বান্দা ও প্রভুর মধ্যে দূরত্ব ঘুচিয়ে নৈকট্য অর্জনের মাস রমজান। যে এই সুযোগকে গুরুত্ব দেয়, সে লাভবান হয়। আর যে অবহেলা করে, তার জন্য থাকে আক্ষেপের দীর্ঘশ্বাস। রমজানের প্রতিটি মুহূর্ত গুরুত্বপূর্ণ, তাই প্রতিটি মুহূর্ত সচেতন হৃদয়ে ধারণ করা জরুরি। হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, হজরত সালমান ফারসি (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) শাবান মাসের শেষ দিন আমাদের মধ্যে খতিব হিসেবে দাঁড়ালেন এবং বললেন (মাহে রমজান) এমন একটি মাস যার প্রথম ভাগ রহমত, মধ্যবর্তী ভাগ মাগফেরাত (ক্ষমা) আর শেষ ভাগে জাহান্নাম থেকে (নাজাত) মুক্তি দেওয়া হয়। (ইবনে খুজাইমা ৩/১৯১)
আজ রমজানের দশম দিন। সে হিসেবে রহমতের ভাগের শেষ দিন। আগামীকাল থেকে শুরু মাগফিরাতের অংশ।
মাগফিরাত অর্থ মাফ, মার্জনা, আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা ও গুনাহ থেকে নিষ্কৃতি লাভ। সাধারণভাবে বলা হয়, রমজানের প্রথম ১০ দিন আল্লাহ তার বান্দাদের প্রতি দয়া বণ্টন ও বিতরণ করতে থাকবেন। দ্বিতীয় ১০ দিন আল্লাহ তার বান্দাদের ক্ষমা করতে থাকবেন। শেষ ১০ দিন আল্লাহ তার বান্দাদের জাহান্নাম থেকে নাজাত বা মুক্তি দিতে থাকবেন।
তওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা দ্বারা আল্লাহর সঙ্গে বান্দার সম্পর্ক মজবুত হয়। তাই প্রত্যেক মুমিন-মুসলমানের উচিত মাগফিরাতের এই দশকে বেশি বেশি করে আল্লাহর দরবারে তওবা এবং গুনাহ মাফের জন্য চোখের পানি ফেলে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘বলুন, হে আমার বান্দারা! তোমরা যারা নিজেদের প্রতি অবিচার করেছ, আল্লাহর অনুগ্রহ থেকে হতাশ হয়ো না, নিশ্চয় আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা জুমার ৫৩)
আয়াতে স্পষ্টভাবে আল্লাহর করুণা থেকে নিরাশ না হতে বলা হয়েছে। আশ্বস্ত করা হয়েছে, নিশ্চয় আল্লাহ সমস্ত পাপ মাফ করে দেবেন। তিনিই ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু। ইসলামি স্কলারদের মতে, এর মাধ্যমে আল্লাহতায়ালা তার বান্দাদের যেন আশ্বস্ত করেছেন যে, রমজানের রহমতের দশক শেষ হয়েছে তো কী হয়েছে, আল্লাহর রহমত তো ফুরিয়ে যায়নি। রমজানের এই মোবারক সময়ে নিজেকে পবিত্র করার সুযোগ থেকে আমরা কেউই বঞ্চিত হতে চাই না। তাই মাগফিরাত আর নাজাতের সময়কেও অতীব গুরুত্ব দিয়ে নিজেকে আমলের বাতাবরণে ডুবিয়ে রাখতে হবে।
অনেকেই রমজানের শেষ প্রহরে আফসোস করে বলি, হায়, রমজান চলে গেল, কিছুই করতে পারলাম না। জানি না, মাগফেরাতের নেয়ামত লাভ করতে পারলাম কি না! শেষে আফসোস না করে, শুরুতেই সচেতন হওয়া কাম্য। সেই সঙ্গে স্মরণে রাখা নবীজির এ হাদিস। হজরত জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, একবার নবী কারিম (সা.) মিম্বারে আরোহণ করলেন। প্রথম ধাপে উঠে বললেন, আমিন। দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাপে উঠেও বললেন, আমিন। সাহাবিরা জিজ্ঞাসা করলেন, আল্লাহর রাসুল! আপনাকে (এভাবে) তিনবার আমিন বলতে শুনলাম।
তখন নবীজি (সা.) বললেন, আমি যখন মিম্বারের প্রথম সিঁড়িতে আরোহণ করলাম তখন হজরত জিবরাইল (আ.) আগমন করলেন এবং বললেন, ওই ব্যক্তি হতভাগা, যে রমজান মাস পেল, আর রমজান গত হয়ে গেল, কিন্তু তার গুনাহ মাফ হলো না। আমি বললাম, আমিন। (সহিহ বুখারি ৬৪৪)
নবীজি (সা.) তো কখনো আমাদের ধ্বংস চাইবেন না। তিনি চেয়েছেন এমন অবারিত সুযোগকে যেন আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করি। রমজানের মধ্যভাগের শুরুতেই পরিকল্পনা গ্রহণ করি। এ সময়ের গুরুত্ব অনুধাবন করে অবশিষ্ট দিনগুলো যথাযথ কাজে লাগাই। মনে রাখতে হবে, রোজাদার ব্যক্তি আল্লাহর কাছে এতটাই মহব্বতের পাত্র যে, সে কিছু চাইলে আল্লাহ তা দেন। নবীজি (সা.) বলেন, তিন ব্যক্তির দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। এক. রোজাদারের দোয়া ইফতার পর্যন্ত। দুই. ন্যায়পরায়ণ শাসকের দোয়া। তিন. মজলুমের দোয়া। আল্লাহ এ দোয়াকে মেঘমালার ওপরে নিয়ে যান। এর জন্য আসমানের দরজাসমূহ খুলে দেন। রব বলেন, আমার ইজ্জতের কসম, বিলম্বে হলেও আমি তোমাকে সাহায্য করব। (জামে তিরমিজি ৩৫৯৮)
লেখক : ইমাম ও খতিব, দারোগা আমীর উদ্দিন ঘাট মসজিদ, বাবুবাজার, ঢাকা
