মধ্যপ্রাচ্যে কৃষিজাত পণ্যের রপ্তানি বন্ধ

আপডেট : ০৯ মার্চ ২০২৬, ০৩:৪৫ পিএম

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ আক্রমণের পর এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও যুদ্ধ বন্ধের কোনো ইঙ্গিত নেই। ইরানের পাল্টা আক্রমণে এ সময়ের মধ্যেই যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যের ১২টি দেশে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের ব্যাপকতা যত বাড়ছে, বাংলাদেশের জন্য তত বেশি শঙ্কা তৈরি হচ্ছে। একদিকে দাম বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করা সার ও জ্বালানির সরবরাহ নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় কৃষি, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য এবং হিমায়িত মৎস্য রপ্তানি একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে। এসব পণ্যের রপ্তানি যুদ্ধের কারণে বড় ধাক্কা খাবে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর দিন থেকেই কৃষিপণ্যের ও কৃষিজাতপণ্যের রপ্তানি বন্ধ হয়েছে। এসব পণ্যের রপ্তানিতে প্রথম সারির একটি কোম্পানি প্রাণ আরএফএল গ্রুপ। যুদ্ধের কারণে প্রতিষ্ঠানটির ২০০ কনটেইনার চট্টগ্রাম বন্দরে আটকা পড়েছে, যেগুলোর গন্তব্য ছিল সৌদি আরব, দুবাই, কাতার ও কুয়েত। ওইসব দেশে রপ্তানি শুধু বন্ধ হয়ে গেছে তাই নয়, কবে আবার রপ্তানি শুরু হবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

প্রাণের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইলিয়াস মৃধা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যুুদ্ধের প্রথম দিন থেকেই রপ্তানি বন্ধ হয়ে গেছে। মধ্যপ্রাচ্যের বড় বাজারে রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাওয়া আমাদের জন্য শঙ্কার বিষয়। কারণ মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশি কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্যের বড় বাজার তৈরি হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘অনিশ্চয়তার মধ্যে পণ্যগুলো এখন চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ফিরিয়ে আনতে হচ্ছে। এগুলো ওয়্যারহাউজে রাখার প্রক্রিয়া শুরু করেছি। এটা আমাদের জন্য বড় ধাক্কা।’

একই অবস্থা দেশের আরেকটি বড় কোম্পানি স্কয়ারের। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, যুদ্ধ শুরু হয়েছে যেদিন, সেদিনই ৯টি কনটেইনার আটকা পড়েছে চট্টগ্রাম বন্দরে। সেখানে আধা মিলিয়ন ডলারের পণ্য ছিল।

স্কয়ার ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী (সিইও) কর্মকর্তা পারভেজ সাইফুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রথম দিনেই ৯টি কনটেইনার আটকা পড়েছে। এখন পণ্য পাঠানোর মতো পরিস্থিতি নেই।’ তিনি বলেন, ‘শঙ্কার বিষয় হলো, যুদ্ধ কবে থামবে, তার নিশ্চয়তা তৈরি হয়নি এখনো। পরে রপ্তানির সুযোগ তৈরি হলেও সেখানে বাড়তি জাহাজভাড়া গুনতে হবে, কনটেইনার পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হবে। সবমিলে কৃষিপণ্যের রপ্তানি অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।’

একই অবস্থার মধ্যে পড়েছে সবগুলো রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান। এসব পণ্য জাহাজে ছাড়া পাঠানোর বিকল্প কোনো উপায় না থাকায় সংকটপূর্ণ অবস্থা তৈরি হয়েছে, যা রপ্তানি আয়ে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য বলছে, বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলারের কৃষিপণ্য ও কৃষিজাত পণ্য রপ্তানি হয়। রপ্তানি পণ্যের তালিকায় বিস্কুট, নুডলস, ফ্রুট ড্রিংকস, পরটা, সুগন্ধি চাল, চানাচুরের মতো পণ্য রয়েছে। এই পণ্যগুলো সবচেয়ে বেশি রপ্তানি হয়। মধ্যপ্রাচ্যে রপ্তানি হওয়া পণ্যগুলোর মধ্যে হিমায়িত চিংড়ি ও বিভিন্ন ধরনের মাছ রয়েছে।

বিশে^র প্রায় ১৫০টি দেশে এসব পণ্য রপ্তানি হলেও এর বড় গন্তব্যগুলোর মধ্যে রয়েছে দুবাই ও সৌদি আরব। কুয়েত, কাতার, বাহরাইনেও ভালো পরিমাণে এসব পণ্য রপ্তানি হয়। কিন্তু যুদ্ধের কারণে এসব পণ্য রপ্তানি বন্ধ হয়ে গেছে।

জানা গেছে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর পণ্য আনা-নেওয়ার জন্য হরমুজ প্রণালি হয়ে জাহাজকে গন্তব্যে পৌঁছাতে হয়। যেখানে ইরান যুদ্ধের শুরুতে নিষেধাজ্ঞা দিলেও এখন তা থেকে সরে এসেছে। তবে জাহাজ চলাচল একেবারে সীমিত হয়ে পড়েছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্টতা আছে এমন জাহাজ পেলেই তার ওপর আক্রমণ করা হচ্ছে।

জানা গেছে, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলো থেকে ইরানে আক্রমণ করা হয়। ইরানও পাল্টা আক্রমণ করছে ওইসব ঘাঁটিতে। এতে মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। এর প্রভাবেই মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

কৃষিপণ্যের বাইরে মধ্যপ্রাচ্যেই সবচেয়ে বড় বাজার কৃষিপণ্যের। এ তালিকায় যেখানে চা, তাজা সবজি, ফলমূল, পানসহ বেশকিছু পণ্য রয়েছে। গত অর্থবছরে শুধু তাজা সবজিই রপ্তানি হয়েছে ৮০ মিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের।

রপ্তানিকারকরা বলছেন, বাংলাদেশ কৃষিপণ্যের যতটুকু রপ্তানি করে, তার ৬০ ভাগেরই গন্তব্য মধ্যপ্রাচ্য। এখন এটা পুরোই বন্ধ। কারণ এটা নির্ভর করে বিমান চলাচলের ওপর। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যের ফ্লাইটগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে রপ্তানিও বন্ধ হয়ে গেছে। বিমান চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার আগ পর্যন্ত রপ্তানি শুরুর সুযোগ নেই।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ফ্রুটস, ভেজিটেবল অ্যান্ড অ্যালাইড প্রোডাক্টস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মনসুর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ফ্লাইট যতক্ষণ না স্বাভাবিক হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের রপ্তানি করার সুযোগ নেই। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত অনিশ্চয়তাই থাকছে।’ বর্তমানে যুক্তরাজ্য, ইতালিসহ ইউরোপের মাত্র তিনটি দেশে পণ্য যাচ্ছে বলেও জানান তিনি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের রপ্তানির একমাত্র উপায় আকাশপথ। কিন্তু ভারতের সমুদ্রপথে রপ্তানির সুযোগ রয়েছে। তারা মাত্র চার দিনের মধ্যে পণ্য পৌঁছে দিতে পারে মধ্যপ্রাচ্যে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত