সমাজ সংস্কারের নামে গানবাজনা নিষিদ্ধ!

আপডেট : ০৮ মার্চ ২০২৬, ০৩:৪৫ এএম

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার একটি জামে মসজিদের কমিটি ‘সমাজ সংস্কার’-এর নামে গানবাজনা ও বাদ্যযন্ত্র বাজানো নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। পাশাপাশি কমিটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এলাকায় কোনো বিয়ের অনুষ্ঠানে গান-বাজনা হলে সেখানে ধর্মীয় রীতিতে বিয়ে পড়াতে যাবেন না স্থানীয় আলেমরা। প্রায় দুই মাস আগে মসজিদ কমিটি এ বিষয়ে এলাকায় একটি নোটিস জারি করে। সম্প্রতি বিষয়টি জানাজানি হলে প্রশাসন নড়েচড়ে বসে। গানবাজনা হারাম লেখা ব্যানার, ফেস্টুন ও নোটিস জব্দ করা হয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, চাঁপাইনবাবগঞ্জের চরাঞ্চলের ইসলামপুর ইউনিয়নের তেররশিয়া পোড়াগ্রামে ‘গানবাজনা বা বাদ্যযন্ত্রমুক্ত সমাজ গঠনের সিদ্ধান্ত’ শিরোনামে প্রায় দুই মাস আগে নোটিস প্রচার করা হয়। পোড়াগ্রাম মসজিদ কমিটির সদস্য ও গ্রামবাসীর পক্ষ থেকে ৩৪ জন ওই নোটিসে স্বাক্ষর করেন। সমাজ রক্ষা কমিটির সদস্যরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে নোটিস প্রচার করেন।

নোটিসে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘এতদ্বারা পোড়াগ্রামবাসীর পক্ষ থেকে জানানো যাচ্ছে যে, আমরা আমাদের গ্রামের পরিবেশ, যুবসমাজের নৈতিকতা এবং পারিবারিক শান্তি রক্ষার জন্য গ্রামের গণসম্মতির ভিত্তিতে শিরক, বিদ’আত, গান-বাজনা ও অপসংস্কৃতি ইসলামের দৃষ্টিতে হারাম ও ক্ষতিকর হওয়ায় গ্রামের সামাজিক কল্যাণের স্বার্থে আজ থেকে আমাদের গ্রামে প্রকাশ্যে উচ্চশব্দে বাদ্যযন্ত্র বা গান-বাজনা সম্পূর্ণরূপে হারাম ও নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলো। এরপরেও যারা বাদ্যযন্ত্র বাজাবে, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

নোটিস জারির পাশাপাশি গ্রামের কয়েকটি মোড়ে ব্যানার ও ফেস্টুন টানানো হয়। নোটিস ও ফেস্টুন টানানোর পর গ্রামের মানুষ তো বটেই, গ্রামের বাইরে থেকে আসা ফেরিওয়ালারাও মাইক নিয়ে গান-বাজনা করে গ্রামে ঢোকা বন্ধ করে দেন।

স্থানীয় বাসিন্দা মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘হুজুরের (মসজিদের ইমাম) পদক্ষেপে আমরা গ্রামের যুবক ও বয়স্করা মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আমরা আমাদের গ্রামে গান-বাজনা বাজাতে দেব না।’

তেররশিয়া পোড়াগ্রাম জামে মসজিদের ইমাম আব্দুল মালেক বিন খলিলুর রহমান বলেন, ‘আলেম হিসেবে আমাদের দায়িত্ব রয়েছে সমাজ সংস্কার করা। সমাজ থেকে অপসংস্কৃতি দূর করতে পদক্ষেপ নেওয়া। এই পদক্ষেপের অংশ হিসেবেই গ্রামে গান-বাজনা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পাশাপাশি গ্রামের মানুষদের নিয়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে।’

এদিকে স্থানীয় বেশ কয়েকজন তরুণ ও নারীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কিছু বয়স্ক মানুষ এমন সিদ্ধান্ত নিলেও তরুণরা তা মেনে নিতে পারেননি। তারা এ সিদ্ধান্তে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তবে দ্বন্দ্ব-সংঘাত এড়াতে প্রতিবাদও করতে পারেননি। বিষয়টি সম্প্রতি জানাজানি হওয়ার পর প্রশাসনে তোলপাড় সৃষ্টি হয়।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ওয়াসিম ফিরোজ বলেন, ‘ঘটনাটি নজরে আসার পর পুলিশ পাঠিয়ে তাদের টানানো ব্যানার অপসারণ করা হয়েছে।’

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মারুফ আফজাল রাজন জানান, বিষয়টি জানার পর গত বৃহস্পতিবার মসজিদ কমিটির সদস্যদের ডেকে পাঠানো হয়। তারা না বুঝে গ্রামে গান-বাজনা নিষিদ্ধ করেছেন বলে উল্লেখ করে ভুল স্বীকার করেছেন। তারা ইতিমধ্যে ব্যানার-ফেস্টুন সরিয়ে নিয়েছেন। তারা আর এ ধরনের কর্মকাণ্ড করবেন না বলেও জানিয়েছেন। গান-বাজনা নিষিদ্ধ করার আইনগত এখতিয়ার তাদের না থাকায় তারা সভা করে দুঃখ প্রকাশ করবেন এবং গান-বাজনা নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে নিয়ে ইউএনও অফিসে জমা দেবেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত