মন্দ অভ্যাস দূর করার মৌসুম

আপডেট : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৮:০০ এএম

রমজান মাসে আমরা ধৈর্য ধারণ করতে শিখি। শিখি প্রবৃত্তি দমনের কঠিন ও সুশৃঙ্খল কৌশল। রবের সান্নিধ্য লাভের এক অপার আনন্দ মিশে থাকে প্রতিটি দিনের প্রতিটি মুহূর্তে। আলস্য ঝেড়ে ফেলে ঐকান্তিক ইবাদতে মগ্ন হওয়ার জোরালো ডাক দেয় এই মাস। পবিত্র কোরআনের আলোয় আলোকিত হয় জীবন। রমজান এমন এক পাঠশালা, যেখানে প্রকৃত মুত্তাকি হওয়ার সবক দেওয়া হয় পরম যত্নে। নিজেকে রবের তরে সঁপে দেওয়ার এক নিরন্তর সাধনা চলে এই পবিত্র সময়ে। প্রতিটি মানুষ যেন তার ভেতরের কালিমা মুছে ফেলে এক আলোকিত সত্তা হয়ে উঠতে পারে, সেই অমূল্য সুযোগ নিয়ে আসে এই মাস।

রোজা রাখার সুবিধা হলো, রোজাদার বৈধ অনেক কিছু বর্জনের অভ্যাসে যখন অভ্যস্ত হন, তখন হারাম কাজ ও অভ্যাস বর্জন তার জন্য অনেক সহজ হয়ে যায়।

রোজাদার যেহেতু দিনে উপবাস থাকেন, তাই রমজান হচ্ছে মন্দ অভ্যাস চিরতরে দূর করার উপযুক্ত সময়। রমজানের সময় ধূমপান ও চিনিযুক্ত খাবার ভোজনের মতো মন্দ অভ্যাসগুলোকে প্রশ্রয় দেওয়া উচিত নয় এবং এসব থেকে বিরত থাকলে মানুষের শরীর ধীরে ধীরে এদের অনুপস্থিতি মেনে নিতে সক্ষম হবে ও এক সময় এসবের আসক্তি চিরতরে দূর হয়ে যাবে। মানুষের এসব মন্দ অভ্যাস থেকে দূরে রাখতে রোজার ক্ষমতার তাৎপর্য এতই যে, যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস ধূমপান ত্যাগের জন্য রমজান মাসকে আদর্শ সময় হিসেবে অভিহিত করেছে।

রমজান মাস ভালো অভ্যাস আয়ত্ত করারও মৌসুম। রোজার মাসে তো বটেই, বছর জুড়ে এই অভ্যাসগুলো থাকা ভালো। ওইসব অভ্যাস হতে পারে, প্রতিদিন কোরআন মাজিদ তেলাওয়াত করা, জিকির-আজকার করা, নফল ইবাদতে অভ্যস্ত হওয়া। আলেমরা বলেন, রমজান মাস জুড়ে অল্প অল্প করে কোরআন তেলাওয়াত করতে হবে। যদি নিয়ত থাকে খতম দেওয়ার, তাহলে প্রতি ওয়াক্তে পাঁচ পৃষ্ঠা করে পড়া যায়। তাহলে প্রতিদিন ২৫ পৃষ্ঠা এবং মাস শেষ হওয়ার আগেই একটি খতম হয়ে যাবে।

রমজানে তাহাজ্জুদের অভ্যাস করা উচিত। সাধারণত রোজার মাসে ঘুমাতে দেরি হয়। আবার সাহরির সময়ও দেখা যায় অনেকে আগে আগে ওঠেন। এ সময়টা কাজে লাগানো যায়। ফজরের আগমুহূর্তটা দোয়া কবুলের সময়। এ সময় তাহাজ্জুদের নামাজ পড়া যায়। প্রথমে ২ রাকাত কিংবা ৪ রাকাত নামাজ দিয়েই শুরু করা যায়।

এ মাসে সুন্নত ও নফল নামাজের প্রতি যত্নবান হওয়া উচিত। প্রতি ওয়াক্ত ফরজ নামাজের আগে বা পরের বেশ কিছু সুন্নত নামাজ রয়েছে। সারা বছর বিভিন্ন ব্যস্ততা বা অলসতার কারণে অনেক সময় সেগুলো নিয়মিত আদায় করা হয় না। সেগুলো আদায়ের অভ্যাস করা।

ইবাদতের মৌসুম এই রমজানে নামাজ শেষে জিকির-আজকার করা এবং ফরজ নামাজ শেষে কিছু দোয়া আছে, সেগুলো করা। জিন-শয়তান থেকে নিরাপত্তা, কাজে, কর্মে ও রিজিকে বরকত লাভ ইত্যাদি ক্ষেত্রে এই আমলগুলো বেশ কার্যকর। প্রতি ওয়াক্তে সর্বোচ্চ ১০ মিনিট লাগে এগুলো করতে। এগুলো নিয়মিত করা যেতে পারে। সেই সঙ্গে সকাল-সন্ধ্যার জিকিরগুলো করা। আল্লাহর রাসুল (সা.) সকাল-সন্ধ্যার কিছু জিকির শিখিয়ে গেছেন, যেগুলো অনেক ফজিলতপূর্ণ। রোজার মাসে এগুলো অভ্যাসে পরিণত করা যায়। হিসনুল মুসলিম বা বিভিন্ন দোয়ার বইতে সেগুলো পাওয়া যাবে।

মনে রাখতে হবে, আখিরাত ও বিচার দিবসের প্রতি সুনিশ্চিত বিশ্বাস মানুষকে সদাসচেতন এবং সব ধরনের পাপাচার থেকে দূরে রাখার জন্য যথেষ্ট। পবিত্র কোরআনে বার বার এই দিনটির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন মহান আল্লাহ। আর আল্লাহর স্মরণ মানুষকে যাবতীয় অন্যায়-অনাচার থেকে দূরে রাখে। আল্লাহকে ভালোভাবে চিনলে ও জানলে মানুষ আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করবে। আর আল্লাহকে চেনা ও জানার ভালো উপায় হলো, নিজেকে আমলের মাঝে ডুবিয়ে রাখা।

সুরা আনফালের দ্বিতীয় আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘যারা ইমানদার, তারা এমন যে, যখন আল্লাহর নাম নেওয়া হয় তখন ভীত হয়ে পড়ে তাদের অন্তর। আর যখন তাদের সামনে পাঠ করা হয় কালাম, তখন তাদের ইমান বেড়ে যায় এবং তারা নিজ পরওয়ারদেগারের প্রতি ভরসা পোষণ করে।’ এই আয়াতের আলোকে ভেবে দেখা উচিত, সারা দিনে আল্লাহর নাম আমরা যতবার শুনি, ততবার বা একবারও কী আমাদের মন কেঁপে ওঠে? আসলে আল্লাহকে ভালোভাবে চিনি না ও জানি না বলেই আমাদের এই অবস্থা! মহান আল্লাহ যেন আমাদেরকে সবসময় তার প্রতি সচেতন হওয়ার তথা মুত্তাকি হওয়ার তওফিক দান করেন। আমিন।

লেখক : ইমাম ও খতিব, দারোগা আমীর উদ্দিন ঘাট মসজিদ, বাবুবাজার, ঢাকা

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত