মাতৃভূমির প্রতি মুমিনের দায়িত্ব

আপডেট : ২৯ মার্চ ২০২৬, ০২:৫৯ এএম

ইসলাম মানুষের জীবনকে একটি পরিপূর্ণ কাঠামোর মধ্যে দেখতে চায়। এখানে ইবাদত যেমন অপরিহার্য, তেমনি সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি দায়বদ্ধতাও গুরুত্বপূর্ণ। একজন মুমিন তার ব্যক্তিগত জীবনকে পরিশুদ্ধ করার পাশাপাশি সমাজকে সুন্দর ও কল্যাণমুখী করে তোলার দায়িত্বও বহন করে। আজকের বিশে^ যখন বিভক্তি, স্বার্থপরতা ও মূল্যবোধের অবক্ষয় ক্রমেই প্রকট হচ্ছে, তখন মুসলিম সমাজের সামনে নতুন করে দায়িত্ব এসে দাঁড়িয়েছে। নিজেদের ইমানি চেতনা থেকে দেশকে ভালোবাসা, মানুষের কল্যাণে কাজ করা এবং ন্যায় ও শান্তির পথে অটল থাকা এখন সময়ের দাবি। এই চেতনা থেকেই গড়ে উঠতে পারে একটি সুশৃঙ্খল, মানবিক ও সমৃদ্ধ সমাজ।

ইসলামের ইতিহাসে দেখা যায়, নবী-রাসুলরা তাদের মাতৃভূমিকে ভালোবাসতেন, দেশের শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় কাজ করতেন এবং জনগণের কল্যাণে দোয়া করতেন। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনে দেশপ্রেমের নিদর্শন অসংখ্যবার ফুটে উঠেছে। মক্কা থেকে হিজরতের সময় তার কণ্ঠে যে কষ্ট ফুটে উঠেছিল, তা নিছক আবেগ নয়, বরং মাতৃভূমির প্রতি একজন নবীর গভীর ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ।

আজকের বৈশ্বিক বাস্তবতায় মুসলিম সমাজকে আরও বেশি সচেতন হতে হবে। সক্রিয়ভাবে দেশের শান্তি, উন্নয়ন ও পরিবেশ রক্ষায় অংশ নিতে হবে। একজন মুমিন কেবল নিজ ধর্মীয় অনুশীলনেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং জাতীয় সম্পদ রক্ষা, সামাজিক ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা এবং ঐক্য সংহতির ভিত্তিতে দেশ গঠনে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে।

মুমিন মুসলমানের অন্যতম দায়িত্ব ও কর্তব্য হলো নিজ মাতৃভূমিকে আগলে রাখা, নিজ দেশের সব শ্রেণি, ধর্ম ও বর্ণের মানুষকে ভালোবাসা, দেশের উন্নয়নে কাজ করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। এ ছাড়াও দেশকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে দেশের প্রতি মুমিনের আরও যেসব দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে, তা তুলে ধরা হলো।

দেশকে ভালোবাসা : মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসা রাখা মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। সব নবী-রাসুলই নিজ নিজ মাতৃভূমিকে ভালোবাসতেন। সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন আমাদের প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। এ জন্য মহান আল্লাহ তাকে মাতৃভূমি মক্কায় ফিরিয়ে আনার ঘোষণা দেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই যিনি আপনার জন্য কোরআনকে বিধান করেছেন তিনি আপনাকে অবশ্যই জন্মভূমিতে ফিরিয়ে আনবেন।’ (সুরা কাসাস ৮৫)

দেশের কল্যাণ কামনা করা : মুমিন সব সময় দেশের কল্যাণ চায়। সে কখনো দেশের অকল্যাণ চায় না। কোরআনে মুমিনদের দোয়া শেখানো হয়েছে, ‘স্মরণ করো, যখন ইব্রাহিম বলেছিলেন, হে আমার প্রতিপালক! এটাকে নিরাপদ শহর করুন। আর এর অধিবাসীদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ইমান রাখে তাদের ফলমূল দ্বারা জীবিকা প্রদান করুন।’ (সুরা বাকারা ১২৬)

শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা করা : মুমিনের অন্যতম দায়িত্ব হলো সমাজের শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা করা। শান্তিশৃঙ্খলার পরিপন্থি কোনো কাজ না করা। কেননা সমাজে শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা না হলে নানা ধরনের অরাজকতায় ভরে ওঠে আমাদের চারপাশ। সৃষ্টি হয় নানা ধরনের আতঙ্ক। আর মুমিন ব্যক্তি সমাজ থেকে সব ধরনের অরাজকতা দূর করতে কাজ করে এবং অরাজকতা দূর করার পর তাতে শৃঙ্খলা বজায় রাখে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘শান্তি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তোমরা জমিনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি কোরো না।’(সুরা আরাফ ৫৬)

নিরাপত্তা নিশ্চিত করা : দেশ ও জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব প্রধানত রাষ্ট্রের। তবে যেহেতু মানুষই অপরাধ কর্মের অনুঘটক, তাই ইসলাম মানুষকে অন্যের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নষ্ট হয়, এমন সব কিছু থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না।’ (সুরা বাকারা ১৮৮) রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয়ই তোমাদের জীবন, সম্পদ ও সম্ভ্রম পরস্পরের জন্য নিষিদ্ধ।’ (সহিহ বুখারি)

দেশের উন্নয়নে কাজ করা : দেশের প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব হলো দেশ ও জাতির উন্নয়নে সচেষ্ট হওয়া। কেননা জাতির উন্নয়নের চাবিকাঠি মহান আল্লাহ তাদের হাতেই দিয়ে রেখেছেন। তিনি বলেন, ‘আল্লাহ কোনো সম্প্রদায়ের অবস্থার পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজ অবস্থা নিজে পরিবর্তন করে।’ (সুরা রাদ ১১)

পরিবেশ রক্ষা করা : আধুনিক পৃথিবীতে পরিবেশ গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। বিজ্ঞানীদের মতে, এর ওপর নির্ভর করছে পৃথিবীর ভবিষ্যৎ। ইসলাম প্রতিটি নাগরিককে পরিবেশ রক্ষায় সচেতন হতে বলে। এ জন্য ইসলাম অনর্থক বৃক্ষনিধন, পশুপাখি হত্যা এবং জলাধার নষ্ট করা থেকে বিরত থাকতে বলেছে। বিপরীতে পরিবেশের উন্নয়ন হয় এমন কাজে উৎসাহিত করেছে। যেমন বৃক্ষরোপণ। নবী (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো বৃক্ষরোপণ করে, আল্লাহ এর বিনিময়ে তাকে ওই বৃক্ষের ফলের সমান প্রতিদান দেবেন।’ (মুসনাদে আহমদ)

জাতীয় সম্পদ রক্ষা করা : জাতীয় সম্পদ রক্ষায় প্রতিটি মুমিন সচেষ্ট হবে। যেমন ওমর ইবনে আবদুল আজিজ (রহ.) রাষ্ট্রীয় কাজ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রীয় অর্থে জ্বালানো প্রদীপ নিভিয়ে দিতেন। এ বিষয়ে একজন তাকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, ‘আমি মুসলমানের সেবায় নিয়োজিত ছিলাম, তাই তাদের সম্পদ দিয়ে প্রদীপ জ্বালিয়েছিলাম। এখন তুমি আমার অবস্থা জানতে চেয়েছ, তাই আমি আমার ব্যক্তিগত অর্থে প্রদীপ জ্বালালাম।’ (আল ইকতিসাদুল ইসলালি ২৫৬)

ঐক্যবদ্ধ থাকা : সুনাগরিক হিসেবে মুসলমানের দায়িত্ব হলো আল্লাহর নির্দেশনার ভিত্তিতে জাতীয় স্বার্থরক্ষায় ঐক্যবদ্ধ থাকা। কেননা অনৈক্য জাতিকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা সবাই আল্লাহর রশি দৃঢ়ভাবে ধরো এবং পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ো না। তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ করো, তোমরা ছিলে পরস্পর শত্রু এবং তিনি তোমাদের হৃদয়ে প্রীতির সঞ্চার করেন, ফলে তার অনুগ্রহে তোমরা পরস্পর ভাই হয়ে গেলে। তোমরা তো অগ্নিকুণ্ডের প্রান্তে ছিলে, আল্লাহ তা থেকে তোমাদের রক্ষা করেছেন।’ (সুরা আলে ইমরান ১০৩)

স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা : মুমিন দেশকে ভালোবাসে। তাই দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত থাকে। মহানবী (সা.) বলেন, ‘জাহান্নামের আগুন দুটি চোখকে স্পর্শ করবে না। আল্লাহর ভয়ে যে চোখ কান্না করে এবং আল্লাহর রাস্তায় যে চোখ (নিরাপত্তার জন্য) পাহারা দিয়ে নিদ্রাহীন রাত পার করে।’ (সুনানে তিরমিজি)

লেখক : ইসলামবিষয়ক গবেষক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত