বিদ্যমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ীদের সংগঠন ঢাকা চেম্বার সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেছেন, উচ্চ সুদহার, ভঙ্গুর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও চাঁদাবাজি, জ¦ালানির অনিশ্চয়তা এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়হীনতা দেশের অর্থনীতির জন্য আত্মঘাতী।
গতকাল সোমবার রাজধানীর মতিঝিল ডিসিসিআই অডিটরিয়ামে নবগঠিত সরকারের কাছে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) প্রত্যাশা শীর্ষক সংবাদ সম্মেলন তিনি এ মন্তব্য করেন। এ সময় তাসকীন আহমেদ আর্থিক খাত, জ¦ালানি, শিল্পায়ন, শুল্কায়ন, লজিস্টিক অবকাঠামো, কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়ন, এলডিসি উত্তরণ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক চুক্তি স্বাক্ষর প্রভৃতি বিষয়ে তথ্যচিত্রের মাধ্যমে উপস্থাপন করেন।
ডিসিসিআই সভাপতি বলেন, অপরিবর্তিত পলিসি রেটের কারণে ব্যবসায়ীদের ১৬-১৭ শতাংশ হারে ব্যাংকঋণ নিতে হচ্ছে, সেই সঙ্গে খেলাপি ঋণের উচ্চহার এবং ঋণ শ্রেণীকরণের সীমা ৯ মাস থেকে তিন মাসে নামিয়ে আনার কারণে সৃষ্ট আর্থিক খাতে অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি শিল্প খাতে অস্থিরতা তৈরি করেছে। শিল্প-কারখানায় চাহিদামাফিক গ্যাস সরবরাহ না থাকার পাশাপাশি গ্যাসের দাম নতুন শিল্প ও ক্যাপটিভের ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিটে যথাক্রমে ৪০ ও ৪২ টাকা বৃদ্ধির কারণে আমাদের পণ্য উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, যা স্থানীয় চাহিদা ও রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে, ফলে সামগ্রিক বাণিজ্যিক ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে তিনি মতপ্রকাশ করেন। এ ছাড়া শিল্পবিষয়ক নীতিমালার ধারাবাহিকতার অনুপস্থিতি, ভঙ্গুর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, বিশেষ করে অসহনীয় চাঁদাবাজির বিষয়টি স্থানীয় ও বৈদেশিক বিনিয়োগ এবং ব্যবসা-বাণিজ্য কার্যক্রম পরিচালনায় আস্থাহীনতা তৈরি করেছে।
দেশের সামগ্রিক রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অটোমেটেড না হওয়ায় রাজস্ব প্রদানে ব্যক্তিশ্রেণির পাশাপাশি ব্যবসায়ীরা অনেক ক্ষেত্রেই অহেতুক হয়রানির শিকার হচ্ছেন, অনেকেই করজালের বাইরে থাকায় সরকার রাজস্বপ্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সেই সঙ্গে সরকারের রাজস্ব আহরণের গতি সøথ হচ্ছে। তিনি জানান, দেশের লজিস্টিক খাতে ব্যয় বৃদ্ধি, জমি অধিগ্রহণের দীর্ঘসূত্রতা ও জমির উচ্চমূল্য, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ কর্তৃক বিভিন্ন সেবার হার গড়ে ৪১ শতাংশ বাড়ানো, অভ্যন্তরীণ নদীপথের কার্যকর ব্যবহার না থাকার কারণে ব্যবসা পরিচালন ব্যয় কয়েক গুণ বৃদ্ধি পাচ্ছে, যার ফলে পণ্য উৎপাদন ও বিতরণ ব্যয় বাড়ছে, যেটি মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে।
এলডিসি উত্তরণ বিষয়ে তিনি বলেন, আংকটার্ডের হিসাব অনুযায়ী এর ফলে বাংলাদেশের রপ্তানি ৫ দশমিক ৫-৭ শতাংশ হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে, যার পরিমাণ প্রায় ২ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও স্থানীয় অর্থনীতির বিদ্যমান অবস্থা বিবেচনার আমাদের রপ্তানি খাতের বড় ধরনের নেতিবাচক অগ্রগতি কোনোভাবেই কাম্য নয় বলে তিনি মত প্রকাশ করেন। সেই সঙ্গে বিদ্যমান পরিস্থিতি বিবেচনায় বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ কমপক্ষে তিন বছর পিছিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণের সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তির বিষয়ে ডিসিসিআই সভাপতি বলেন, এর ফলে তৈরি পোশাক খাতে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকারের বিষয়টি নিশ্চিত হবে না। এ ছাড়া এলএনজিসহ অন্যান্য পণ্য আমদানিতে শর্তারোপের কারণে আমাদের ব্যবসা পরিচালনা ব্যয় বৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখা দেবে। তাই যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের সঙ্গে পুনঃআলোচনার মাধ্যমে চুক্তির শর্তাবলি সংশোধনের জন্য নতুন সরকারের প্রতি জোরারোপ করেন তাসকীন আহমেদ।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের প্রশ্নোত্তরকালে ঢাকা চেম্বার সভাপতি তাসকীন আহমেদ দেশে চাঁদাবাজি নিরসন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নে নবনির্বাচিত সরকারকে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান। পাশাপাশি তিনি উল্লেখ করেন, দেশের ২০ লক্ষাধিক শিক্ষিত তরুণ বেকার, কর্মসংস্থানের অভাবে অনেকেরই অবৈধ কর্মকা-ে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে, বিষয়টি মোকাবিলায় তরুণদের শুধু চাকরির ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর লক্ষ্যে দক্ষতা উন্নয়ন ও ব্যবসায়ী কার্যক্রমে সম্পৃক্ত হওয়ার শর্তাবলি সহজীকরণে সরকারকে আরও উদ্যোগী হওয়ার ওপর জোরারোপ করেন। সেই সঙ্গে স্টার্টআপ ব্যবসাকে সহজতর করতে বিশেষ করে তরুণদের সহজশর্তে ঋণপ্রাপ্তির বিষয়টি নিশ্চিতকরণে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
এই সংবাদ সম্মেলনে ডিসিসিআই ঊর্ধ্বতন সহসভাপতি রাজিব এইচ চৌধুরী এবং সহসভাপতি মো. সালিম সোলায়মানসহ পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
