রেমিট্যান্স যোদ্ধারাই যখন অবহেলিত

আপডেট : ০২ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৮ এএম

প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্সকে বলা হয় বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি। অথচ এই  রেমিট্যান্সের কারিগর যারা, সেই সাধারণ শ্রমিকদের নিয়ে কেউ ভাবে না। অবহেলিত এই রেমিট্যান্স যোদ্ধারা রয়েছেন ভয়াবহ সংকটের মুখে। একদিকে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন  দেশের শ্রমবাজারে অস্থিরতা, অন্যদিকে দেশে সক্রিয় দালাল চক্রের ‘ভিসা বাণিজ্য’ নিঃস্ব করছে হাজারো মানুষকে। স্বপ্নের দেশ পাড়ি দেওয়ার আগেই বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন থেকে ফেরত আসা কিংবা বিদেশে গিয়ে কাজ না পেয়ে মানবেতর জীবনযাপন এগুলো এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। 

সম্প্রতি সৌদি আরব সফরকালে সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ এই  শ্রমবাজারের অবস্থা খুবই নাজুক। দেশটির বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন খেটে খাওয়া প্রবাসী বাংলাদেশি নাগরিকরা। ‘ফ্রি ভিসার’ নামে ৮-৯ লাখ টাকা খরচ করে দেশটিতে যাওয়ার পর তাদের কপালে জুটছে পদে পদে শুধু ভোগান্তি আর ভোগান্তি। এরপরও মিলছে না ভালো বেতন। এমন পরিস্থিতির সঙ্গে মানাতে না পেরে  অনেকেই দেশে ফিরতে বাধ্য হচ্ছেন।

সরেজমিন জানা গেছে, বাংলাদেশের বিভিন্ন রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক তাদের নিয়োগকৃত মেসেঞ্জারদের (প্রতিনিধি, দালাল) দিয়ে নানা কৌশলে ফাঁদে ফেলে কর্মীদের বিদেশ যেতে টোপ দিয়ে পাসপোর্ট আর নগদ টাকা নিয়ে নিচ্ছে। যারা টোপ গিলছে তাদের এক পর্যায়ে বৈধভাবেই সৌদি আরবে পাঠানোর উদ্দেশ্যে বিমানে তুলে দেওয়া হয়। এরপর থেকেই তাদের যন্ত্রণার মুহূর্ত শুরু হয়। আবার আরেকটি গ্রুপ জাল ভিসা তৈরি করে সৌদি আরব পাঠানোর চেষ্টা করে। গ্রামের পৈতৃক জমি বিক্রি করে বা চড়া সুদে ঋণ নিয়ে বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন তরুণরা। এই স্বপ্নকে পুঁজি করেই গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গড়ে ওঠা কতিপয় ট্রাভেল এজেন্সি এবং দালালরা গ্রামগঞ্জের সহজ-সরল মানুষকে টার্গেট করে। তারা ‘ভালো বেতন’, ‘আরামদায়ক কাজ’ এবং ‘ফ্রি ভিসার’ প্রলোভন দেখিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা। কিন্তু ‘ফ্রি ভিসা’ বলে আন্তর্জাতিক শ্রম আইনে কোনো শব্দ নেই। প্রতিটি কাজের ভিসার বিপরীতে একজন নির্দিষ্ট নিয়োগকর্তা বা কোম্পানি থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু দালালরা সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে উচ্চমূল্যে ফ্রি-ভিসা বিক্রি করছে। টাকা দেওয়ার পর অনেক সময় দেখা যায়, ভিসার কাগজটি আসলে একটি সাধারণ ভিজিট ভিসা বা পর্যটন ভিসা, যা দিয়ে বিদেশের মাটিতে কাজ করার কোনো  বৈধ সুযোগই নেই।

১২ লাখ টাকা দিয়েও জাল ভিসা : শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতারণার সবচেয়ে বড় অস্ত্র এখন ‘জাল ভিসা’। আধুনিক প্রযুক্তির অপব্যবহার করে দালালরা হুবহু আসল ভিসার মতো দেখতে জাল কপি তৈরি করছে। সাধারণ শ্রমিকদের পক্ষে এই সূক্ষ্ম কারচুপি ধরা প্রায় অসম্ভব। মক্কায় একটি দোকানে চাকরি করেন কুমিল্লার আবদুর রশীদ। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার দুই আত্মীয় সৌদি আরব আসার জন্য এক ব্যক্তিকে ১২ লাখ টাকা দেওয়া হয়। তার সঙ্গে চুক্তি হয়েছিল সৌদি আরব আসার পর আরও ৪ লাখ টাকা দেওয়া হবে। মাস তিনেক আগে শাহজালাল বিমানবন্দরে এসে ফ্লাইটে ওঠার আগ মুহূর্তে জানতে পারেন ভিসাগুলো জাল। বাধ্য হয়ে তারা গ্রামে ফিরে যায়।’ এই রকম অনেকেই প্রতারণার শিকার হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে ঢাকার এসবির এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, জাল ভিসার ঘটনা অহরহ ঘটছে। অনেক ক্ষেত্রে ভিসার কিউআর কোড স্ক্যান করলে ভুয়া ওয়েবসাইট বা আগের কোনো পুরনো তথ্য দেখায়। যা শ্রমিকরা বুঝতে পারেন না। বিদেশে কোনো অস্তিত্ব নেই এমন কোম্পানির নামেও ভিসা ইস্যু করে দিচ্ছে দালালরা। শ্রমিকদের মধ্যে ডিজিটাল স্বাক্ষরতার অভাব থাকায় তারা নিজেরা অনলাইন পোর্টালে ভিসার সত্যতা যাচাই করতে পারেন না, যার পূর্ণ সুযোগ নেয় দালালরা।

