পুলিশে রদবদল আসছে

প্রধানমন্ত্রীর টেবিলে কর্মকর্তাদের নাম

আপডেট : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৮:০৪ এএম

নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়ে প্রশাসনের নানা স্তরে রদবদল করার উদ্যোগ নিয়েছে। আওয়ামী লীগ ও অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বড় পদে থাকা কর্মকর্তাদের সরিয়ে দিতে সরকারের হাইকমান্ড থেকে বিশেষ নির্দেশনা গেছে বিভিন্ন দপ্তরে। এরই অংশ হিসেবে পুলিশ প্রশাসনে শিগগির বড় ধরনের রদবদল আসছে। পুলিশ কর্মকর্তাদের চূড়ান্ত নামের তালিকা ইতিমধ্যে গেছে প্রধানমন্ত্রীর টেবিলে। ওই তালিকায় রয়েছে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি), ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার, র‌্যাব মহাপরিচালক, সিআইডি ও এসবিপ্রধানের নাম।

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, নতুন সরকারের অগ্রাধিকার-দ্রুত আস্থা পুনর্গঠন, বাহিনীর ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার এবং রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা। এ লক্ষ্য সামনে রেখে শীর্ষ পদে সম্ভাব্য পরিবর্তনের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির নতুন সরকার গঠনের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ পদে বড় ধরনের রদবদলের জোরালো গুঞ্জন উঠেছে। পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি), ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার এবং র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) মহাপরিচালক এ তিনটি কৌশলগত শীর্ষ পদ ঘিরে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও বলেছেন, ‘নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর পুলিশের উচ্চপর্যায়ে কিছু পরিবর্তন আসবেই। তবে প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার কারণে কিছুটা সময় লাগতে পারে।’

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ২০২৪ সালের ২০ নভেম্বর বর্তমান আইজিপি বাহারুল আলমকে দুই বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়। তার মেয়াদের এখনো প্রায় ৯ মাস বাকি। তবে সরকার তার চুক্তি বাতিল বা পুনর্বিন্যাস করতে পারে এমনটাই বলছেন সংশ্লিষ্ট অনেকেই। আইজিপি বাহারুল আলম ইতিমধ্যে পদত্যাগের কথা মন্ত্রণালয়কে অবহিত করেছেন।

এদিকে নতুন আইজিপি হিসেবে আলোচনায় আছেন তিন অতিরিক্ত আইজিপি। তাদের মধ্যে রয়েছেন হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি দেলোয়ার হোসেন মিঞা, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) অতিরিক্ত আইজিপি আলী হোসেন ফকির ও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. ছিবগাত উল্লাহ। পাশাপাশি অবসরে যাওয়া পুলিশ কর্মকর্তা আনছার উদ্দিন খান পাঠানের নাম জোরেশোরে উত্থাপিত হচ্ছে।

আইজিপিসহ আরও কয়েকটি পদের জন্য ১০ জনের নাম প্রধানমন্ত্রীর টেবিলে আছে বলে জানান পুলিশ সদর দপ্তরে ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা। ওই কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসেন মিঞা, আলী হোসেন ফকির ও মো. ছিবগাত উল্লাহর নাম উল্লেখ করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ তিনজনই পেশাগত দক্ষতা, জ্যেষ্ঠতা ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতায় এগিয়ে। সরকার চাইলে তাদের যেকোনো একজনকে আইজিপি করতে পারে।’

তিনি আরও বলেন, “তিনজনের একজনকে আইজিপি করে অন্যদের মধ্যে কাউকে র‌্যাবের মহাপরিচালক বা গুরুত্বপূর্ণ অন্য কোনো পদে বসানো হতে পারে। এ ছাড়া ‘ভূতাপেক্ষ’ (অবসরে যাওয়া) আইজিপি হিসেবে দুই অতিরিক্ত আইজিপি মতিউর রহমান শেখ ও আনসার উদ্দিন খান পাঠানের নামও আলোচনায় রয়েছে। যদিও অবসরে যাওয়া কর্মকর্তাদের পুনর্নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক বিবেচনা জটিল হয়ে উঠেছে। আর আমরাও চাই না কোনো অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা পুলিশে ফিরে আসুক।”

এদিকে পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর র‌্যাবের কার্যক্রম ও ভাবমূর্তি নিয়ে সমালোচনা বাড়ে। সেই প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকার চৌকস কর্মকর্তা শহিদুর রহমানকে র‌্যাবের মহাপরিচালক পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়। আগামী ১৫ মার্চ তার মেয়াদ শেষ হচ্ছে। নতুন সরকার র‌্যাবের কার্যক্রম পুনর্মূল্যায়ন করছে। বিশেষ করে মানবাধিকার ইস্যু, জবাবদিহি ও গোয়েন্দা সমন্বয় জোরদারের প্রশ্নে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি আসতে পারে। ফলে র‌্যাবের নেতৃত্বেও পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, র‌্যাব ঘিরে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যে চাপ রয়েছে, তা মোকাবিলায় কূটনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য এবং প্রশাসনিকভাবে দক্ষ একজন কর্মকর্তাকে সামনে আনতে চাইবে সরকার।

সূত্র আরও জানায়, ঢাকা মহানগর পুলিশ দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কেন্দ্রের নিরাপত্তা সামলায়। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের প্রথম কয়েক মাসেই রাজধানীতে রাজনৈতিক কর্মসূচি, সম্ভাব্য প্রতিবাদ বা পাল্টা কর্মসূচি বাড়তে পারে। ফলে ডিএমপি কমিশনার পদটিও বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।

সরকারের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, নতুন সরকারের ১৮০ দিনের বিশেষ কর্মসূচির মধ্যে প্রথম ১০০ দিনের কর্মপরিকল্পনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখা অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে পুলিশ ও র‌্যাবের নেতৃত্বে যে সিদ্ধান্তই আসুক, তা হবে রাজনৈতিক বার্তা ও প্রশাসনিক বাস্তবতার সমন্বয়ে নেওয়া একটি কৌশলগত পদক্ষেপ।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক অতিরিক্ত সচিব বলেন, আইজিপি পদের সঙ্গে সমন্বয় রেখে ডিএমপি কমিশনার পদেও রদবদল হতে পারে। কারণ, সরকারের ভাবমূর্তি অনেকাংশে নির্ভর করে রাজধানীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর। তাই এখানে বিশ্বস্ত ও অভিজ্ঞ নেতৃত্ব চাইবে সরকার।

বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সরকার যদি অতিরিক্ত রাজনৈতিক বিবেচনায় পদায়ন করে, তাহলে বাহিনীর পেশাদারিত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আবার সম্পূর্ণ স্থিতাবস্থা বজায় রাখলেও রাজনৈতিক সমর্থকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হতে পারে। ফলে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাধানই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর পথ।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার হাতিয়ার বানানো হলে দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে বিশ্বস্ততা ও পেশাদারিত্বের সমন্বয় ঘটানো।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ইতিমধ্যে পুলিশ বিভাগে শীর্ষ পদে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছেন। প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে শিগগির এসব পদে রদবদল দৃশ্যমান হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়া ও রাজনৈতিক আলোচনার বিষয়টি সময়সাপেক্ষ। সরকার নতুনভাবে কাউকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিতে চাইছে না বলে সূত্রে জানা গেছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত