ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের এবারকার আগ্রাসন চতুর্থ সপ্তাহে গড়ানোর পর দেশটির সঙ্গে নেপথ্যে পরোক্ষভাবে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার কথা বলতে শুরু করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
ইরান অবশ্য আলোচনার বিষয়ে ট্রাম্পের বক্তব্যকে ‘যুদ্ধের গতিপথ বদলানোর চেষ্টা’ হিসেবে দেখছে। দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস আরজিসির দাবি, শত্রুপক্ষের যুদ্ধের গতিপথ বদলানোর চেষ্টা তাদের নজর এড়িয়ে যায়নি। যেকোনো নতুন আগ্রাসনের নির্দেশদাতা, বাস্তবায়নকারী ও সমর্থকদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কঠোর আঘাত হানা হবে বলে ইরান হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে।
কয়েকটি দেশের মধ্যস্থতায় যুদ্ধ থামাতে আলোচনার ক্ষেত্র প্রস্তুত করার কথা প্রকাশ্যে এলেও বাস্তবে যুদ্ধের ২৪তম দিন গতকাল মঙ্গলবারও ইরান এবং ইসরায়েল হামলা অব্যাহত রেখেছে।
ইরান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মাধ্যমে টানা পাল্টা জবাব দেওয়ার পর চতুর্থ সপ্তাহে এসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধকৌশলে পরিবর্তন আনার আভাস দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প গত শনিবার ইরানকে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খোলার ঘোষণা দেওয়ার জন্য ৪৮ ঘণ্টা সময় বেঁধে দেন। তা না হলে ইরানের প্রধান বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়ারও হুমকি দেন। এমন হামলা হলে ইরান পুরো পারস্য উপসাগর অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামোয় বড় ধরনের হামলা চালানোর হুঁশিয়ারি দেয়।
পাল্টাপাল্টি হুমকির মধ্যে বৈশি^ক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। জ্বালানি তেলের দাম আবার বাড়তে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। উত্তেজনা কমাতে যুক্তরাষ্ট্রের ইঙ্গিতে পাকিস্তান, মিসর ও তুরস্ক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে গত রবিবার সামনে এসেছে। এ দেশ তিনটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদানের মাধ্যমে সংকট নিরসনের চেষ্টা চালাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তাদের পাকিস্তানে মুখোমুখি বসানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
একপর্যায়ে নেপথ্যের আলোচনায় অগ্রগতি হচ্ছে এমন দাবি করে ট্রাম্প ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রে সম্ভাব্য সামরিক হামলার পরিকল্পনা পাঁচ দিনের জন্য স্থগিত রাখার কথা জানান। তিনি হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে আলোচনায় অগ্রগতির ইঙ্গিত দেন। সোমবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনায় ‘প্রধান প্রধান বিষয়ে ঐকমত্য’ হয়েছে। তিনি বলেন, আলোচনা সারা সপ্তাহ চলবে এবং সাফল্যের ওপর নির্ভর করবে পরবর্তী পদক্ষেপ।
ট্রাম্পের এমন দাবির সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির বেশ ফারাক আছে, এমনটা মনে করেন বিশ্লেষকরা। তবে তারা মনে করেন, সরাসরি আলোচনা না হলেও পরোক্ষ কূটনীতির এ উদ্যোগ পরিস্থিতি শান্ত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ তৈরি করতে পারে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ট্রাম্পের দাবিটি স্পষ্টভাবে নাকচ করে দিয়ে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘সরাসরি’ কোনো আলোচনা হয়নি। তবে কিছু আঞ্চলিক দেশ উত্তেজনা কমাতে চেষ্টা করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারমাণবিক অস্ত্রের আলোচনা চলমান থাকা অবস্থায় গত ২৮ অক্টোবর তেহরানে হামলা হওয়ায় ইরান এবারকার আলোচনার বিষয়ে গভীর সন্দেহ পোষণ করছে। ইরানের অভিযোগ, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে এবং সামরিক প্রস্তুতির সময় বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্র সরকার আলোচনার কথা বলছে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলা শুরুর পর ২৮ ফেব্রুয়ারি সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ও পরবর্তীকালে নিরাপত্তা প্রধান আলি লারিজানিসহ ঊর্ধ্বতন অন্তত ৪০ জন নিহত হন।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলছেন, তিনি এমন একজন ইরানি নেতার খোঁজ করছেন, যিনি আলোচনায় নমনীয় হবেন। ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ যেমনটি ছিলেন। তবে বিশ্লেষকরা মনে করেন, ইরানে কট্টরপন্থি ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ ও সামরিক কমান্ডারদের প্রভাব থাকায় দেশটির জটিল রাজনৈতিক কাঠামোয় ট্রাম্পের এ প্রত্যাশা পূরণ হওয়া কঠিন।
অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের সূত্রের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক কয়েকটি গণমাধ্যম বলছে, পাকিস্তান, মিসর ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা আলাদাভাবে হোয়াইট হাউজের প্রতিনিধি স্টিভ উইটকফ ও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সঙ্গে কথা বলছেন। সূত্রগুলোর দাবি, আলোচনার মূল লক্ষ্য হচ্ছে যুদ্ধের অবসান ও অমীমাংসিত ইস্যুগুলোর সমাধান। এ ক্ষেত্রে নেপথ্যের এ মধ্যস্থতা প্রক্রিয়ায় কিছু অগ্রগতি হচ্ছে। তবে পূর্ণাঙ্গ বা আনুষ্ঠানিক আলোচনা সম্ভবত এখনো শুরু হয়নি। এ কারণে পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত অনিশ্চিত এবং যুদ্ধ চলতে থাকার ঝুঁকি রয়েই গেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য শান্তি আলোচনায় মধ্যস্থতার চেষ্টা করছে পাকিস্তান। দেশটির সেনাপ্রধান আসিম মুনির গত রবিবার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে চলমান সংঘাত নিয়ে ফোনে কথা বলেছেন। হোয়াইট হাউজ বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। আগামী সপ্তাহেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে এ আলোচনা শুরু হতে পারে। তবে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি হয়নি এবং স্থান হিসেবে ইসলামাবাদও চূড়ান্ত নয়। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রতিনিধির ভূমিকা নিতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পরোক্ষ আলোচনার প্রস্তুতির মধ্যে ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের (এসএনসিসি) সেক্রেটারি পদে আইআরজিসির জ্যেষ্ঠ কমান্ডার মোহম্মদ বাগের জোলঘাদরকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তিনি লারিজানির স্থলাভিষিক্ত হলেন। বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির অনুমোদনক্রমে এ নিয়োগ দেওয়া হয়।
জোলঘাদরের নিয়োগের পরপরই ইরান ঘোষণা দেয়, দেশটির সামরিক বাহিনী এখন থেকে ‘শুধু প্রতিরক্ষা নয়, আক্রমণাত্মক নীতিতে’ চলবে। খাতাম আল-আনবিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার্সের প্রধান মেজর জেনারেল আলি আবদোল্লাহি রবিবার এক বার্তায় বলেন, ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রতিরক্ষায় সশস্ত্র বাহিনীর মতবাদ এখন প্রতিরক্ষামূলক থেকে আক্রমণাত্মকে পরিবর্তিত হয়েছে। আমরা যুদ্ধক্ষেত্রের কৌশলও সেই অনুযায়ী বদলে ফেলেছি।’ তিনি বলেন, নতুন নীতির আওতায় যুদ্ধক্ষেত্রের পুরো কৌশলই ঢেলে সাজানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের স্বার্থ লক্ষ্য করে প্রতিশোধমূলক আক্রমণ চালানো হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নেপথ্যে আলোচনার চেষ্টার মধ্যে ইরান ও ইসরায়েল হামলা অব্যাহত রেখেছে। আইআরজিসি গতকাল জানিয়েছে, ইসরায়েলের রাজধানী তেল আবিবসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি এলাকা ও পারস্য উপসাগর তীরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোয় লক্ষ্যভেদী হামলা করা হয়েছে।
তেল আবিবের মেয়র রন হুলদাই বলেন, ইরান গতকাল ১০ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে তেল আবিব ও পারমাণবিক কেন্দ্রের শহর ডিমোনাসহ বিভিন্ন স্থানে সাত দফা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। ইসরায়েল কর্মকর্তারা মনে করছেন, ইরানের ছোড়া ওয়ারহেডগুলোর প্রতিটিতে ১০০ কেজি করে বিস্ফোরক ছিল। এসব হামলায় কয়েকটি ভবন পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে। কমপক্ষে ২০০ ব্যক্তি আহত হয়েছে। এর মধ্যে ১১ জনের অবস্থা গুরুতর।
অন্যদিকে, ইসরায়েলও ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপনস্থলসহ প্রায় ৫০টি লক্ষ্যবস্তুতে বিমান হামলা চালিয়েছে।
এর বাইরে আইআরজিসি ইরাকের এরবিলে অবস্থিত ইরানবিরোধী কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর ঘাঁটিতে গতকাল ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এ হামলায় ছয়জন নিহত হয়েছে। দুজন নিখোঁজ রয়েছে। আর ২২ জন আহত হয়েছে। এরবিলে স্থানীয় কুর্দি সরকার ইরানের এ হামলার নিন্দা জানিয়েছে। আর ইরান বলছে, এসব ঘাঁটি থেকে ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হচ্ছিল।
যুক্তরাষ্ট্র গতকাল অভিযোগ করছে, হরমুজ প্রণালিতে পানির নিচে ইরান ১২টি উন্নত বিস্ফোরক-মাইন স্থাপন করেছে। ইরান সামরিক বাহিনী অবশ্য এ দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, হরমুজ প্রণালি তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। পর্যাপ্ত আধিপত্য ও সক্ষমতা থাকায় পারস্য উপসাগরে মাইন স্থাপনের কোনো প্রয়োজন নেই।
এর বাইরে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান ও ভারতসহ বিভিন্ন দেশ জ্বালানিসহ পণ্যবাহী জাহাজ চলাচলের জন্য হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে ইরানের ওপর চাপ অব্যাহত রেখেছে।
