অপ্রচলিত বাজারে কমেছে রপ্তানি

আপডেট : ১৭ মার্চ ২০২৬, ০৭:০৮ এএম

অপ্রচলিত (নন-ট্র্যাডিশনাল) বাজারে চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) তৈরি পোশাক রপ্তানি কমেছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় তৈরি পোশাক রপ্তানি বেড়েছে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে অপ্রচলিত বাজারে রপ্তানি হয়েছে ৪ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ কম। পোশাক রপ্তানির প্রায় ১৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ এসেছে এসব বাজার থেকে।

খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, মুদ্রাস্ফীতি এবং বিভিন্ন দেশে ভোক্তা ব্যয় কমে যাওয়ার কারণে পোশাকের চাহিদা কিছুটা কমেছে। এর প্রভাব প্রধান বাজারের পাশাপাশি অপ্রচলিত বাজারেও পড়েছে।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার হলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। ইউরোপের মধ্যে জার্মানি, যুক্তরাজ্য, স্পেন, ফ্রান্স, ইতালি এবং নেদারল্যান্ডসও রয়েছে তৈরি পোশাক রপ্তানির প্রচলিত বাজারের তালিকায়।

এর বাইরে বাংলাদেশের জন্য অপ্রচলিত বাজার হিসেবে ধরা রাশিয়া, তুরস্ক, অস্ট্রেলিয়া, মেক্সিকো, দক্ষিণ কোরিয়াসহ লাতিন আমেরিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশ।

ইপিবি প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, গুরুত্বপূর্ণ অপ্রচলিত বাজারে রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। রাশিয়ায় রপ্তানি কমেছে ২৯ দশমিক ১৭ শতাংশ। তুরস্কে কমেছে ২৪ দশমিক ৩৮ শতাংশ। মেক্সিকোতে কমেছে ১৬ দশমিক ৮২ শতাংশ। অস্ট্রেলিয়ায় কমেছে ১২ দশমিক ৬৮ শতাংশ। দক্ষিণ কোরিয়ায় কমেছে ১২ দশমিক ৭৬ শতাংশ। তবে এই বাজারগুলোর মধ্যেও কিছু দেশে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। ব্রাজিলে রপ্তানি বেড়েছে ২৩ দশমিক ৩১ শতাংশ, চীনে বেড়েছে ২১ দশমিক ৫১ শতাংশ, দক্ষিণ আফ্রিকায় বেড়েছে ৯ দশমিক ৫৯ শতাংশ।

অপ্রচলিত বাজারের তালিকায় থাকা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় তৈরি পোশাক রপ্তানি বেড়েছে। ইপিবির তথ্যে দেখা গেছে, সৌদি আরবে বেড়েছে ২১ দশমিক ৪৬ শতাংশ, মালয়েশিয়ায় বেড়েছে ১৬ দশমিক ৪০ শতাংশ, সংযুক্ত আরব আমিরাতে বেড়েছে ১৫ দশমিক ৬৮ শতাংশ।

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল আক্রমণের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ফলে লোহিত সাগর, সুয়েজ খালসহ উপসাগরীয় গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রুটে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এতে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাকশিল্পের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, গত আট মাস ধরেই রপ্তানি খাত নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির চাপে রয়েছে। এর মধ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে তা শুধু জ¦ালানি বাজারেই নয়, বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলেও বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করতে পারে। দ্রুত সরবরাহনির্ভর ফ্যাশনশিল্পে এর প্রভাব তুলনামূলক বেশি পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ইপিবি তথ্য অনুযায়ী, গত আট মাসে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে ২৫ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৩ দশমিক ৭৩ শতাংশ কম। এ ছাড়া নিটওয়্যার ও ওভেন দুই খাতেই কমেছে রপ্তানি। পণ্যভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, তৈরি পোশাকের দুটি প্রধান উপখাত নিটওয়্যার ও ওভেন উভয় ক্ষেত্রেই রপ্তানি কমেছে। রপ্তানি কমেছে ৪ দশমিক ৫৬ শতাংশ। ওভেন রপ্তানি কমেছে ২ দশমিক ৭৯ শতাংশ।

বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) ভাইস প্রেসিডেন্ট শিহাব উদ্দোজা চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী অ্যাপারেলের ভোগ কমে গেছে। ফলে রপ্তানিতে কিছুটা চাপ তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের তুলনায় বাড়তি ট্যারিফের কারণে চীন ও ভারত ইউরোপের বাজারে কম দামে অর্ডার নিয়ে দর-কষাকষি করেছে। ফলে প্রতিযোগিতায় আমরা কিছুটা পিছিয়ে পড়েছি।’

তিনি আরও বলেন, নন-ট্র্যাডিশনাল মার্কেটেও পরিস্থিতি খারাপ। এর কারণ হচ্ছে মার্কেটিংয়ে পিছিয়ে থাকা, ক্রমাগত যোগাযোগ বা ফলোআপের অভাব এবং ইনসেনটিভ কমে যাওয়া।’ কোরিয়া ও জাপানের বাজারে চীন দক্ষ মার্কেটিং এর কারণেও বাংলাদেশ পিছিয়ে রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

দীর্ঘ মেয়াদে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে নতুন বাজার সম্প্রসারণ, পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো এবং উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদনে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানো ও প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা জোরদার করার ওপর জোর দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত