কর্মচারীর ক্ষোভ না ‘অন্য কিছু’ তদন্তে পুলিশ

আপডেট : ০৬ মার্চ ২০২৬, ০১:৫৯ এএম

কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) কর্মচারীর ছুরিকাঘাতে সমাজকল্যাণ বিভাগের সভাপতি ও সহযোগী অধ্যাপক আসমা সাদিয়া রুনা হত্যাকান্ড রহস্য উদঘাটন অনেক বড় চ্যালেঞ্জ মনে করছেন তদন্তসংশ্লিষ্টরা। এ ঘটনায় চরম উদ্বিগ্ন সময় কাটাচ্ছে ইবি পরিবার। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তসহ ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটনসহ দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করেছে নিহতের পরিবার। একাধিক বিষয় সামনে রেখে পুলিশের সবকটি ইউনিট তদন্ত শুরু করেছে। হত্যাকান্ডের পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে কি না, তা উদঘাটনের চেষ্টা চলছে।

ঘটনায় জড়িত সন্দেহে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে আইসিইউ বিভাগে চিকিৎসাধীন এবং পুলিশ হেফাজতে থাকা ইবি কর্মচারী ফজলুর রহমানের পরিবারের দাবি, সম্প্রতি ইবি কর্তৃপক্ষের চাকরি-বাণিজ্যের নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির শিকার নিহত শিক্ষিকা এবং কর্মচারী ফজলু। একটা দুর্বোধ্য ষড়যন্ত্রের মধ্য দিয়ে এ ঘটনা ঘটিয়েছে চাকরি-বাণিজ্যের চক্রটি। সঠিক তদন্তে প্রকৃত দোষীকে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। অন্যদিকে পুলিশ বলছে, ইবি শিক্ষিকা হত্যাকান্ডের ঘটনাটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সবকটি ইউনিট পৃথকভাবে তদন্ত শুরু করেছে।

নিহতের চাচা হাসিবুল ইসলামের অভিযোগ, এ হত্যাকান্ড নিছক ওই কর্মচারীর ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশে ঘটেনি। এর পেছনে নিশ্চয়ই বড় কোনো ষড়যন্ত্র আছে। সেটি শনাক্ত না হওয়া পর্যন্ত রহস্য উদঘাটন হবে না।

চিকিৎসাধীন কর্মচারী ফজলুর রহমানের চাচা কুষ্টিয়া সদর উপজেলার শাস্তিডাঙ্গা ১৪ মাইলপাড়া গ্রামের বাসিন্দা খন্দকার লুৎফর রহমান বলেন, প্রায় ১০ বছর ধরে ফজলু বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টাররোলে বেগার খাটছে। মাস শেষে ৫-৬ হাজার টাকা হাতে ধরিয়ে দেয়। এই ত্যাগ করে আসছিল যে, একটা সময় চাকরি স্থায়ী হয়ে গেলে এই কষ্ট লাঘব হবে। কিন্তু ৫ আগস্টের পর বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো শূন্য পদ না থাকলেও কর্তৃপক্ষ কয়েকশ লোকের নতুন করে চাকরি দিয়েছে। অথচ ফজলু যে বেগার খাটছিল সেখানেই পড়ে ছিল। এ ছাড়া ফজলুকে সমাজকল্যাণ বিভাগ থেকে স্থানান্তর করে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে দিয়েছিল। সেখানে গিয়ে ফজলু অবস্থান হয়েছিল নতুন হিসেবে। আবার আগের বিভাগে কর্মকালীন প্রায় বছরখানেকের বেতনও বকেয়া ছিল। এসব বিষয়ে ওর হয়রানি ছিল এটা ঠিক, কিন্তু সেটা যে একজন শিক্ষককে হত্যাকান্ড পর্যন্ত গড়াবে এটা আমি বিশ্বাস করি না। আমিও চাই প্রকৃত দোষীর বিচার হোক। সেখানে যদি আমার ছেলেও দোষী হয় তবুও বিচার চাই। ফজলুকে সুস্থ করে তোলা হোক। ওর মুখ থেকে প্রকৃত ঘটনা শুনে তদন্ত করা হোক।

এ বিষয়ে ইবি ট্রেজারার জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আমার কাছে ফজলু তার চাকরি স্থায়ীকরণের বিষয়ে এসেছিল। আমি ওর কাজটা করেও দিয়েছি। সেই সঙ্গে ওর বিভাগের সভাপতি নিহত আসমা সাদিয়া ওর কাজ করে দিয়েছিল। অথচ এর অভ্যন্তরে কী এমন ঘটনা ঘটল যে, তাকে হত্যা করার পথ বেছে নিতে হলো। ওর চাকরির কোনো জটিলতা ছিল না বলে দাবি করেন তিনি।

এদিকে গতকাল ওই শিক্ষিকার জানাজা শেষে দাফন সম্পন্ন হয়েছে। এ হত্যার ঘটনায় নিহতের স্বামী ইমতিয়াজ সুলতান বাদী হয়ে জড়িত সন্দেহে ফজলুসহ চারজনের নাম উল্লেখ করে ইবি থানায় অভিযোগ করেছেন বলে নিশ্চিত করেছেন ইবি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাসুদ রানা। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, বৃহস্পতিবার সকালে কর্মচারী ফজলুর রহমান, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের সাবেক সহকারী রেজিস্ট্রার বিশ্বজিৎ কুমার বিশ্বাস, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শ্যাম সুন্দর সরকার এবং ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের অন্য সহযোগী অধ্যাপক মো. হাবিবুর রহমানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এজাহারে।

এর আগে সকাল ১০টায় ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতাল মর্গে নিহতের ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হয়। গতকাল বাদ জোহর কুষ্টিয়ার কেন্দ্রীয় ঈদগায় জানাজা শেষে কুষ্টিয়া পৌর গোরস্তানে দাফন হয়েছে। নিহত আসমা সাদিয়া রুনা কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ মোড়ে বসবাস করতেন। তিনি তিন মেয়ে ও এক ছেলেসন্তানের জননী। নৃশংস এ হত্যাকান্ডের দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করেন নিহতের সহকর্মী ও স্বজনরা।

বিচারের দাবিতে রাবি ও কুবিতে মানবন্ধন : রাবি প্রতিনিধি জানান, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক আসমা সাদিয়া রুনা হত্যাকান্ডে বিচারের দাবিতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) মানববন্ধন হয়েছে। কর্মসূচিতে হত্যাকারীর বিচারসহ তিনটি দাবি জানানো হয়। গতকাল দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনের সামনে সমাজকর্ম বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা এ দাবি জানান। দাবিগুলো হচ্ছে হত্যাকারীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিতকরণ, পেছনে যারা আছে তাদের চিহ্নিতকরণ ও সভাপতি দায়িত্ব থাকা অবস্থায় এমন ঘটনা ঘটায় ইবি প্রশাসন তার সন্তানের ভবিষ্যৎ নিশ্চিতকরণ।

সমাজকর্ম বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক গোলাম কিবরিয়া ফেরদৌস বলেন, যখন কোনো ঘটনা ঘটে প্রশাসন তখন তটস্থ হন। হত্যাকারীকে শাস্তি হিসেবে যদি ফাঁসি দেওয়া হয়, তবে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত হবে না। হত্যাকারীর শাস্তি এমনভাবে নিশ্চিত করতে হবে যেন পরবর্তীকালে আর কেউ এমন কোনো কর্মকান্ড করার সাহস না পায়। একই বিভাগের আরেক শিক্ষক অধ্যাপক শাহীদুর রহমান চৌধুরী বলেন, এ হত্যাকান্ডের সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা আছে কি না, এটা খুঁজে বের করতে হবে।

কুবি প্রতিনিধি জানান, রুনা হত্যাকান্ডের প্রতিবাদ এবং নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবিতে প্রতিবাদ সমাবেশ করেছেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। গতকাল সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ আব্দুল কাইয়ুম চত্বরে এ প্রতিবাদ সভা হয়। প্রতিবাদ সভায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল হাকিম, সহকারী প্রক্টর মুতাসিম বিল্লাহসহ বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীরা উপস্থিত ছিলেন। সমাবেশে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক মো. আব্দুল মমিন বলেন, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন কর্মচারীর হাতে বিভাগীয় প্রধান হত্যার ঘটনাটি অত্যন্ত মর্মান্তিক ও নিন্দনীয়। পবিত্র রমজান মাসে এমন নির্মম ঘটনা আমাদের সবাইকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করেছে। প্রাথমিকভাবে জানা যাচ্ছে, বদলি-সংক্রান্ত অসন্তোষ থেকেই এ ঘটনা ঘটেছে। আইসিটি বিভাগের প্রভাষক ওয়ালি উল্লাহ এ ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বলেন, ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা সিলেবাসে যুক্ত করা ও আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত না করলে সংকট নিরসন করা যাবে না, সরকারকে অনতিবিলম্বে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে। সহকারী প্রক্টর ও প্রতœতত্ত্ব বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মুতাসিম বিল্লাহ বলেন, এ ধরনের হত্যাকান্ড আমাদের ভাবিয়ে তোলে আগামী দিনের বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষার পরিবেশ কতটা নিরাপদ থাকবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও গণিত বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল হাকিম বলেন, আজ শিক্ষক হত্যা হয়েছে, কাল কর্মকর্তা, পরশু কর্মচারী, এরপর শিক্ষার্থী এভাবে চলতে পারে না। আমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক; আমরা চাই নিরাপদে কাজ শেষে ঘরে ফিরতে। কিন্তু যদি সেই নিরাপত্তা না থাকে, তাহলে স্বাধীনতার অর্থ কী?

গত বুধবার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান আসমা সাদিয়া রুনাকে নিজ কার্যালয়ে একই বিভাগের কর্মকর্তা ফজলুর রহমান ছুরিকাঘাতে হত্যা করেন। পরে তিনি নিজের গলায় ছুরি চালিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা চালান।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত