মানুষের জীবন এক রহস্যময় যাত্রা। এই পথে চড়াই-উতরাই থাকবেই। কখনো আলোর ঝলকানি, আবার কখনো নিরেট অন্ধকার। অস্থির এই সময়ে হৃদয়ের প্রশান্তি খোঁজা অত্যন্ত জরুরি। মহান স্রষ্টার প্রতি অটুট বিশ্বাসই মানুষকে স্থির রাখতে সক্ষম। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একটি অমূল্য উপদেশ আমাদের সেই কাক্সিক্ষত পথ দেখায়। কিশোর সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-কে দেওয়া সেই চিরন্তন বার্তা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। ইমানের শক্তি দিয়ে সব প্রতিকূলতা জয়ের এক অনন্য দর্শন লুকিয়ে আছে সেই বর্ণনায়।
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, কোনো এক সময় আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পেছনে ছিলাম। তিনি বলেন, হে তরুণ! আমি তোমাকে কয়েকটি কথা শিখিয়ে দিচ্ছি, তুমি মহান আল্লাহর বিধিনিষেধ রক্ষা করবে, মহান আল্লাহ তোমাকে রক্ষা করবেন। তুমি আল্লাহর সন্তুষ্টির প্রতি লক্ষ রাখবে, আল্লাহকে তুমি কাছে পাবে। তোমার কোনো কিছু চাওয়ার প্রয়োজন হলে আল্লাহর কাছে চাও, আর সাহায্য প্রার্থনা করতে হলে আল্লাহর কাছেই করো। আর জেনে রাখো, যদি সব উম্মতও তোমার কোনো উপকারের উদ্দেশ্যে ঐক্যবদ্ধ হয়, তাহলে ততটুকু উপকারই করতে পারবে, যতটুকু আল্লাহ তোমার জন্য লিখে রেখেছেন। অন্যদিকে যদি সব উম্মত তোমার কোনো ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে একতাবদ্ধ হয়, তাহলে ততটুকু ক্ষতিই করতে সক্ষম হবে, যতটুকু আল্লাহ তোমার তাকদিরে লিখে রেখেছেন। কলম তুলে নেওয়া হয়েছে এবং লিখিত কাগজসমূহও শুকিয়ে গেছে। (তিরমিজি ২৫১৬)
রাসুলুল্লাহ (সা.) এখানে প্রথম যে বিষয়টি শিখিয়েছেন তা হলো, আল্লাহর হুকুমের হেফাজত করা। যখন কোনো বান্দা আল্লাহর নির্ধারিত বিধিনিষেধ মেনে চলে, তার নাফরমানি থেকে বিরত থাকে এবং তার ইবাদতে মগ্ন হয়, তখন আল্লাহ সেই বান্দার যাবতীয় বিষয়ের জিম্মাদার হয়ে যান। আল্লাহর সন্তুষ্টির ওপর দৃষ্টি রাখলে মানুষ সব পরিস্থিতিতেই স্রষ্টাকে নিজের সবচেয়ে কাছে অনুভব করে। এই আধ্যাত্মিক নৈকট্য মানুষকে একাকিত্ব থেকে মুক্তি দেয় এবং বিপদে ধৈর্য ধরার শক্তি জোগায়। আল্লাহর বিধিনিষেধ রক্ষা করা বলতে বোঝায় তার ফরজ বিধানগুলো যথাযথভাবে পালন করা এবং হারাম কাজ থেকে বেঁচে থাকা।
হাদিসের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, কেবল আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া। মানুষের স্বভাব হলো অভাব বা সংকটে অন্যের দ্বারস্থ হওয়া। কিন্তু রাসুল (সা.) আমাদের শিখিয়েছেন সার্বভৌম ক্ষমতার উৎস একমাত্র আল্লাহ। কোনো সৃষ্টি অন্য কোনো সৃষ্টির চূড়ান্ত ক্ষতি বা উপকার করার ক্ষমতা রাখে না। যদি সারা বিশ্বের মানুষ এক হয়ে আপনার কোনো উপকার করতে চায়, তারা ততটুকুই পারবে যতটুকু আল্লাহ আগে থেকেই লিখে রেখেছেন। আবার সবাই মিলে ক্ষতি করতে চাইলেও আল্লাহর অনুমতির বাইরে এক চুলও নড়াচড়া করতে পারবে না।
সবশেষে তাকদির বা ভাগ্যের অমোঘ বিধানের কথা বলা হয়েছে। কলম তুলে নেওয়া হয়েছে এবং লিখিত কাগজসমূহ শুকিয়ে গেছে, এই বাক্যটি ইমানদারের জন্য সান্ত্বনার। যা আপনার কাছে পৌঁছানোর ছিল না, তা কখনো আসবে না, আর যা আপনার ভাগ্যে ছিল তা কখনো আপনার থেকে বিচ্যুত হবে না। এই বিশ্বাস মানুষকে অহেতুক দুশ্চিন্তা ও মানসিক চাপ থেকে রক্ষা করে। যখন আমরা জানি, সবকিছু আল্লাহর নিয়ন্ত্রণে, তখন হারানোর ভয় বা পাওয়ার অতৃপ্তি আমাদের বিচলিত করতে পারে না। জীবনের প্রতিটি পরীক্ষায় এই বিশ্বাসই কাজে লাগে।
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর বর্ণিত এই হাদিসটি জীবন পরিচালনার এক চিরন্তন গাইড লাইন। এটি আমাদের শেখায়, আল্লাহর প্রতি অবিচল থাকতে এবং মানুষের ওপর মুখাপেক্ষিতা কমাতে। জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে যদি আমরা এই দর্শন ধারণ করতে পারি, তবে আমাদের ইহকাল হবে শান্তিময়, আর পরকাল হবে সফল। আল্লাহর সুরক্ষা পাওয়ার প্রধান শর্তই হলো তার আনুগত্যের পরিমণ্ডলে থাকা। এই সত্যটুকু হৃদয়ে গেঁথে নিতে পারলে কোনো পার্থিব ঝড়ই আমাদের ইমানি স্তম্ভকে নাড়াতে পারবে না। তাই আসুন, আমরা আমাদের সব চাওয়া-পাওয়া এবং ভয়-ভীতি একমাত্র স্রষ্টার চরণে সমর্পণ করি।
লেখক : ইসলামবিষয়ক গবেষক
