রমজান মাসের আগমন ঘটে ভ্রাতৃত্ব ও সহমর্মিতার সওগাত নিয়ে। উপবাসের ক্লান্তিতে যখন জঠরজ্বালা অনুভূত হয়, তখন অন্তরে জেগে ওঠে ক্ষুধার্ত মানুষের প্রতি গভীর মমতাবোধ। এই মমতাই মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে আর্তমানবতার সেবায় নিবেদিত হতে। ইসলামের দৃষ্টিতে রমজানে দানের মাহাত্ম্য অপরিসীম, যা দাতার সম্পদকে পবিত্র করে এবং পরকালের পাথেয়কেও করে সমৃদ্ধ। রমজানের প্রতিটি ক্ষণ নেক আমলের পাল্লা ভারী করার এক সুবর্ণ সুযোগ, আর এই সুযোগের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম হলো অকাতরে দান-সদকা করা।
হাদিসের বর্ণনায় মহানবী (সা.)-এর বদান্যতার যে অনন্য দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়, তা প্রতিটি মুসলিমের জন্য আলোকবর্তিকা। লোকচক্ষুর অন্তরালে কিংবা প্রকাশ্যে, যেভাবেই হোক না কেন, দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো এ মাসের অন্যতম চেতনা। নিঃস্ব মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের দুঃখ ভাগ করে নেওয়ার মাধ্যমে যে অনাবিল প্রশান্তি অর্জিত হয়, তা অন্য কোনোভাবে সম্ভব নয়। তাই রমজানের পবিত্রতাকে ধারণ করে ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত এবং মানবিক মূল্যবোধকে শানিত করাই হোক আমাদের সংকল্প।
রমজানে দানের ফজিলত অনেক বেশি। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) মাহে রমজানে অধিকহারে দান করতেন। হাদিসে এসেছে, হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দানশীল, আর রমজানে তার দানশীলতা আরও বেড়ে যেত। (সহিহ মুসলিম ৬১৪৯)
নবী কারিম (সা.) নিজে দান করে উম্মতদের শিক্ষা দিয়েছেন রমজান মাসে দান ও বদান্যতার হাত সম্প্রসারিত করতে। কারণ রমজান মুমিনের আমলের বসন্তকাল। দানের ফজিলত প্রসঙ্গে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, দান করলে মানুষের সম্পদ কমে না বরং সম্পদ আরও বাড়ে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা যদি প্রকাশ্য দান-সদকা করো, তাহলে তা কতই না উত্তম। আর যদি তা গোপনে গরিব ও অভাবীদের দিয়ে দাও, তবে তা তোমাদের জন্য আরও উত্তম।’
রমজানের রোজা ফরজ করার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো গরিব-দুঃখী মানুষের কষ্ট অনুভব করা। যারা প্রাচুর্যের মধ্যে জীবনযাপন করেন তারা সারা বছর ক্ষুধা ও পিপাসার যন্ত্রণা না বুঝলেও অন্তত রমজানে কিছুটা অনুভব করেন। রমজান মাসে আল্লাহতায়ালা প্রতিটি নফল কাজের সওয়াব ৭০ গুণ বাড়িয়ে দেন। সে হিসাবে রমজানে এক টাকা দান করলে ৭০ টাকা দানের সওয়াব লাভ হবে। এজন্য আমাদের রমজানে বেশি বেশি দান-সদকা করা উচিত।
দানের ক্ষেত্রে আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। দান দাতার ইহকালীন ও পরকালীন সম্মান ও গৌরব বৃদ্ধি করে, তাই তা সযতেœ প্রদান করা। সম্পদ ব্যয়ের সর্বশ্রেষ্ঠ খাত পিতা-মাতা। পিতা-মাতা ও ছেলেমেয়ে ছাড়া অন্য সব আত্মীয়স্বজনকে ফেতরা ও জাকাত প্রদান করা যায়। আত্মীয়দের মধ্যে ভাইবোনের হক সবচেয়ে বেশি। পাশাপাশি শ্বশুর-শাশুড়ি ও বৈবাহিক সূত্রে আত্মীয় যারা, তাদেরও অগ্রাধিকার রয়েছে। রমজানে, ঈদে, কোরবানি ও নানা উপলক্ষে তাদের হাদিয়া দেওয়া সুন্নত। সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিরা দয়াদাক্ষিণ্য ও করুণা গ্রহণে কুণ্ঠাবোধ করেন, তাই তাদের উপহার-উপঢৌকন হিসেবে দেওয়াই সমীচীন। এটাই দানের শ্রেষ্ঠ পদ্ধতি। জাকাত-ফেতরা উল্লেখ না করেও দেওয়া যায়, যাতে গ্রহীতা বিব্রত না হন।
মহান আল্লাহ বলেন, ‘যদি তোমরা দান প্রকাশ্যে করো তবে তা উত্তম, আর যদি তা গোপন করো এবং অভাবীদের দাও, তবে তা তোমাদের জন্য শ্রেয়। এর মাধ্যমে আল্লাহ তোমাদের মন্দগুলো মোচন করে দেবেন। তোমরা যা করো, আল্লাহ তা অবগত আছেন।’ (সুরা বাকারা ২৭১)
ইসলামের শিক্ষা হলো দান করে খোঁটা দিতে নেই। এতে দানের ফজিলত বিনষ্ট হয়। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘সদ্ব্যবহার, সুন্দর কথা ওই দান অপেক্ষা উত্তম, যার পেছনে আসে যন্ত্রণা। আল্লাহতায়ালা ঐশ্বর্যশালী ও পরম সহিষ্ণু। হে মুমিনরা! তোমরা খোঁটা দিয়ে ও কষ্ট দিয়ে তোমাদের দানকে বাতিল করো না তাদের মতো, যারা তাদের সম্পদ ব্যয় করে লোক দেখানোর জন্য এবং তারা আল্লাহ ও পরকাল বিশ্বাস করে না।’ (সুরা বাকারা ২৬৩-২৬৪)
নবী কারিম (সা.) বলেন, ‘খোঁটাদানকারী বেহেশতে প্রবেশ করতে পারবে না।’ (জামে তিরমিজি) আল্লাহতায়ালা সবাইকে সহমর্মিতা, সহানুভূতি ও সহযোগিতার এ মাসে বেশি বেশি দান-সদকা করে গরিব-অসহায়, নিঃস্ব লোকদের পাশে দাঁড়িয়ে অশেষ সওয়াব অর্জনের তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশ মুসলিম কাউন্সিল
