রমজানের বিদায়ী হাওয়া বইছে। রহমত ও মাগফিরাতের দিনগুলো পেরিয়ে আমরা এখন নাজাত পর্বের শেষদিকে অবস্থান করছি। এ সময় একজন মুমিন নতুন উদ্যমে নিজেকে আল্লাহর দরবারে সঁপে দেওয়ার চেষ্টা করেন। দিনের রোজা, পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজ, নফল ইবাদতসহ রাতের নির্জনতায় বাড়ে দোয়া, কোরআন তিলাওয়াত ও জিকিরের ধারা। মসজিদগুলোয় ইবাদতের আবহ আরও গভীর হয়। ঘরে ঘরেও তৈরি হয় আধ্যাত্মিকতার অনন্য পরিবেশ। হৃদয় বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়, এই মুহূর্তগুলো জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময়।
এই মূল্যবান সময়ে মুমিনের প্রধান লক্ষ্য থাকে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং বিগত জীবনের গুনাহ থেকে মুক্তি পাওয়া। রমজানের এই শেষ ভাগে লুকিয়ে আছে মহিমান্বিত রাত শবেকদর, যা হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ। আধ্যাত্মিক উন্নতির এই সুবর্ণ সুযোগে ফরজ ইবাদতের পাশাপাশি নফল আমলের গুরুত্বও অপরিসীম। নফল ইবাদত মূলত স্রষ্টার প্রতি বান্দার গভীর ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। আর রমজান মাসে একটি নফল অন্য মাসের একটি ফরজের সমান মর্যাদা রাখে, যা আমাদের আমলনামাকে সমৃদ্ধ করার এক অভাবনীয় সুযোগ তৈরি করে দেয়, তাই এ সময়টুকু আমাদের কাছে খুবই মূল্যবান।
ফরজ ও ওয়াজিবের পরিপূরক হিসেবে নফল ইবাদতের গুরুত্ব আছে। আর রমজান মাসে নফল ইবাদতের গুরুত্ব আরও অনেক বেশি। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, রমজান মাসে যে ব্যক্তি একটি নফল আদায় করল, সে যেন অন্য মাসে একটি ফরজ আদায় করল। আর যে ব্যক্তি এই মাসে একটি ফরজ আদায় করল, সে যেন অন্য মাসে সত্তরটি ফরজ আদায় করল। (শুয়াবুল ইমান)
রমজান মাসে পুণ্যের খাতা ভারী করার জন্য খুব সহজেই যেসব নফল আমল করা যায়, তা হলো প্রতিদিন বেশি বেশি নফল নামাজ পড়া, কোরআন তিলাওয়াত করা, জিকির-আসকার করা, দান-খয়রাত করা, দরুদ শরিফ পড়া, সালামের প্রচার-প্রসার করা, অধীনস্থদের ভার-বোঝা কমানো, অসহায়কে সহযোগিতা করা, আর্তপীড়িতের সেবা করা, রোগীর খোঁজখবর রাখা, মানুষের সঙ্গে হাসি মুখে কুশল বিনিময় করা, সর্বোপরি সবার সঙ্গে সদাচরণ করা।
ফরজ ইবাদতগুলো পালন করা বান্দার আবশ্যিক কর্তব্য। এর জন্য বান্দাকে পরকালে হিসাব দিতে হবে। আর নফল ইবাদত হলো আবশ্যিক কর্তব্যের অতিরিক্ত। নফল আদায় না করলে কোনো হিসাব দিতে হবে না। কেননা নফল আদায় করতে বান্দা বাধ্য নয়। তবে নফল আদায় করলে তা বান্দার পক্ষ থেকে মহান আল্লাহর জন্য উপহার হিসেবে গণ্য হবে। এতে বান্দা মহান আল্লাহর অধিক নিকটবর্তী হতে পারবে। এটা বান্দার পক্ষ থেকে আল্লাহর প্রতি অতিরিক্ত ভালোবাসা প্রকাশ। আর এতে মহান আল্লাহও বান্দাকে ভালোবেসে চাহিবামাত্র সবকিছু দান করেন।
রাসুল (সা.) বলেন, আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘আমি যা কিছু আমার বান্দার ওপর ফরজ করেছি, শুধু তা দ্বারাই কেউ আমার নৈকট্য লাভ করবে না। বরং আমার বান্দা সর্বদা নফল ইবাদত দ্বারা আমার নৈকট্য লাভ করতে থাকবে। এমনকি একপর্যায়ে আমি তাকে আমার এমন প্রিয় পাত্র বানিয়ে নিই যে, আমিই তার কান হয়ে যাই, যা দিয়ে সে শুনে। আমিই তার চোখ হয়ে যাই, যা দিয়ে সে দেখে। আমিই তার হাত হয়ে যাই, যা দিয়ে সে ধরে। আমিই তার পা হয়ে যাই, যা দ্বারা সে চলে। (এমতাবস্থায়) সে যদি আমার কাছে কিছু চায়, তবে অবশ্যই তাকে তা দান করি।’ (সহিহ বুখারি)
গুরুত্ব ও মহত্ত্বের দিক দিয়ে নফল ইবাদতগুলোর মধ্যে নফল নামাজের স্থান সর্বাগ্রে। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, এক সাহাবি রাসুল (সা.)-কে প্রশ্ন করলেন, আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় কাজ কী? উত্তরে রাসুল (সা.) বললেন, তুমি আল্লাহর জন্য বেশি বেশি সেজদা করবে (নফল নামাজ পড়বে)। কারণ তুমি যখনই আল্লাহর জন্য একটি সেজদা করো, তখনই তার বিনিময়ে আল্লাহ তোমার একটি মর্যাদা বৃদ্ধি করেন এবং তোমার একটি পাপ মোচন করেন। (সহিহ মুসলিম)
ইবাদতগুলোর মধ্যে নামাজ সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কেননা ধনী-গরিব সবারই প্রতিদিন পাঁচবার ফরজ নামাজ আদায় করতে হয়। ইবাদতগুলোর মধ্যে যেহেতু একজন মুসলমানের নামাজ সবচেয়ে বেশিবার আদায় করতে হয়, তাই এই ইবাদতে ঘাটতি থেকে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এই ঘাটতি পূরণের জন্য বেশি বেশি নফল নামাজ আদায়ের বিকল্প নেই।
হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম বান্দার নামাজের হিসাব নেওয়া হবে। যদি সে সঠিক হিসাব দিতে পারে, তবে কৃতকার্য হয়ে যাবে। আর যদি ব্যর্থ হয়, তবে ক্ষতিগ্রস্ত ও ধ্বংস হয়ে যাবে। যদি তার ফরজগুলোর মধ্যে কোনো ঘাটতি থাকে, তবে আল্লাহতায়ালা বলবেন, ‘দেখো, আমার বান্দার কোনো নফল আছে কি না? যদি থাকে তবে তা দিয়ে তার ফরজের ঘাটতি পূরণ করা হবে। অতঃপর একইভাবে তার অন্যান্য আমলের হিসাব নেওয়া হবে।’ (সুনানে তিরমিজি)
সারাজীবনে পালনীয় ইবাদত হিসেবে ফরজ নামাজ সবচেয়ে বেশি আদায় করতে হয়। তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও ফরজ নামাজে ত্রুটি ও ঘাটতি হয়ে যেতে পারে। এই ঘাটতি যদি পূরণ করা না যায়, তাহলে পরকালে ভয়াবহ অবস্থার সম্মুখীন হতে হবে। রমজান মাসের নফল নামাজ শক্তির দিক দিয়ে ফরজ নামাজের মর্যাদাভুক্ত। তাই সারাজীবনের ফরজ নামাজের ঘাটতি পূরণ এবং মহান আল্লাহর সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক স্থাপনে রমজানে বেশি বেশি নফল নামাজ আদায় করা বাঞ্ছনীয়।
লেখক : শিক্ষক ও ইসলামবিষয়ক গবেষক