যেখানে স্বপ্নের অপমৃত্যু : প্রায়ই হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখা যায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। বুকভরা আশা নিয়ে মালপত্র গুছিয়ে স্বজনের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আসার পর, ইমিগ্রেশন ডেস্কে গিয়ে যখন জানা যায় ভিসাটি জাল বা ত্রুটিপূর্ণ, তখন সেই শ্রমিকের পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যায়।

সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে একজন বিদেশ যাওয়া ব্যক্তি বিমানবন্দর থেকে ফেরত আসছেন। তার প্রধান কারণগুলো হচ্ছে- ক্লিনার হিসেবে ভিসা নিয়ে এসে সিকিউরিটি গার্ডের কাজের কথা বলা হয়। অনেক সময় নিয়োগকর্তা বা কফিল শেষ মুহূর্তে ভিসা বাতিল করে দেন, যা শ্রমিকরা ফ্লাইটের আগে জানতে পারেন না। ভিসার পাশাপাশি স্মার্ট কার্ড বা বিএমইটি ছাড়পত্র জাল করার ঘটনাও ঘটছে।

বিদেশের মাটিতে ‘বন্দি’ জীবন : যারা ভাগ্যের জোরে জালিয়াতি এড়িয়ে বিদেশে পৌঁছাতে পারছেন, তাদের লড়াই সেখানেই শেষ নয়। বরং অনেক ক্ষেত্রে আসল যন্ত্রণা শুরু হয় বিদেশের মাটিতে পা দেওয়ার পর। বিমানবন্দরে কাউকে নিতে না আসা, থাকার জায়গা না থাকা এবং দিনের পর দিন অভুক্ত থাকাই যেন অনেকের ভাগ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, যে বেতনের কথা বলে নেওয়া হয়েছিল, বাস্তবে তার অর্ধেকও দেওয়া হচ্ছে না। আকামা বা রেসিডেন্সি পারমিট না করে দেওয়ায় অনেক শ্রমিক ‘অবৈধ’ হয়ে পড়ছেন এবং পুলিশের হাতে ধরা পড়ার আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।

এই প্রসঙ্গে পুলিশের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, টাকা লেনদেনের আগেই সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাস বা সরকারি ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ভিসার সত্যতা যাচাই করতে হবে। শুধুমাত্র জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমেই লেনদেন করতে হবে। টাকা সব সময় ব্যাংক বা বৈধ রসিদের মাধ্যমে পরিশোধ করলে প্রতারিত হলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে। এক্ষেত্রে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন হেল্পলাইন এবং জেলা কর্মসংস্থান অফিসের সহযোগিতা নেওয়া জরুরি। তিনি আরও বলেন, শ্রমিকরা দেশের সম্পদ, কোনো পণ্য নয়। তাদের রক্ত ঘাম ঝরানো টাকায় সচল থাকে আমাদের অর্থনীতির চাকা। অথচ সেই মানুষগুলোই যদি দালালদের হাতে বারবার লাঞ্ছিত ও প্রতারিত হন, তবে তা জাতির জন্য লজ্জাজনক। ভিসা জালিয়াতি রোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর অভিযান এবং জনশক্তি রপ্তানি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে যা যা করা দরকার আমরা তা করছি।

ভিসার ক্ষেত্রে কড়াকড়ি : বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির (বায়রা) সাবেক এক মহাসচিব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রে অনেক কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। বাংলাদেশ থেকে একাধিক প্রতারক চক্র জাল ভিসা তৈরি করে শ্রমিকদের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছে। গ্রামাঞ্চল থেকে সহজ-সরল লোকজন সংগ্রহ করে তারা প্রতারণা করে আসছে। এই ধরনের একাধিক অভিযোগ পেয়েছি। সৌদি আরব যাওয়ার সময় ইমিগ্রেশন পুলিশের কাছে অনেকে ধরা পড়ছে।

 সৌদি আরবের জেদ্দায় অবস্থান করা নিজের নাম উল্লেখ না করে একজন প্রবাসী তার সৌদি আরবে যাওয়া এবং টাকা খরচ করার পরও প্রতারিত হওয়ার কথা জানান। তিনি বলেন, ‘ফ্রি ভিসায় এসে আমি প্রতারিত হয়েছি। এখন অন্য এক দালালের মাধ্যমে এখানে যে কাজ পেয়েছি সেই টাকা দিয়ে আমার নিজেরই চলে না। আমি সৌদির নাদাফে আছি। পানি সাপ্লাইয়ের লাইন পরিষ্কারের কাজ করি।’ তার এক ভাইও জাল ভিসার খপ্পরে পড়ে সর্বস্ব হারিয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়তে থাকায় পরিস্থিতির আরও অবনতি হচ্ছে। এতে নতুন কর্মীর চাহিদা কমে যাবে বলে তার আশঙ্কা। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত