ইসরায়েলের হামলায় নিজেদের প্রভাবশালী রাজনীতিক ও জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান আলি লারিজানির মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে যুদ্ধরত ইরান। এ হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে মঙ্গলবার রাত থেকে হামলার মাত্রা বাড়িয়েছে দেশটি। গুচ্ছবোমাযুক্ত ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ইসরায়েলে আঘাত হেনেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্লেষকরা মনে করেন, লারিজানির হত্যার পরিণতিতে যুদ্ধ থেকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
যুদ্ধের প্রথম দিন গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর লারিজানিই হলেন ইসরায়েলের হামলায় প্রাণ হারানো দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা। গতকাল বুধবার লারিজানি, আধাসামরিক বাহিনী বাসিজের প্রধান গোলামরেজা সোলেইমানি এবং শ্রীলঙ্কা উপকূলে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় নিহত নৌ-সেনাদের জানাজা তেহরানে অনুষ্ঠিত হয়েছে।
লারিজানিকে হত্যার এক দিন পর মঙ্গলবার রাতে তেহরানে ইরানের গোয়েন্দাবিষয়ক মন্ত্রী ইসমাইল খতিবকে লক্ষ্য করেও হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। দেশটির দাবি, খতিব নিহত হয়েছেন।
যুদ্ধ থেকে বেরোনোর পথ সংকুচিত হচ্ছে : যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিকবিষয়ক গবেষণা সংস্থা কুইন্সি ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক ত্রিতা পার্সি মনে করেন, জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ প্রধান হিসেবে লারিজানি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন। তিনি হয়তো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ছিলেন না; কিন্তু ইরানের শাসনব্যবস্থার ভেতরে ঐকমত্য তৈরির কাজ করতেন।
পার্সি বলেন, লারিজানির হত্যাকা- যুদ্ধ পরিচালনায় ইরান সরকারের সক্ষমতায় কোনো প্রভাব ফেলবে না। বরং এটি ট্রাম্পের জন্য যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথকে কঠিন করে তুলবে। কারণ, লারিজানির মতো প্রভাবশালী ব্যক্তি না থাকায় যুদ্ধ বন্ধের আলোচনার জন্য ট্রাম্প আর কাউকে খুঁজে পাবেন না।
ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ আন্তর্জাতিক মহল আলোচনা মাধ্যমে পারস্য উপসাগর সংকটের সমাধানের আহ্বান জানিয়ে আসছেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্লেষকরা মনে করছেন, লারিজানির মতো প্রভাবশালী নেতাদের মৃত্যুর পর ইরানের সঙ্গে আলোচনার সুযোগ সীমিত হয়ে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র এখন সামরিক শক্তির মাধ্যমেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে।
ত্রিতা পার্সি বলেন, ইরানিরা জানে তাদের শীর্ষ নেতৃত্ব নির্মূলের মাধ্যমে ইসরায়েল শাসনব্যবস্থা ভেতর থেকে ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করবে। তাই গত বছরের জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের সংঘাতের পর থেকে ইরান সব গুরুত্বপূর্ণ পদের বিকল্প নির্ধারণ করে রেখেছে।
প্রতিশোধ হামলায় ইসরায়েলে নিহত ২ : তেল আবিবে গুরুত্বপূর্ণ একটি সামরিক স্থাপনার কাছাকাছি প্রতিশোধমূলক হামলায় একটি আবাসিক এলাকায় অন্তত দুজন নিহত হয়েছে। এতে এ যুদ্ধে ইসরায়েলে নিহতের সংখ্যা ১৪ জনে দাঁড়িয়েছে।
ইরানের ইসলামি বিপ্লবি গার্ড কোর (আইআরজিসি) এক বিবৃতিতে জানায়, কমপক্ষে চার ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে শতাধিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। এ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র মাঝ আকাশে অনেক ছোট ছোট বিস্ফোরকে বিভক্ত হয়ে বিশাল এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। ফলে এগুলো প্রতিহত করা অত্যন্ত কঠিন।
তেল আবিবের পাশাপাশি দখলকৃত পবিত্র নগরী আল-কুদস, বন্দরনগরী হাইফা, প্রযুক্তিকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত বেয়ার শেভা ও নেগেভ মরুভূমিতে কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে।
কাতার, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও সৌদি আরবসহ পারস্য উপসাগর অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলোয় হামলা চালানো হয়েছে।
হরমুজের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা : কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্র ‘বাংকারভেদী’ বোমা হামলা চালিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক্স হ্যান্ডেলে এক বিবৃতিতে এ দাবি করেছে। বিবৃতিতে বলা হয়, আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উপকূলীয় অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ ও সুরক্ষিত লক্ষ্যবস্তুগুলোতে এ হামলা পরিচালনা করা হয়। হামলায় সফলভাবে ভূস্তরের গভীরে প্রবেশে সক্ষম একাধিক পাঁচ হাজার পাউন্ডের ‘ডিপ পেনিট্রেটর’ যুদ্ধাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। এসব বোমা ভূগর্ভস্থ বা শক্তিশালী কংক্রিটের আস্তরণ ভেদ করে ভেতরে গিয়ে বিস্ফোরণ ঘটাতে সক্ষম।
ইরান গত দুই সপ্তাহ হরমুজ প্রণালিতে চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় বৈশ্বিক জ্বালানিসহ অন্যান্য সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে বিঘিœত হয়। সরবরাহ বন্ধের আশঙ্কায় ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম একপর্যায়ে প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার ছাড়িয়ে ১০৬ ডলারে পৌঁছে যায়। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়েছেন, এ অচলাবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক মন্দার ঝুঁকি আরও প্রকট হবে।
ইউএই নৌ-মিশনে যুক্ত হতে পারে : সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) জানিয়েছে, হরমুজে নৌ-অভিযান জোরদার করতে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে আমিরাত অংশ নিতে পারে। ইউএই প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের কূটনৈতিক উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ এমন সম্ভাবনার কথা জানান। যুক্তরাষ্ট্রের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অনলাইন আলোচনায় তিনি বলেন, এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক পরিকল্পনায় চূড়ান্ত সম্মতি দেওয়া হয়নি। তবে এ বিষয়ে আলোচনা চলছে।
গারগাশ বলেন, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সংঘাত শেষ হলে এমন একটি কাঠামো প্রয়োজন হবে, যাতে তেহরান তার পারমাণবিক, ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন কর্মসূচির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে না পারে।
ইরানের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা : ইরানের বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র লক্ষ্য করে একটি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থাকে (আইএইএ) ইরান জানিয়েছে, হামলায় কোনো প্রযুক্তিগত বা মানবিক ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। কেন্দ্রটি অক্ষত রয়েছে।
অন্যদিকে, ইসরায়েলের অন্তত পাঁচটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা চালানোর পরিকল্পনা করছে ইরান। সৌদি আরব, কাতার ও ইউএইর পাঁচটি প্রধান তেল স্থাপনার কাছের এলাকায় বসবাসরত সাধারণ মানুষকে অবিলম্বে এলাকা ছেড়ে নিরাপদ দূরত্বে সরে যেতে বলেছে ইরানের আইআরজিসি। ইসরায়েল গতকাল একটি পেট্রোকেমিক্যাল কমপ্লেক্সে বিমান হামলা চালানোর পর ইরান এ হুঁশিয়ারি দেয়।
আইএইএ জানায়, এ হামলার কারণে পারস্য উপসাগর এলাকায় ভয়াবহ পরিণতি হতে পারত।
রাশিয়া বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাছে হামলার নিন্দা জানিয়েছে। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু শক্তি সংস্থা রোসাটম প্রধান আলেকসেই লিখাচেভ এক বিবৃতিতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে পারমাণবিক কেন্দ্রের আশপাশে উত্তেজনা কমাতে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাতে আহ্বান জানান।
ইউক্রেনের ২০০ বিশেষজ্ঞ মধ্যপ্রাচ্যে : ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, দেশটির ২০০ জনেরও বেশি অ্যান্টি-ড্রোন বিশেষজ্ঞ বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থান করছে। তারা ইরানের ড্রোন হামলা মোকাবিলায় সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, জর্ডান ও ইউএইসহ কয়েকটি দেশকে সহায়তা দিচ্ছেন। আরও ৩৪ জন মোতায়েনের জন্য প্রস্তুত রয়েছেন।
বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসগুলোকে সতর্কবার্তা : ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের সব দূতাবাস ও কূটনৈতিক মিশনকে নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যালোচনা করতে বলা হয়েছে। ওয়াশিংটন পোস্ট এক প্রতিবেদনে এ কথা বলেছে।
বিমানবাহী রণতরী সরে গেল : যুক্তরাষ্ট্র বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ড লোহিত সাগর থেকে সরিয়ে নিয়েছে। জাহাজের লন্ড্রি এলাকায় আগুন লেগে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তা সরিয়ে নেওয়া হয়। জাহাজটিকে গ্রিক দ্বীপ ক্রিটে নেওয়া হচ্ছে।
