ঈদুল ফিতরের টানা ছুটির শুরুর দিকে, কিছু ব্যতিক্রম বাদে, ঈদযাত্রা ছিল মোটামুটি স্বস্তির। গত কয়েক দিনের চাইতে গতকাল যাত্রী ও পরিবহন দুইয়েরই চাপ দেখা গেছে মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কগুলোয়। ঈদযাত্রার শেষ মুহূর্তে ট্রেন ও লঞ্চ দুর্ঘটনাও ঘটেছে। বগুড়ার শান্তাহারে চিলাহাটিগামী ‘নীলসাগর এক্সপ্রেস’ ট্রেনের কয়েকটি বগি লাইনচ্যুত হয়ে অর্ধশতাধিক ব্যক্তি বেশি আহত হয়েছেন। ফলে উত্তরবঙ্গের একাংশের সঙ্গে সারা দেশের রেল যোগাযোগ সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। তবে, কমলাপুর থেকে অন্য অঞ্চলের ট্রেনের শিডিউলে বিপর্যয় ঘটেনি। তবুও নাড়ির টানে বাড়ি ফিরছে মানুষ।
রাজধানীর সদরঘাটে দুই লঞ্চের সংঘর্ষে একজন নিহত হয়েছেন। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের চন্দ্রায় গতকাল বুধবার সকাল থেকে কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত ২০ কিলোমিটারের বেশি এবং ঢাকা- চট্টগ্রাম মহাসড়কে কুমিল্লার চান্দিনায় মাধাইয়া এলাকায় দুর্ঘটনার জেরে যানজট ও দুর্ভোগের খবর পাওয়া গেছে। বিকেলে গাজীপুরের কয়েকশ গার্মেন্ট কারখানা ছুটি হওয়ায় যানজটের তীব্রতাও বাড়ে। রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, গাবতলী, মহাখালী, সায়েদাবাদ, গুলিস্তান, ফুলবাড়িয়া এলাকায় টার্মিনাল ও বাস কাউন্টারগুলোয় বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যাত্রীর চাপ ছিল লক্ষ্যণীয়। গন্তব্যে যেতে নির্ধারিত ভাড়ার চাইতে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ ছিল অহরহ। অতিরিক্ত খরচ এড়াতে নিম্ন আয়ের মানুষদের পিকআপ, ট্রাক, গ্যাসচালিত অটোরিকশায় করে গন্তব্যে যেতে দেখা গেছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ঢাকা থেকে উত্তরবঙ্গের প্রবেশ ও বাহির দ্বার বলে খ্যাত আন্তঃজেলা পরিবহন কেন্দ্র গাবতলী বাস টার্মিনালে ছিল ঘরমুখো মানুষের ভিড়। দেশের বিভিন্ন জেলায় প্রিয়জনদের সঙ্গে সময় কাটাতে রাজধানী ছাড়ছেন হাজারো মানুষ। ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত যাত্রীদের উপস্থিতিতে মুখর ছিল পুরো টার্মিনাল এলাকা। কেউ টিকিটের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে, কেউবা পরিবার-পরিজন নিয়ে বাসের অপেক্ষায় বসে আছেন। আবার টিকিট পেতে অনেককেই ঘাম ঝড়াতে হয়েছে। উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলা, খুলনা ও বরিশাল রুটের যাত্রীদের চাপ সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করা গেছে গাবতলীতে। গতকাল এ টার্মিনাল পরিদর্শন করেন সড়কপরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘ঈদযাত্রায় বাসে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ উঠলেও এর সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি।’
রংপুরগামী যাত্রী মো. আব্দুল করিম বলেন, ‘আগে থেকে টিকিট কাটা ছিল না, তাই খুব সকালে আসছি। দুপুর ৩টার দিকে টিকিট পেয়েছি। টিকিটের দামও একটু বেশি ছিল। ৩টা টিকিটে ৬০০ টাকা বেশি গুনতে হলেও বাড়ি ফেরার আনন্দটাই মুখ্য।’
রাজশাহীগামী ‘দেশ ট্রাভেলস’ পরিবহনের কাউন্টার মাস্টার সোহেল রানা বলেন, ‘আসন অনুসারে যাত্রী পরিবহন করা হয়। ৮৩০ টাকা করে ভাড়া নির্ধারণ করা ছিল। অনলাইন বা সরাসরি যেখানেই টিকিট সংগ্রহ করুক না কেন কোনো যাত্রীর কাছ থেকে বেশি টাকা আমরা নিচ্ছি না।’
কুষ্টিয়াগামী পোশাককর্মী রোজিনা আক্তার বলেন, ‘ মঙ্গলবার রাতে আমাদের ছুটি হয়েছে। কবে বাড়িতে যাব অনিশ্চিত ছিল। অগ্রিম টিকিটও নেওয়া হয়নি। অনেক ঝামেলার পর ৬০০ টাকার ভাড়া ৭০০ টাকা দিয়ে ২টা টিকিট পেয়েছি।’
‘রাজবাড়ী পরিবহন’র কাউন্টারের সামনে বসে থাকা যাত্রী রুবিনা আক্তার দেশ রূপান্তরকে বলেন, টিকিট কিনতে তাকে অতিরিক্ত টাকা দিতে হয়নি। তিনি বলেন, ‘সকাল থেকে বসে আছি। টার্মিনালে অনেক ভিড়ে নারী ও শিশুদের বসে থাকা কষ্টকর। বসার জায়গা নেই, শৌচাগারের অবস্থাও ভালো না। যা আছে তা ব্যবহার করা যায় না।’
বগুড়াগামী শিক্ষার্থী সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘অনলাইনে টিকিট পাইনি, এখানে এসে অনেক ঝামেলা পোহাতে হয়েছে। তারপরও নিরাপত্তা মোটামুটি ভালো মনে হয়েছে।’
রাজবাড়ী পরিবহনের কন্ডাক্টর রাজু বলেন, ‘দালালদের কারণে অনেক সময় সমস্যার সৃষ্টি হয়। আমরা চেষ্টা করছি তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে। যাত্রীসেবায় আমরা কোনো অনিয়মের কাজ করব না।’
রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জগামী ‘ন্যাশনাল ট্রাভেলস’র ব্যবস্থাপক আরমান বলেন, ‘সরকার নির্ধারিত ভাড়ায় টিকিট বিক্রির চেষ্টা করছি। ঢাকা-চাঁপাইনবাগঞ্জ টিকিটের ভাড়া ৮৩০ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে।’ তবে, ফিরতি পথে বাস খালি আসছে বলে জানান তিনি।
ঈদযাত্রাকে কেন্দ্র করে গাবতলী বাস টার্মিনাল এলাকার নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। পুলিশ, র্যাব ও আনসার সদস্যদের টহল ছিল চোখে পড়ার মতো। টার্মিনালের প্রবেশ ও প্রস্থান পথে বাড়ানো হয়েছে নজরদারি। পুলিশের কর্তব্যরত এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তকে বলেন, ‘যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছি। অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, দালাল চক্রের তৎপরতা এবং চুরি-ছিনতাই ঠেকাতে বিশেষ টিম কাজ করছে। আশা করি, ঈদের মধ্যে যাত্রীরা কোনো প্রকার হয়রানির শিকার হবেন না।’ গাইবান্ধাগামী কলেজছাত্র মাহমুদুল হাসান নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে সন্তুষ্টির কথা জানিয়ে বলেন, ‘এবার আগের চেয়ে কিছুটা শৃঙ্খলা আছে। পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবকরা কাজ করছে, বিশৃঙ্খলা কম মনে হচ্ছে।’
রাজধানীর মহাখালী বাস টার্মিনালে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যাত্রীর চাপ বেড়েছে। এ টার্মিনাল থেকে ময়মনসিংহ, জামালপুর, শেরপুর, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জসহ বেশকিছু জেলার বাস নিয়মিত ছেড়ে যায়। গতকাল ভোর থেকেই যাত্রীদের অনেকে টিকিট পেতে লাইনে দাঁড়ান। কিন্তু দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থেকেও অনেকে টিকিট না পাওয়ার অভিযোগ করেন। তবে, পরিবহনসংশ্লিষ্টরা বলেন, মহাখালী টার্মিনাল থেকে ছেড়ে যাওয়া সব বাসকেই যেতে হয় গাজীপুর হয়ে। গতকাল গাজীপুরের চন্দ্রাসহ কয়েকটি এলাকায় যানজট ছিল। তাই ফিরতি পথে গাড়িগুলো আসতে দেরি হওয়ায় টিকিট দিতে সময় লেগেছে।
রাজধানীর দক্ষিণ যাত্রাবাড়ী এলাকায় কাঁধে ট্রাভেল ব্যাগ নিয়ে বিভিন্ন বাস কাউন্টারে ইতিউতি করছিলেন এক ব্যক্তি। কথা প্রসঙ্গে রাজীব আকন্দ নামের এই যুবক দেশ রূপান্তরকে বলেন, তিনি তেজগাঁও কলেজে এমবিএ পড়ছেন। ঈদের লম্বা ছুটিতে বরিশাল হয়ে যাবেন গ্রামের বাড়ি পিরোজপুরের ভা-ারিয়ায়। কিন্তু বরিশালগামী কয়েকটি পরিবহনে যোগাযোগ করে তিনি জানতে পেরেছেন ৫০০/ ৫৫০ টাকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘ঈদযাত্রা নিয়ে এখন পর্যন্ত মোটামুটি স্বস্তির খবর পাচ্ছি। কিন্তু বাড়তি ভাড়া কেন দিতে হবে, তার উত্তর পাচ্ছি না। তারপরও যেতে হবে। ঈদ আনন্দ বলে কথা!’
যাত্রাবাড়ী থেকে পদ্মাসেতুমুখী বরিশাল, পটুয়াখালী, পিরোজপুর, যশোর, খুলনা, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, ফরিদপুর, নড়াইলসহ অন্তত ২০ জেলায় যেতে গত মঙ্গলবার যাত্রীর চাপ কম থাকলেও গতকাল উপচেপড়া ভিড় দেখা গেছে। সবচে বেশি ভিড় দেখা গেছে, বরিশাল ও নড়াইলগামী পরিবহনগুলোয়। কোনো কোনো কাউন্টারে দেখা গেছে টিকিটের জন্য যাত্রীদের দীর্ঘ সারি। অয়ন ইসলাম নামে এক ব্যক্তি বলেন, তিনি যাবেন ফরিদপুর। ‘গোল্ডেন লাইন’ পরিবহনে তার কাছ থেকে ভাড়া নিয়েছে ৫০০ টাকা। এমনিতে ৩০০-৪০০ টাকায় তিনি ফরিদপুর যান। গোল্ডেন লাইন পরিবহনের সুপারভাইজার মাসুমকে প্রশ্ন করা হলে তিনি ১০০ টাকা করে বাড়তি ভাড়া নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করলেও কারণ বলতে চাননি। পদ্মাসেতু হয়ে নড়াইলগামী ‘নড়াইল এক্সপ্রেস’ কাউন্টারের সামনে টিকিটের জন্য যাত্রীদের লম্বা সারি দেখা গেছে। টুটুল নামে এক ব্যক্তি দেশ রূপান্তরকে বলেন, নড়াইলে গ্রামের বাড়িতে যাবেন। কিন্তু ভাড়া শুনে তিনি থ হয়ে গেছেন। ৩০০/ ৩৫০ টাকার ভাড়া নিচ্ছে ৬০০ টাকা । দাঁড়িয়ে গেলে ৫০০ টাকা। তিনি বলেন, ‘স্বল্প আয়ের মানুষ আমরা। অতিরিক্ত ভাড়ায় চাপ পড়বে। কিন্তু তারপরও পরিবারের সঙ্গে ঈদ করতে যাচ্ছি।’
দক্ষিণ যাত্রাবাড়ী এলাকায় বিআরটিসি দোতলা একটি বাসের চালক ও কন্ডাক্টর জোরেশোরে ‘বরিশাল ৬০০’ বলে যাত্রীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই দোতলা বাসের নিচতলা প্রায় পরিপূর্ণ হয়ে যায়। ‘স্কয়ার’ পরিবহন নামে একটি ডাবল ডেকার এসি বাসে হাঁক দিয়ে বরিশালের যাত্রী তুলতে দেখা গেছে। বাসের উপরতলায় সিøপিং সিটে ১ হাজার ২০০ এবং নিচে বিজনেস ক্লাসে ১ হাজার টাকা করে টিকিট বিক্রি করতে দেখা গেছে। একটু স্বস্তির আশায় যাত্রীরাও হুমড়ি খেয়ে পড়ছিলেন সেখানে।
বরিশালগামী ‘কাশফুল’ নামে একটি লোকাল পরিবহনের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন জহিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, বরিশাল যেতে সায়েদাবাদের কয়েকটি পরিবহনে চেয়েছে ৬০০ টাকা। যাত্রাবাড়ী এলাকায় ৭০০ টাকা করে। আর দক্ষিণ যাত্রাবাড়ী এলাকায় ৮০০ টাকা করে। তিনি বলেন, ‘৮০০ টাকাতেই টিকিটি কিনেছি। বাড়ি তো যেতে হবে।’ খুলনাগামী ‘সুন্দরবন’ পরিবহনের কন্ডাক্টর মাহমুদ বলেন, এমনিতে ৫০০ টাকা ভাড়া হলেও ঈদ উপলক্ষে ১০০ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে। যাত্রীরাও খুশি হয়ে দিচ্ছেন।
ফরিদপুরগামী ‘সূর্যমুখী’ পরিবহনের সুপারভাইজার জুয়েল রানা বলেন, দুই ট্রিপে (আসতে যেতে) জ¦ালানি তেল, টোল ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে ১৯ হাজার টাকার মতো খরচ হয়। প্রতি ট্রিপে পর্যাপ্ত যাত্রী থাকলে দুই ট্রিপে ভাড়া আসে ২৫ হাজার টাকার মতো। কিন্তু রমজান মাস শুরুর পর যাত্রী তেমন নেই। জ¦ালানি তেলও মিলছে না সহজে। আর ঈদের লম্বা ছুটির কারণে যাত্রী কমে গেছে। তাই পুষিয়ে নিতে কিছু ভাড়া বেশি নিতে হচ্ছে।
দুপুর দেড়টার দিকে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে বিপরীত চিত্র। সেখানে যাত্রীর চাপ নেই বললেই চলে। সায়েদাবাদ থেকে সিলেট, চাঁদপুর, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, কুমিল্লার উদ্দেশে বাস ছেড়ে যায়। সিলেটগামী ‘মিতালী পরিবহন’র কন্ডাক্টর বাসের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন টিকিট নিয়ে। কিন্তু যাত্রী তেমন নেই। তিনি বলেন, ‘নিয়মিত ভাড়া ৫০০ টাকা করে। যাত্রীই নেই, ভাড়া বেশি নেওয়ার সুযোগ কই!’ সায়েদাবাদ থেকে কুমিল্লাগামী ‘তিশা প্লাস’ পরিবহনের কন্ডাক্টর আরমান ২৫০ টাকা করে হাঁকছিলেন। আলাপকালে তিনি বলেন, যাত্রী মোটামুটি আছে। তবে, আসার পথে গাড়ি প্রায় খালি আসছে। তাই ঢাকা থেকে যাত্রা পথে ৫০ টাকা বেশি নিচ্ছেন তারা। এদিকে ঈদ উপলক্ষে ট্রেনযাত্রায় গত কয়েক দিন স্বস্তি থাকলেও গতকাল সান্তাহারে দুর্ঘটনায় ‘পঞ্চগড় এক্সপ্রেস’ ছাড়তে বিলম্ব হয়। তবে, অন্য প্রায় সব ট্রেনই সময়মতো ছেড়ে গেছে রাজধানীর কমলাপুর স্টেশন থেকে।
সদরঘাটে দুই লঞ্চের সংঘর্ষে নিহত ১, সান্তাহারে ট্রেন দুর্ঘটনায় আহত অর্ধশত
বগুড়া ও কেরানীগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, গতকাল বগুড়ার সান্তাহারে ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে চিলাহাটিগামী ‘নীলসাগর এক্সপ্রেস’ ট্রেনের ৯টি বগি লাইনচ্যুত হয়েছে। এ দুর্ঘটনায় রাত ৯টা পর্যন্ত কোনো মৃত্যুর খবর না পাওয়া গেলেও ৫০ জনেরও বেশি যাত্রী কমবেশি আহত হয়েছেন। তারা পরিবারের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে যাচ্ছিলেন। আহত যাত্রী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ট্রেনের এ দুর্ঘটনা চালকের অসচেতনতার কারণে ঘটেছে। অন্যদিকে, ঢাকার সদরঘাটে বিকেলে ঘটেছে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। দুই লঞ্চের সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছেন ২২ বছর বয়সী যুবক সোহেল ফকির। গুরুতর আহত হয়েছেন তার স্ত্রী রূপা আক্তার। নিহত সোহেলের বাবা মিরাজ (৪০)সহ অন্তত দুজন নিখোঁজ রয়েছেন। বুধবার বিকেলে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালের ১৪ নম্বর পন্টুনের সামনে এ দুর্ঘটনা ঘটে। হতাহতরা ঈদের ছুটি কাটাতে বাড়ি যাচ্ছিলেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ঢাকা-ইলশা রুটের ‘আসা যাওয়া-৫’ লঞ্চে ট্রলার দিয়ে যাত্রী তোলা হচ্ছিল। এ সময় পেছন থেকে ‘এম ভি জাকির সম্রাট-৩’ নামের আরেকটি লঞ্চ ধাক্কা দেয়। ধাক্কার আঘাতে অপেক্ষমাণ লঞ্চের দুই যাত্রী দুই লঞ্চের চাপায় পিষ্ট হন। এর মধ্যে সোহেলের স্ত্রী আহত অবস্থায় পানিতে পড়ে গেলেও সোহেল ঘটনাস্থলেই মারা যান। দুর্ঘটনার পর আশপাশের লোকজন তার স্ত্রীকে দ্রুত উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, বিকেল ৫টার দিকে একটি লঞ্চ সদরঘাট ছেড়ে যাওয়ার জন্য পেছাতে (ব্যাকগিয়ার) শুরু করলে ইঞ্জিনচালিত একটি নৌকা দুই লঞ্চের চাপায় পড়ে। এ সময় এক যাত্রীর পা টুকরো হয়ে কেটে যায় এবং আরেকজন পিষ্ট হয়ে পানিতে পড়ে যান।
সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে দায়িত্বরত নৌপুলিশ সদস্য ইশতিয়াক আহমেদ বলেন, ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে নৌপুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। সেখানে লঞ্চের গায়ে রক্ত লেগে থাকতে দেখা যায়। আরেকজনকে নদী থেকে উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিস হাসপাতালে পাঠায়। দুর্ঘটনার পর সদরঘাটে সাধারণ যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরে পুলিশের তৎপরতায় পরিস্থিতি কিছুক্ষণের মধ্যেই স্বাভাবিক হয়ে আসে।
এদিকে সংস্কার চলমান রেললাইনে কর্র্তৃপক্ষের লাল ফ্ল্যাগ দেখানোর পরও চালকের অসচেতনতায় বগুড়ার সান্তাহারে ঢাকা থেকে চিলাহাটিগামী নীলসাগর এক্সপ্রেসের ৯টি বগি লাইনচ্যুত হয়েছে। এতে ৫০ জনের অধিক যাত্রী আহত হয়েছেন। গতকাল দুপুর আড়াইটার দিকে আদমদীঘি উপজেলার সান্তাহারের ছাতিয়ান গ্রামের বাগবাড়ি এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এতে উত্তরবঙ্গের ৫ জেলার সঙ্গে ঢাকার রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে উদ্ধারকাজ শুরু হয়।
সান্তাহার রেলওয়ে স্টেশন ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দুপুর ২টার দিকে ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা নীলসাগর এক্সপ্রেস সান্তাহার জংশনে পৌঁছে। সোয়া ২টার দিকে স্টেশন ছেড়ে নীলফামারীর উদ্দেশে রওনা হয়। পথিমধ্যে সান্তাহার থেকে ৩-৪ কিলোমিটার দূরে তিলকপুর বাগবাড়ি এলাকায় পৌঁছালে মাঝখান থেকে এক এক করে ৯টি বগি লাইনচ্যুত হয়। ট্রেনের ছাদে থাকা যাত্রীরা পড়ে গিয়ে আহত হন; অনেকে লাফ দিয়ে প্রাণ বাঁচান।
স্থানীয়রা জানান, সকাল থেকেই ওই এলাকায় রেললাইন সংস্কার চলছিল। প্রতিটি ট্রেন ধীরগতিতে পার হচ্ছিল। কিন্তু নীলসাগর এক্সপ্রেসের লোকোমাস্টার লাল পতাকার সিগন্যাল অমান্য করে দ্রুতগতিতে চলায় দুর্ঘটনা ঘটে। ট্রেনের ভেতরে হাজারো যাত্রী ছাড়াও ছাদে থাকা যাত্রীর মধ্যে অধিকাংশের হাত-পা ভাঙাসহ দেহের বিভিন্ন অংশে আঘাত লাগে। প্রাথমিকভাবে কোনো নিহতের খবর পাওয়া যায়নি। আদমদীঘি ফায়ার সার্ভিস শতাধিক আহতকে উদ্ধার করে নওগাঁ সদর হাসপাতাল ও আদমদীঘি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠায়। এর মধ্যে ৮০ জন নওগাঁ সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নেন; বর্তমানে ১৭ জন গুরুতর অবস্থায় চিকিৎসাধীন।
নীলসাগর এক্সপ্রেসের যাত্রী পারভেজ জানান, সকালে ঢাকা থেকে নীলফামারীর উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন। সান্তাহার পার হওয়ার পর হঠাৎ বিশাল ঝাঁকুনিতে ঘুম ভেঙে যায়। লোকজনের চিৎকারে ভয় পেয়ে যান। পরে দেখেন ট্রেন লাইনচ্যুত হয়েছে।
ট্রেনের ছাদে থাকা রমজান নামে এক যাত্রী বলেন, গার্মেন্টসের ছুটি হয়েছে, টিকিট পাইনি। জয়পুরহাট যাওয়ার জন্য ছাদে উঠি। বগি লাইনচ্যুত হলে লাফ দিয়ে জমিতে পড়ি। পায়ে ব্যথা পেয়েছি। সান্তাহার রেলওয়ে থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মাহফুজুর রহমান বলেন, স্টেশন ছেড়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরেই দুর্ঘটনা ঘটে। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে উদ্ধারকারী বিশেষ ট্রেন এসেছে। ধারণা করা হচ্ছে রাতের মধ্যেই রেল চলাচল স্বাভাবিক হবে।
এ দুর্ঘটনায় উত্তরবঙ্গগামী যাত্রীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। চিলাহাটিগামী নীলসাগর এক্সপ্রেসের বেশ কয়েকটি বগি লাইনচ্যুত হওয়ায় উত্তরাঞ্চলের একাংশের সঙ্গে সারা দেশের রেল যোগাযোগ সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। বিভিন্ন স্টেশনে ট্রেন আটকা পড়ে।
