মসজিদে নববির জুমার খুতবায় গত শুক্রবার শায়খ ড. আলি ইবনে আবদুর রহমান আল-হুজাইফি তাকওয়া অবলম্বনের ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, হালাল ও হারাম স্পষ্টভাবে নির্ধারিত, তাই মুসলিমদের আল্লাহর আনুগত্যে অবিচল থাকা এবং শয়তানের পথ থেকে দূরে থাকা জরুরি। তিনি মানুষকে তিন শ্রেণিতে ভাগ করে সেগুলোর বিস্তারিত বিবরণী দেন। রমজানের ইবাদত অব্যাহত রাখার পাশাপাশি তিনি নফল ইবাদতের গুরুত্ব, ছোট গুনাহ থেকে সতর্ক থাকা এবং ফেতনার সময়ে ইসলামের আদর্শে অবিচল থাকার আহ্বান জানান।
শায়খ বলেন, আপনারা মহান আল্লাহকে ভয় করুন। মহান আল্লাহর আনুগত্যে অবিচল এবং তার অবাধ্যতা থেকে দূরে থাকার মাধ্যমে তাকে ভয় করুন। নিশ্চয়ই হালাল স্পষ্ট এবং হারামও স্পষ্ট। মহান আল্লাহর কিতাব এবং রাসুল (সা.)-এর সুন্নাহে বান্দাদের জন্য সব বিধান অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘রাসুলগণকে পাঠিয়েছি সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে, যাতে রাসুলদের আসার পর আল্লাহর বিরুদ্ধে মানুষের কোনো অজুহাত না থাকে।’ (সুরা নিসা ১৬৫)
মহান আল্লাহ আরও বলেন, ‘হে আদম সন্তান, আমি কি তোমাদের নির্দেশ দিইনি যে, তোমরা শয়তানের ইবাদত করো না? কারণ সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু। আর আমারই ইবাদত করো, এটিই সরল পথ। শয়তান তোমাদের অনেক দলকে পথভ্রষ্ট করেছে, তবে কি তোমরা বুঝতে পারোনি?’ (সুরা ইয়াসিন ৬০-৬২) আর শয়তানের ইবাদত করা মানেই হলো মহান আল্লাহর অবাধ্য হয়ে শয়তানের আনুগত্য করা।
ওয়াবিসা ইবনে মাবাদ আসাদি (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘পুণ্য হলো তা, যাতে আত্মা প্রশান্তি পায় এবং অন্তর তৃপ্ত হয়। আর গুনাহ হলো তা, যা অন্তরে খটকা তৈরি করে এবং মনে দ্বিধা সৃষ্টি করে, যদিও মানুষ তোমাকে (এর বৈধতার) ফতোয়া দিয়ে থাকে।’ (মুসনাদে আহমাদ)
হে মুসলিমগণ, মানুষ তিনটি অবস্থায় বিভক্ত। একদল মানুষকে মহান আল্লাহ তৌফিক দিয়েছেন, তারা নিজেদের নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ করেছে, ফরজ ও ওয়াজিবসমূহ পালন করেছে, হারাম ও মাকরুহ বিষয়গুলো বর্জন করেছে এবং বেশি বেশি নফল ইবাদত করেছে। তারা মৃত্যু পর্যন্ত এই অবস্থায় অবিচল ছিল, তারাই দুনিয়াতে সফল ও সৌভাগ্যবান এবং আখেরাতেও উচ্চ মর্যাদার অধিকারী। মহান আল্লাহ তাদের সম্পর্কে বলেন, ‘আর অগ্রগামীরাই তো অগ্রগামী, তারাই নৈকট্যপ্রাপ্ত। তারা থাকবে নেয়ামতপূর্ণ জান্নাতে। তাদের এক বিরাট অংশ হবে পূর্ববর্তীদের মধ্য থেকে এবং অল্প কিছু হবে পরবর্তীদের মধ্য থেকে। তারা স্বর্ণখচিত আসনে হেলান দিয়ে একে অপরের মুখোমুখি হয়ে বসবে।’ (সুরা ওয়াকিয়া ১০-১৬)
দ্বিতীয় একদল যারা ফরজ ও ওয়াজিবসমূহ পালন করেছে, তবে কিছু মুস্তাহাব আমলে তাদের ঘাটতি ছিল এবং কিছু গুনাহ তাদের দ্বারা সংঘটিত হয়েছিল, কিন্তু তারা গুনাহের পরপরই নেক আমল ও তওবা করেছে এবং কিছু মাকরুহ কাজে লিপ্ত হয়েছে। তারাও বড় কল্যাণের ওপর রয়েছে, তবে তাদের মর্যাদা প্রথম দলের নিচে। তারা হলো আসহাবুল ইয়ামিন তথা ডান দিকের লোক। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর ডান দিকের লোক, কতই না ভাগ্যবান ডান দিকের লোক! তারা থাকবে কাঁটাহীন বরই গাছ এবং কাঁদি কাঁদি কলা গাছের নিচে, দীর্ঘ ছায়া এবং সদা প্রবহমান পানির পাশে। আর প্রচুর ফলমূলের মাঝে, যা শেষ হবে না এবং নিষিদ্ধও হবে না।’ (সুরা ওয়াকিয়া ২৭-৩৩)
আরেকটি দল সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর অপর কিছু লোক, যারা নিজেদের অপরাধ স্বীকার করেছে, তারা নেক আমল ও বদ আমল মিশ্রিত করে ফেলেছে। আশা করা যায়, মহান আল্লাহ তাদের তওবা কবুল করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।’ (সুরা তাওবা ১০২) এই দলের পরিণাম আল্লাহর ক্ষমা ও করুণার ওপর নির্ভরশীল।
তৃতীয় দল সংখ্যায় বেশি, তারা হলো যারা নিজ প্রবৃত্তির অনুসরণ করেছে, ভোগবিলাসে মত্ত থেকেছে, কামনা-বাসনা ও হারাম বিষয়কে প্রাধান্য দিয়েছে এবং মৃত্যু ও কবরের কথা ভুলে গেছে। তারা দুনিয়ার জীবন নিয়েই সন্তুষ্ট ছিল এবং আখেরাতকে অস্বীকার করেছে। মহান আল্লাহ তাদের সম্পর্কে বলেন, ‘অতঃপর তাদের পরে এমন এক অযোগ্য উত্তরসূরি এলো যারা নামাজ নষ্ট করল এবং প্রবৃত্তির লালসার অনুসরণ করল, সুতরাং তারা অচিরেই ধ্বংসের সম্মুখীন হবে।’ (সুরা মারইয়াম ৫৯)
মহান আল্লাহ আমাদের জাহান্নাম থেকে রক্ষা করুন। তবে শেষ পর্যন্ত মহান আল্লাহ যাদের জন্য ইচ্ছা করবেন, তাদের তওবা ও ইসলামের পথে ফিরে আসার তৌফিক দেবেন। মহান আল্লাহ ফয়সালা করে দিয়েছেন যে, কোনো বিশ্বাসী ছাড়া অন্য কেউ জান্নাতে প্রবেশ করবে না। মহান আল্লাহ বলেন, ‘জাহান্নামীরা জান্নাতীদের ডেকে বলবে, আমাদের ওপর সামান্য পানি ঢেলে দাও অথবা আল্লাহ তোমাদের যা রিজিক দিয়েছেন তা থেকে কিছু দাও। তারা বলবে, আল্লাহ এ দুটিই কাফেরদের জন্য হারাম করেছেন। যারা তাদের দ্বীনকে খেল-তামাশা হিসেবে গ্রহণ করেছিল এবং দুনিয়ার জীবন যাদের প্রতারিত করেছিল। আজ আমি তাদের ভুলে যাব যেমন তারা এই দিনের সাক্ষাতের কথা ভুলে গিয়েছিল এবং যেমন তারা আমার আয়াতসমূহকে অস্বীকার করত।’ (সুরা আরাফ ৫০-৫১)
হে মুসলিম সমাজ, রমজানের মাসে আপনাদের দিনগুলো পবিত্র ছিল এবং সময়গুলো আনুগত্য ও ইবাদতে আনন্দময় ছিল। সুতরাং এই হেদায়েত ও আনুগত্যকে গুনাহ ও শয়তানের আনুগত্য দিয়ে পরিবর্তন করবেন না। ধৈর্যের মাস রমজানে মহান আল্লাহ আপনাদের যেসব নেক আমলের তৌফিক দিয়েছেন, তা বাতিল করে দেবেন না। অমূল্য নেকিগুলোকে নষ্ট করে বা আমলের সওয়াব কমিয়ে দিয়ে নিজেদের ক্ষতি করবেন না। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো, রাসুলের আনুগত্য করো এবং নিজেদের আমল বিনষ্ট করো না।’ (সুরা মুহাম্মদ ৩৩)
হজরত আবু জর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তুমি যেখানেই থাকো মহান আল্লাহকে ভয় করো। আর কোনো মন্দ কাজ হয়ে গেলে এরপর একটি নেক আমল করো, তবে তা মন্দটিকে মিটিয়ে দেবে। আর মানুষের সঙ্গে উত্তম আচরণ করো।’ (মুসনাদে আহমাদ)
মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা তোমাদের রবের ক্ষমা ও সেই জান্নাতের দিকে দ্রুত ধাবিত হও, যার প্রশস্ততা আসমান ও জমিনের সমান, যা মুত্তাকিদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে।’ (সুরা আলে ইমরান ১৩৩)
আপনারা মহান আল্লাহকে যথাযথভাবে ভয় করুন এবং তার ক্ষমা ও সন্তুষ্টির দিকে দ্রুত অগ্রসর হোন। তার হারাম করা বিষয় ও ক্রোধ থেকে দূরে থাকুনি। নেক আমল করুন এবং নেক আমলের পর গুনাহ থেকে বিরত থাকুন। হাদিসে এসেছে, ‘বুদ্ধিমান সেই ব্যক্তি, যে নিজের নফসের বিচার করে এবং মৃত্যুর পরবর্তী জীবনের জন্য আমল করে। আর অক্ষম সেই ব্যক্তি, যে নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে এবং মহান আল্লাহর কাছে বৃথা আশা পোষণ করে।’ (মুসনাদে আহমাদ)
একজন মুসলিমের ওপর মহান আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ হলো, তিনি তার জন্য ফরজ বিধানের পাশাপাশি নফল ইবাদতের ব্যবস্থা রেখেছেন, যা সওয়াব বৃদ্ধি করে এবং মর্যাদা সমুন্নত করে। এগুলো ফরজের ঘাটতি পূরণ করে এবং পাপ মোচন করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রমজানের রোজা রাখল এবং এরপর শাওয়াল মাসে ছয়টি রোজা রাখল, সে যেন সারা বছর রোজা রাখল।’ (সহিহ মুসলিম)
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা ছোট ছোট গুনাহ থেকে বেঁচে থাকো, কারণ সেগুলো একজনের ওপর জমতে থাকে যতক্ষণ না তাকে ধ্বংস করে দেয়।’ (তাবারানি ও বায়হাকি) মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর দিনের দুই প্রান্তে ও রাতের কিছু অংশে নামাজ কায়েম করো। নিশ্চয়ই নেক আমলসমূহ গুনাহসমূহকে দূর করে দেয়। এটি উপদেশ গ্রহণকারীদের জন্য একটি উপদেশ।’ (সুরা হুদ ১১৪)
হে মুসলিমগণ, আপনারা বড় ফেতনার সম্মুখীন হতে পারেন, যা দ্বীন ও দুনিয়ার ক্ষতি করে। সুতরাং ফেতনার মোকাবিলা করুন রাসুলুল্লাহ (সা.) ও তার সাহাবিদের আদর্শের ওপর অবিচল থেকে এবং সর্বত্র মুসলিম ও ইসলামের জন্য দোয়া করে। এই পবিত্র ভূখণ্ড এবং মুসলিম দেশগুলোকে কাফেরদের চক্রান্ত থেকে হেফাজত করার জন্য দোয়া করুন। কারণ এই পবিত্র ভূমি মুসলিমদের আশ্রয়স্থল এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র রওজা এখানে অবস্থিত। আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাত একে অপরের বন্ধু ও অভিভাবক, তারাই ইসলামের জন্য দাঁড়িয়েছে এবং ইসলাম তাদের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী একে অপরের বন্ধু।’ (সুরা তাওবা ৭১)
হে আল্লাহর বান্দারা! আল্লাহ ও তার ফেরেশতারা নবীর ওপর সালাত (দরুদ) পাঠ করেন, আপনারাও তার ওপর দরুদ ও সালাম পাঠ করুন। হে আল্লাহ, আপনার বান্দা ও রাসুল মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর সালাত ও সালাম বর্ষণ করুন। চার খলিফা, সকল সাহাবি এবং কেয়ামত পর্যন্ত যারা তাদের অনুসরণ করবে তাদের ওপর সন্তুষ্ট হোন।
হে আল্লাহ, ইসলাম ও মুসলিমদের মর্যাদা দান করুন। কুফর ও কাফেরদের লাঞ্ছিত করুন। এই দেশকে হিফাজত করুন, যা ইসলামের দুর্গ ও মুসলিমদের আদর্শ। এই পবিত্র ভূখণ্ডের সীমানা, সম্পদ, সেনাবাহিনী, শাসকবর্গ ও নিরাপত্তা রক্ষা করুন।
হে আল্লাহ, বায়তুল মুকাদ্দাসকে কেয়ামত পর্যন্ত জালেম ইহুদিদের হাত থেকে হেফাজত করুন। হে আল্লাহ, ফিলিস্তিনিদের সাহায্য করুন এবং জালেমদের হাত থেকে তাদের উদ্ধার করুন। আমাদের সব কাজের শেষ ভালো করে দিন এবং দুনিয়ার লাঞ্ছনা ও আখেরাতের আজাব থেকে রক্ষা করুন। আমাদের অসুস্থদের আরোগ্য দান করুন, প্রতিটি মুসলিমের বিষয়গুলো সহজ করে দিন এবং আমাদের ও আমাদের সন্তানদের জাদুকর, শয়তান ও অনিষ্টকারীদের হাত থেকে রক্ষা করুন। আমরা আপনার কাছে সব ধরনের কল্যাণ চাই এবং সব অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাই।
হে আল্লাহর বান্দারা! আল্লাহ আপনাদের ন্যায়পরায়ণতা, সদাচরণ এবং আত্মীয়স্বজনকে দান করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং অশ্লীলতা, অসৎকাজ ও সীমালঙ্ঘন করতে নিষেধ করছেন। তিনি আপনাদের উপদেশ দিচ্ছেন, যাতে আপনারা শিক্ষা গ্রহণ করেন। অতএব আপনারা মহান আল্লাহকে স্মরণ করুন, তিনি আপনাদের স্মরণ করবেন। তার নেয়ামতের শোকরিয়া আদায় করুন, তিনি আপনাদের আরও বাড়িয়ে দেবেন। আল্লাহর স্মরণই সর্বশ্রেষ্ঠ এবং আপনারা যা করেন মহান আল্লাহ তা জানেন।
২৭ মার্চ শুক্রবার, মসজিদে নববিতে প্রদত্ত জুমার খুতবা। সংক্ষিপ্ত অনুবাদ করেছেন মুফতি আতিকুর রহমান
