পাকিস্তানকে ১১ রানে হারিয়ে তিন ম্যাচ সিরিজের তৃতীয় ওয়ানডে জিতে ২-১ ব্যবধানে সিরিজ জিতল বাংলাদেশ। বাংলাদেশের ৫০ ওভারে ৫ উইকেটে করা ২৯০ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ম্যাচের শেষ বলে পাকিস্তান অলআউট হয় ২৭৯ রানে। ম্যাচসেরা তানজিদ হাসান তামিম, সিরিজ সেরার পুরস্কার তার সঙ্গে ভাগাভাগি করেছেন ৮ উইকেট নেওয়া নাহিদ রানা।
প্রথম দুটো ম্যাচ হয়েছিল একপেশে। শেষ ম্যাচটা যেন সেসব ঘাটতি পুষিয়ে দিল। খেলা হয়েছে একদম ১০০ ওভার, নিষ্পত্তি হয়েছে ২৯৯তম বৈধ ডেলিভারিতে। বাংলাদেশের হয়ে সেঞ্চুরি করেছেন তানজিদ হাসান তামিম, পাকিস্তানের সালমান আলি আগা। তবে শেষ পর্যন্ত দুই দলের পার্থক্য গড়ে দিয়েছেন তাসকিন আহমেদ। গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বাংলাদেশকে ব্রেক থ্রু দিয়েছেন এ পেসার। তবুও পাকিস্তান ছিল জয়ের কক্ষপথে। একটা সময়ে তো মনে হচ্ছিল শাহিন শাহ আফ্রিদি ম্যাচটা জিতিয়েই দেবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রিশাদ হোসেনের করা ম্যাচের শেষ ওভারটা থেকে ১৪ রান নিতে পারেননি শাহিন। ছয় ওভারে ৫৪ রান দিয়ে কোনো উইকেট না পাওয়া রিশাদকে আর বোলিংয়ে আনেননি অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ। বাকি সব বোলারের বোলিং কোটা শেষ হয়ে যাওয়ার পর শেষ ওভারে রিশাদকেই অগত্যা বোলিংয়ে আনতে হয় তাকে। পাকিস্তানের তখন জিততে লাগে ছয় বলে ১৪ রান। নাটকীয়তায় ভরা সেই ওভারের প্রথম বলটা ডট, পরের বলটায় চালিয়ে খেলে বল আকাশে তুলে দিয়েছিলেন শাহিন। কিন্তু সেই ক্যাচটা হাতে জমাতে পারেননি রিশাদ নিজেই। পরের বলেও চালিয়েছিলেন, ক্যাচও উঠেছিল কিন্তু ফিল্ডার সেখানে পৌঁছাতে পারেননি। দৌড়ে নিলেন ২। তার পরের বলটায় আম্পায়ার দিলেন ওয়াইডের সংকেত, বলটা লেগসাইডে বেরিয়ে গিয়েছিল। উইকেটের পেছন থেকে লিটন সংকেত জানালেন ‘রিভিউ’ নেওয়ার। সচরাচর এলবিডব্লিউর বেলায় রিভিউ নিতেই দেখা যায়, ওয়াইডের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আবেদন এবারই প্রথম। রিপ্লেতে দেখা গেল বল লেগেছে ব্যাটসম্যানের জুতোর ডগায়। সেই ওয়াইডের আবেদন খারিজ, ফলে ওভারের পঞ্চম বলটাতেও রান পেলেন না শাহিন। এক বলে নিতে হবে ১২ রান, ওখানেই জয়টা নিশ্চিত বাংলাদেশের। শেষ বলটাও লেগসাইডে দিয়েছিলেন রিশাদ, শাহিন অনেকটা বেরিয়ে এসে মারতে গিয়ে নাগাল পাননি, লিটন বল ধরে স্টাম্প ভেঙে দেন। সেটাই রিশাদের একমাত্র উইকেট শিকার, সেটাই পাকিস্তানের শেষ উইকেটের পতন। ২৭৯ রানে অলআউট পাকিস্তান। এ জয়ে ২-১ ব্যবধানে সিরিজ বাংলাদেশের, সেই সঙ্গে আইসিসির ওয়ানডে র্যাংকিংয়ে বাংলাদেশ উঠে গেল ৯ নম্বরে।
টস জিতে পাকিস্তান নেয় বোলিং। সাইফ হাসান ও তানজিদ হাসান তামিমের ১০৫ রানের উদ্বোধনী জুটি গড়ে দেয় চমৎকার ভিত্তি। তামিম তুলে নেন ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরি, ৭ ছক্কা আর ৬ বাউন্ডারিতে ১০৭ বলে ১০৭ রানের ইনিংস খেলেন এই বামহাতি উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান। তামিমের বিদায়ের পর লিটন (৫১ বলে ৪১) ও তাওহিদ হৃদয় (৪৪ বলে ৪৮*) ঠিক কাক্সিক্ষত গতিতে রান তুলতে না পারলেও বাংলাদেশ ৫০ ওভার শেষে সংগ্রহ করে ৫ উইকেটে ২৯০ রান। ৫২ রানে ৩ উইকেট নেন হারিস রউফ।
বাংলাদেশের পেসাররা শুরুতেই উইকেট নিয়ে চাপে ফেলেন পাকিস্তানকে। প্রথম ওভারেই তাসকিন তুলে নেন সাহেবজাদা ফারহানকে, পরের ওভারে মাজ সাদাকাত আউট নাহিদ রানার বলে। ৪ রান করা রিজওয়ানকে বোল্ড করেন তাসকিন, গাজি ঘোরিকে বোল্ড করেন নাহিদ রানা। এরপর ৩৪ রান করা আবদুল সামাদকে মোস্তাফিজ আউট করলে পাকিস্তানের সংগ্রহ দাঁড়ায় ৫ উইকেটে ১৮২। এখান থেকে বাকি ৫ উইকেট তুলে নেওয়াটাকে মনে হচ্ছিল সময়ের ব্যাপার, সেই সম্ভাবনার বাস্তবায়নে বাধা হয়ে দাঁড়ালেন সালমান। সাদ মাসুদের সঙ্গে ৮২ বলে ৭৯ রানের জুটি গড়ে অল্প অল্প করে সম্ভাবনার দ্বারটা খুলে দিলেন দুজনে, এরপর ফাহিম আশরাফকে সঙ্গে নিয়ে ৪৯ রানের জুটিতে সম্ভাবনাকে বদলে দিলেন বাস্তবতায়। সবশেষে শাহিন শাহ আফ্রিদিকে সঙ্গে নিয়ে ৫২ রানের জুটি গড়ে ম্যাচটা প্রায় জিতিয়েই দিচ্ছিলেন সালমান। কিন্তু তাসকিনের বলে উড়িয়ে মারতে গিয়ে ডিপ মিডউইকেটে শান্তর ক্যাচের শিকার হয়ে সালমান যখন বিদায় নিলেন, তখন গ্যালারিতে উচ্ছ্বাস। বিপদ তখনো ছিল। ৪৯তম ওভারে মোস্তাফিজের বলে দুটি ছক্কা মেরে শাহিন শাহ সমীকরণটাকে সহজ করে ফেললেন, তবে পরে দুটো বল ডট দিয়ে দারুণভাবে ফিরে আসেন মোস্তাফিজও। পঞ্চম বলে সোজা খেলেছিলেন শাহিন, বল লাগে মোস্তাফিজের পায়ে এবং ব্যথায় কুঁকড়ে মাটিতে শুয়ে পড়েন এ পেসার। খানিকক্ষণ শুশ্রুষার পর আস্তে করে দৌড়ে এসে আলতো করে স্পিনারের মতোই শেষ বলটা করেছিলেন
মোস্তাফিজ, সেই বলেই ব্যাট চালিয়ে ক্যাচ তুলে দেন হারিস রউফ। তাতে করে ৯ উইকেটের পতন পাকিস্তানের। যার মানে শেষ ওভারে ১৪ রান লাগবে জিততে পাকিস্তানের, হাতে একটাই উইকেট। ১২ ওভার পর রিশাদকে বোলিংয়ে এনেছিলেন মিরাজ, রিশাদ দ্বিতীয় বলেই খেলাটা শেষ করে দিতে পারতেন ক্যাচটা নিয়ে। কিন্তু সেই ক্যাচ ফস্কালেন। অবশেষে শেষ বলেই চূড়ান্ত সমাপ্তি, রিশাদ পেলেন একটা উইকেটও। রোমাঞ্চকর জয়ে ১১ রানের জয়ে সিরিজ নিশ্চিত করল বাংলাদেশ।
২০১৫ সালে মিরপুরেই পাকিস্তানকে তিন ম্যাচের সিরিজে হারিয়েছিল বাংলাদেশ, এরপর দুই দেশ একাধিক বৈশ্বিক ও মহাদেশীয় আসরে মুখোমুখি হলেও ওয়ানডে সিরিজ আর খেলেনি। ১১ বছর পর মুখোমুখি হয়েও সিরিজে শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখল বাংলাদেশই।
