণ ও প্রমাণের জগতে। তার হাত ধরেই গড়ে ওঠে গবেষণার নতুন দিগন্ত, যেখানে কল্পনার পরিবর্তে স্থান পায় যুক্তি, আর অনুমানের বদলে প্রাধান্য পায় পরীক্ষা। মুসলিম স্বর্ণযুগের জ্ঞানচর্চা যে কতটা বিস্তৃত ও প্রভাবশালী ছিল, জাবির ইবনে হাইয়ানের জীবন ও কর্ম তার উজ্জ্বল সাক্ষ্য বহন করে।

বিভিন্ন শিল্প ও পরীক্ষাগারে হাইড্রোক্লোরিক এসিড ও নাইট্রিক এসিড ব্যবহৃত হয়। হাইড্রোক্লোরিক এসিড এমন একটি শক্তিশালী এসিড, যা বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরিষ্কারক, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, ধাতুবিদ্যা এবং ওষুধ শিল্পে ব্যবহৃত হয়। এছাড়াও এটি আমাদের পাকস্থলীতেও উপস্থিত থাকে, যা খাদ্য হজমে সহায়তা করে। অন্যদিকে নাইট্রিক এসিড বিভিন্ন সার, বিস্ফোরক, রঙ, ওষুধ এবং অন্যান্য রাসায়নিক দ্রব্য তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। বিজ্ঞানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ রসায়ন। রসায়নের এই দুটো গুরুত্বপূর্ণ উপাদান যার হাতের ছোঁয়ায় আমরা পেয়েছি তার নাম জাবির ইবনে হাইয়ান।

বিজ্ঞানী জাবির ইবনে হাইয়ান ৭২২ খ্রিস্টাব্দে বর্তমান ইরানের মাশহাদ শহরের কাছাকাছি অবস্থিত তুস নগরে জন্মগ্রহণ করেন। তার পূর্ণ নাম আবু আবদুল্লাহ জাবির ইবনে হাইয়ান। তিনি আবু মুসা জাবির ইবনে হাইয়ান নামেও সুপরিচিত। অনেকে তাকে আস সুফি নামেও অভিহিত করেন। তার বাবার নাম হাইয়ান।

জাবির ইবনে হাইয়ানের পূর্বপুরুষরা আরবের দক্ষিণ অংশে বসবাস করতেন। কিন্তু তার বাবা পূর্বপুরুষদের স্থানে থাকেননি। তিনি বসবাস শুরু করেন কুফায়। কুফা একটি শহরের নাম। বর্তমানে এটি ইরাকের একটি শহর। এটি বাগদাদের ১৭০ কিলোমিটার দক্ষিণে এবং নাজাফের ১০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে অবস্থিত। শহরটি ইউফ্রেটিস নদীর তীরে অবস্থিত। জাবিরের বাবা ছিলেন একজন খ্যাতনামা চিকিৎসক। তিনি এক সময় কুফা ত্যাগ করে সপরিবারে পাড়ি জমান তুস নগরে। এই তুস নগরেই জন্ম হয় জাবির ইবনে হাইয়ানের। তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে উমাইয়া খলিফা তার বাবাকে গ্রপ্তার করেন। পরবর্তী সময়ে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ফলে তার পরিবার পুনরায় তাদের পূর্বপুরুষদের স্থানে ফিরে আসে।

জাবির ইবনে হাইয়ানের শিক্ষাজীবন শুরু হয় দক্ষিণ আরবেই। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন বইপ্রেমী। যে কোনো বিষয়ের বই পেলেই তিনি মনোযোগ দিয়ে পড়তেন। বইয়ের ওপর গবেষণা করতেন। ফলে খুব অল্প সময়ে তিনি গণিতের বিভিন্ন শাখায় পাণ্ডিত্য লাভ করেন। বড় হয়ে তিনি বাবার মতোই চিকিৎসা পেশায় আত্মনিয়োগ করেন। তৎকালীন বিখ্যাত পণ্ডিত ইমাম জাফর সাদিকের অনুপ্রেরণায় তিনি রসায়ন ও চিকিৎসা বিজ্ঞানে গবেষণা শুরু করেন। দ্রুত তার সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। তিনি বিভিন্ন বিষয়ে নতুন নতুন তথ্য ও বিভিন্ন পদার্থ আবিষ্কার করতে আরম্ভ করেন।

তিনি রসায়নশাস্ত্র গবেষণায় বিশেষভাবে মনোযোগী হন। ওই পরিপ্রেক্ষিতে তিনি একটি রসায়ন গবেষণাগারও প্রতিষ্ঠা করেন। মুসলিম ঐতিহাসিকরা ওই গবেষণাগারকে পৃথিবীর প্রথম রসায়নাগার বলে অভিহিত করেছেন। পৃথিবীর ইতিহাসে তিনিই প্রথম বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে রসায়নের প্রাথমিক প্রক্রিয়াগুলো চর্চা করার উপায় উদ্ভাবন করেন।

জাবির ইবনে হাইয়ান বস্তুজগৎকে তিন ভাগে বিভক্ত করেন। এই তিন ভাগের নামকরণ করেন তিনি স্পিরিট, ধাতু ও যৌগিক পদার্থ নামে। পরবর্তী বিজ্ঞানীরাও বস্তুজগৎকে তিন ভাগ করে নাম রাখেন বাষ্পীয়, পদার্থ ও পদার্থবহির্ভূত। জাবির ইবনে হাইয়ান নানাভাবে রাসায়নিক বিশ্লেষণের নামকরণ করেছেন। পাতন, ঊর্ধ্বপাতন, পরিস্রাবণ, দ্রবণ, গলন, বাষ্পীভবন ইত্যাদি রাসায়নিক গবেষণার কী কী রূপান্তর হয় তা তিনি বিস্তৃত বর্ণনা করেছেন। তিনি চামড়া ও কাপড়ে রঙ করার প্রণালী, ইস্পাত প্রস্তুতকরণ, লোহা, ওয়াটারপ্রুফ কাপড় বার্নিশ করার উপায় ও সোনার জলে পুস্তকে নাম লেখার জন্য লোহার ব্যবহার ইত্যাদি আবিষ্কার করেন। জাবির ইবনে হাইয়ানের মতে সোনা, রুপা, লোহা যত প্রকার ধাতু আছে কোনো ধাতুই মৌলিক নয়। এসব ধাতু পারদ আর গন্ধকের সমন্বয়ে গঠিত।

জাবির ইবনে হাইয়ান গ্রিক ভাষায় সুপণ্ডিত ছিলেন। রসায়নশাস্ত্রের পাশাপাশি তিনি চিকিৎসা, খনিজ পদার্থ বিশেষত পাথর, দর্শন, যুক্তিবিদ্যা, জ্যামিতি, জ্যোতির্বিজ্ঞান প্রভৃতি বিষয়ে অবদান রাখেন। তিনি প্রায় ২ হাজার গ্রন্থ রচনা করেন। এর মধ্যে চিকিৎসা বিষয়ে গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় ৫০০। তার রচিত গ্রন্থের সংখ্যাধিক্য নিয়ে অনেকে বিস্ময় প্রকাশ করেন। তবে সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, তার রচিত গ্রন্থগুলোর আকার নিয়ে। তার লিখিত গ্রন্থের অনেকগুলোর গড় পৃষ্ঠা মাত্র ৮-১০ এর মতো। আবার কোনো কোনোটার পৃষ্ঠা সংখ্যা মাত্র দুটি। তার গ্রন্থের বিষয় ছিল বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তিনি যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন তার ফলাফল। বিভিন্ন বিষয়ে লেখা তার গ্রন্থাবলির যে সংখ্যা পাওয়া যায়, তার মধ্যে চিকিৎসাশাস্ত্র নিয়ে লেখা বই সর্বাধিক। তারপর আছে দর্শন নিয়ে ৩০০টি, রসায়ন নিয়ে ২৬৭টি, জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে ১টি ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

জাবির ইবনে হাইয়ানের আলকেমি সংক্রান্ত গ্রিক ভাষায় কয়েকটি গ্রন্থের সন্ধান পাওয়া যায়। তবে সব গ্রন্থের আরবি পান্ডুলিপির কোনো সন্ধান মেলে না।

ইংরেজ বিজ্ঞানী হোলমার্ডের মতে, প্রায় ৩০০ বছর ধরে ইউরোপীয় আলকেমির চিন্তাধারা জাবির ইবনে হাইয়ানের উদ্ভাবিত পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করেই সম্প্রসারিত হয়। তার জীবন ও কর্মের ওপর ইউরোপীয় বেশ কজন বিজ্ঞানী গবেষণা করেন।

জাবির ইবনে হাইয়ান মুসলিম সমাজের গর্ব। এ কারণে তার নাম রসায়ন জগতে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। বিজ্ঞানের এমন কোনো শাখা নেই, যেখানে তার অবাধ বিচরণ ছিল না। তার জীবন আমাদের সামনে জ্ঞানের এক অনন্য আদর্শ উপস্থাপন করে। তিনি প্রমাণ করেছেন, অধ্যবসায় ও অনুসন্ধানী মন থাকলে সীমিত উপকরণ দিয়েও অসীম সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচিত করা যায়। তার গবেষণা শুধু কয়েকটি রাসায়নিক প্রক্রিয়া বা পদার্থের আবিষ্কারে সীমাবদ্ধ ছিল না, তিনি বিজ্ঞানের চর্চাকে দিয়েছেন শৃঙ্খলা, যুক্তি ও পরীক্ষার ভিত্তি। তার রচিত গ্রন্থ, উদ্ভাবিত যন্ত্র এবং প্রস্তাবিত তত্ত্ব পরবর্তী প্রজন্মের বিজ্ঞানীদের জন্য স্থাপন করেছে দৃঢ় ভিত। ইউরোপীয় জাগরণকালেও তার প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। আজ যখন আধুনিক পরীক্ষাগারে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে, তখনো সেই পদ্ধতিগত চিন্তার শেকড় খুঁজে পাওয়া যায় তার কাজের মধ্যে।

লেখক : ইসলামবিষয়ক গবেষক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত