আকামার টাকাও গিলে খাচ্ছে লোভী কফিলরা

আপডেট : ৩১ মার্চ ২০২৬, ০৮:১০ এএম

দুই বছর আগে ৮ লাখ টাকা খরচ করে সৌদি আরবের মক্কায় যান সাব্বির আহমেদ। একটি কোম্পানির হয়ে চাকরি নেন মসজিদুল হারামে। ভালোভাবেই চাকরি করছিলেন। কিন্তু সমস্যা দেখা দেয় আকামা নবায়ন করা নিয়ে। বছরে একবার আকামা বা অনুমতিপত্র নবায়ন না করলে শ্রমিকরা সৌদি আরবে অবস্থান করে কাজ করতে পারেন না। নিয়োগপ্রাপ্তকে এই আকামা দিতে হয় কোনো সৌদি নাগরিককে। সাব্বির তার কফিল (নিয়োগকর্তা) আবদুল্লাহকে এজন্য বাংলাদেশি প্রায় ৪ লাখ টাকার সমমূল্যের রিয়াল দেন। কিন্তু আবদুল্লাহ তাকে আকামা না দিয়ে টালবাহানা করতে থাকেন। একপর্যায়ে পুরো অর্থই মেরে দেন। কোনো উপায় না দেখে স্থানীয় পুলিশকে অবহিত করেন সাব্বির। কিন্তু প্রমাণ না থাকায় কোনো প্রতিকার পাননি।

সাব্বিরের মতো একই সমস্যায় পড়েন কুড়িগ্রামের জুলহাস কবীর। তিনি মদিনায় একটি খেজুর বাগানে চাকরি করছেন। এক বছর পার হওয়ার পর আকামা করতে কফিলকে ৩ লাখ টাকা দেন। কিন্তু ওই কফিলও পুরো টাকা মেরে দিয়ে বলেন আরও ৪ লাখ টাকা না দিলে আকামা করা সম্ভব হবে না। এই দুজনের মতো সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থানে আকামার সমস্যায় রয়েছেন আরও অসংখ্য বাংলাদেশি। অনেকেই আকামা করতে না পেরে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। আবার কেউ কেউ কারাগারেও আটক আছেন। শুধু টাকা মেরে দেওয়া নয়, কফিলদের বিরুদ্ধে কথা বললে তাদের ওপর নেমে আসে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন। সম্প্রতি সৌদি আরবে সরেজমিনকালে পাওয়া গেছে এ ধরনের অনেক তথ্য।

জানতে চাইলে সৌদি আরবের বাংলাদেশ দূতাবাসের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আকামা সমস্যা সেখানে জটিল আকার ধারণ করেছে। ইতিমধ্যে লক্ষাধিক শ্রমিক অবৈধ হয়ে পড়েছেন। নতুন করে যে তথ্য পাচ্ছি, তা চমকে ওঠার মতো। কফিলরাই শ্রমিকদের সঙ্গে প্রতারণা করছেন। আকামা করে দেওয়ার কথা বলে তারা শ্রমিকদের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন। বিষয়টি আমরা তদন্ত করে সংশ্লিষ্টদের অবহিত করব।’

তিনি আরও বলেন, ‘শ্রমিকদের সমস্যাগুলো সমাধানের চেষ্টা চলছে। সৌদি আরবে জীবনযাত্রার মান অনেক পরিবর্তন হয়েছে। আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হওয়ার কারণে প্রবাসী শ্রমিকরা বেশি বেকায়দায় পড়ছেন। আকামা খরচ কিন্তু কোম্পানি বা নিয়োগকর্তার দেওয়ার কথা। কিন্তু তারা তা করছেন না। সব দায় চাপিয়ে দিচ্ছেন শ্রমিকদের ওপর। আমরা চেষ্টা করছি সৌদি সরকারের সঙ্গে আলোচনা করেই বিষয়টি সমাধান করতে।’

অর্থনীতি সচল রাখার কারিগররাই বিপদে : সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখার মূল কারিগর প্রবাসী শ্রমিকরা। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয়, বিশেষ করে, সৌদি আরবসহ গালফ দেশগুলোয় বর্তমানে বাংলাদেশি শ্রমিকদের জীবন এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। ‘কফিল’ বা নিয়োগকর্তার অধীনে বুক ভরা আশা নিয়ে তারা দেশ ছেড়েছিলেন, সেই কফিলরাই হয়ে উঠেছেন তাদের কষ্টের মূল কারণ। একজন প্রবাসী শ্রমিকের বৈধভাবে বসবাসের প্রধান শর্ত হলো ‘আকামা’ বা বসবাসের অনুমতিপত্র। নিয়ম অনুযায়ী, কফিলের এই আকামা নবায়ন করার কথা। কিন্তু বর্তমানে শ্রমিকের অভিযোগ তারা আকামা নবায়নের জন্য কফিলকে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা (যা অনেক ক্ষেত্রে ৪ থেকে ৮ লাখ টাকা পর্যন্ত হয়) দিলেও কফিল সেই টাকা নিয়ে আকামা নবায়ন করছেন না। ফলে শ্রমিকরা হয়ে পড়ছেন অবৈধ। কফিলরা টাকা আত্মসাৎ করে যোগাযোগ বন্ধ করে দিচ্ছেন অথবা শ্রমিকদের ভয় দেখাচ্ছেন। বৈধ হয়েও শুধু নিয়োগকর্তার দুর্নীতির কারণে শ্রমিকরা ‘পলাতক’ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছেন।

পালিয়ে বেড়াচ্ছেন অন্তত দেড় লাখ শ্রমিক : সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সূত্রের হিসাব মতে, বর্তমানে প্রায় দেড় লাখ বাংলাদেশি শ্রমিক বিদেশের মাটিতে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। এই পলায়ন স্বেচ্ছায় নয়, বরং পরিস্থিতির শিকার হয়ে তারা বাধ্য হচ্ছেন। আকামা না থাকায় পুলিশি ধরপাকড়ের ভয়ে তারা স্বাভাবিক কাজকর্মে যেতে পারছেন না। দিনের বেলা বদ্ধঘরে লুকিয়ে থাকা এবং রাতে সামান্য আয়ের আশায় অনিশ্চিত পথে বের হওয়া এখন তাদের নিত্যদিনের রুটিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনকি অবৈধ তকমা লেগে যাওয়ায় তারা অসুস্থ হলেও হাসপাতালে যাওয়ার সাহসও পাচ্ছেন না। মক্কায় বাঙালিপাড়ায় (কবুতর চত্বর হিসেবে পরিচিত) বাংলাদেশি শ্রমিকদের আনাগোনা সবচেয়ে বেশি। বেশির ভাগ শ্রমিকই কাজ করেন ক্লিনার হিসেবে। এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় ফেনীর রুহুল, চট্টগ্রামের বশির আহমেদ, খুলনার বেলায়েত, রাজশাহীর করিম উদ্দিনসহ অন্তত ১৫ বাংলাদেশি শ্রমিকের সঙ্গে। তারা দেশ রূপান্তরকে জানান, ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা খরচ করে সৌদি আরবে এসেছেন। এখানে আসার পর কোনো কাজ পাচ্ছেন না। যারাই আসছেন, তাদের নতুন করে আকামা করতে হচ্ছে। অথচ এই আকামাটি করার কথা কোম্পানিগুলোর। কিন্তু তারা তা করছেন না।

সৌদির অবস্থা বেশি ভালো না : বর্তমানে সৌদি আরবের পরিস্থিতি খুবই নাজুক। বিশেষ করে, বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য। নির্মাণ প্রতিষ্ঠানও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আবার যেগুলো আছে, সেখানে অন্য দেশের শ্রমিকদের কাজ করার সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে। ফলে কয়েক লাখ শ্রমিক বিপদের মধ্যেই আছেন। আকামা নেই, কাজ নেই ও বেতন নেই প্রতিদিন এমন ৫০ থেকে ১০০ শ্রমিক বাংলাদেশ দূতাবাসে ভিড় করছেন। তাদের অভিযোগ, ঢাকা থেকে রিক্রুটিং এজেন্সি ও তাদের দালালরা এখানকার ফাইভ স্টার হোটেলের ছবি দেখিয়ে ১০-১২ লাখ টাকা নিয়ে সৌদি আরব পাঠিয়েছেন। কিন্তু আসার পর জানতে পারেন আসলে তাদের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে। ক্লিনিংয়ের কাজে বেতন ১০০০ থেকে ১২০০ রিয়ালের কথা বলে নিলেও শ্রমিকরা ৫০০ রিয়ালের বেশি বেতন পাচ্ছেন না। কয়েকজন শ্রমিক জানান, কোনো শ্রমিক যদি স্পনসরের বাইরে কাজ করেন বা পালিয়ে যান অথবা আকামা, বর্ডার ও শ্রম আইনের কোনো ধারা ভঙ্গ করেন, তাহলে তাকে আইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো আটক করে সৌদি সরকারের অর্থায়নে ডিপোর্টেশন সেন্টারের মাধ্যমে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে পারে। সেই ক্ষেত্রে তারা সেটাই করছে। মোটকথা, সৌদি আরবে শ্রমবাজার এখন খুবই খারাপ।

চরম অনিশ্চয়তায় প্রবাসী জীবন : বৈশ্বিক মন্দা বা অর্থনৈতিক অস্থিরতার সময়ও দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখতে রেমিট্যান্স অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ২০২৫ সালে দেশে মোট রেমিট্যান্স এসেছে ৩২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার, যা অন্য যেকোনো বছরের চেয়ে বেশি। ইতিমধ্যে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার কারণে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় থাকা মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালাচ্ছে ইরান। এতে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত প্রায় ৬০ লাখ বাংলাদেশি প্রবাসী চরম অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। হামলায় আরব আমিরাতে একজন ও বাহরাইনে একজন প্রবাসী বাংলাদেশি মারা গেছেন।

কারাগারের চার দেয়ালে স্বপ্নভঙ্গ : পুলিশি অভিযানে প্রতিদিন কয়েকশ বাংলাদেশি শ্রমিক আটক হচ্ছেন। যাদের বৈধ কাগজপত্র নেই, তাদের ঠাঁই হচ্ছে বিদেশের অন্ধকার কারাগারে। অনেকের অপরাধ শুধু এটাই যে, তারা কফিলের প্রতারণার শিকার হয়ে সময়মতো আকামা নবায়ন করতে পারেননি। কারাগারে থাকা এই শ্রমিকদের পরিবার দেশে চরম অর্থকষ্টে দিন কাটাচ্ছেন। ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে যারা বিদেশে গিয়েছিলেন, তাদের অনেকের এখন ফেরার পথও রুদ্ধ। এমনকি বাংলাদেশ থেকে যেসব এজেন্সি বা ব্যক্তির মাধ্যমে সৌদি আরব যাচ্ছেন, তারাও শ্রমিকদের সঙ্গে প্রতারণা করছেন। দেশের বাইরে পাঠিয়ে দিয়েই তাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যাচ্ছে। তারা মোটা অঙ্কের অর্থ নিচ্ছেন কিন্তু শ্রমিকরা সেই অনুযায়ী চাকরি পাচ্ছেন না।

কফিলের নির্যাতন ও বাকস্বাধীনতা হরণ : কফিলদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ করার সাহসও পাচ্ছেন না অনেক শ্রমিক। কোনো শ্রমিক যদি নিজের টাকা বা আকামার বিষয়ে প্রতিবাদ করেন, তবে তাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে কফিলরা উল্টো শ্রমিকের বিরুদ্ধে ‘হুরুব’ (পলাতক) মামলা দিয়ে দিচ্ছেন, যা একজন প্রবাসীর জন্য মরণফাঁদের মতো। কফিলদের এই একাধিপত্য বা ‘কাফালা’ ব্যবস্থার অপব্যবহার শ্রমিকের জীবনকে দাসে পরিণত করেছে।

এক বছরেই সৌদি আরবে পাড়ি দেন সাড়ে ৭ লাখ শ্রমিক : বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিএমইটি) সূত্র জানায়, ২০২৫ সালে ১১ লাখ ৩১ হাজার ১৪৪ জন কর্মী কাজের জন্য বিভিন্ন দেশে গিয়েছেন। মোট অভিবাসীর ৬৭ শতাংশ, অর্থাৎ ৭ লাখ ৫৪ হাজার ৩৬৯ জন গিয়েছেন সৌদি আরবে। এরপর যথাক্রমে ১০ শতাংশ, ১ লাখ ৭ হাজার ৫৯৬ জন কাতারে, ৬ শতাংশ, ৭০ হাজার ১৭৭ জন সিঙ্গাপুরে, ৪ শতাংশ, ৪২ হাজার ২৪১ জন কুয়েতে এবং ৪ শতাংশের কাছাকাছি ৪০ হাজার ১৩৯ জন গিয়েছেন মালদ্বীপে। এরপর ১৩ হাজার ৭৫২ জন গিয়েছেন সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), ১২ হাজার ৩০১ জন গিয়েছেন জর্ডান, ১২ হাজার ২৫১ জন গিয়েছেন কম্বোডিয়ায়, ৯ হাজার ৩৬৫ জন গিয়েছেন ইতালি এবং ৬ হাজার ৬৫০ জন গিয়েছেন কিরগিজস্তান। তার মধ্যে চলতি বছরের গত দুই মাসে সৌদি আরবে গিয়েছেন ১ লাখ ৮ হাজার ৯১৯ জন।

দূতাবাসে শক্তিশালী ‘ল উইং’ করার ওপর জোর : শ্রমবাজারের সঙ্গে জড়িত এক বিশ্লেষক দেশ রূপান্তরকে বলেন, বাংলাদেশ সরকারকে সংশ্লিষ্ট দেশের শ্রম মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে জরুরি ভিত্তিতে বৈঠক করতে হবে, যেন কফিলদের স্বেচ্ছাচারিতা বন্ধ হয়। প্রতিটি দূতাবাসে একটি শক্তিশালী আইনি উইং থাকতে হবে, যারা কফিলদের বিরুদ্ধে মামলা লড়তে শ্রমিকদের সরাসরি সহায়তা করবে। যেসব রিক্রুটিং এজেন্সি প্রতারক কফিলদের কাছে শ্রমিক পাঠাচ্ছে, তাদের লাইসেন্স বাতিলসহ কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে। কফিলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে শ্রমিকরা যেন সরাসরি সরকারি পোর্টালে আকামা নবায়ন করতে পারেন এমন ব্যবস্থার উদ্যোগ নিতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত