গণভোট-গুম প্রতিরোধসহ ২০ অধ্যাদেশে ‘না’

আপডেট : ০৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:০০ এএম

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ২০টি অধ্যাদেশ আটকে দেওয়ার সুপারিশ করেছে সংসদে গঠিত বিশেষ কমিটি; যার মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ, সুপ্রিম কোর্টের আলাদা সচিবালয় স্থাপন অধ্যাদেশসহ চারটি অধ্যাদেশ রহিতকরণের সুপারিশ করা হয়েছে। তা ছাড়া গণভোট অধ্যাদেশ, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশ, দুর্নীতি দমন কমিশন, তথ্য অধিকার অধ্যাদেশসহ ১৬টি অধ্যাদেশ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংসদে উত্থাপিত হচ্ছে না। ফলে সংবিধানের নির্দেশনা অনুযায়ী এই অধ্যাদেশগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাচ্ছে। যদিও জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি এই অধ্যাদেশগুলো পরবর্তীতে যাচাই-বাছাই করে অধিকতর শক্তিশালী করে নতুন বিল উত্থাপনের সুপারিশ করেছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে শুরু হওয়া সংসদ অধিবেশনে অধ্যাদেশগুলোর যাচাই-বাছাই প্রতিবেদন উত্থাপন করেন কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. জয়নুল আবেদীন। গত ১২ মার্চ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিনে ১৩ সদস্যের সমন্বয়ে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি পরপর তিনটি বৈঠকে অন্তর্বর্তী সরকারের জারিকৃত ১৩৩টি অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাই শেষে প্রতিবেদন চূড়ান্ত করে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ১৬টি অধ্যাদেশ সংসদে এখনই বিল আকারে উত্থাপন না করে পরে যাচাই-বাছাই করে অধিকতর শক্তিশালী করে নতুন বিল উত্থাপনের সুপারিশ এবং ৪টি অধ্যাদেশ রহিতকরণের বিল আনার জন্য কমিটি সুপারিশ করছে। যার মধ্যে ১৪টিতে নোট অব ডিসেন্ট (আপত্তি) দিয়েছে বিরোধী দল। ১২ এপ্রিলের মধ্যে বিল আকারে অনুমোদন না হলে অধ্যাদেশগুলো লোপ পাবে। বাকি ১১৩টির মধ্যে ৯৮টি অধ্যাদেশ হুবহু বিল আকারে উত্থাপন এবং ১৫টি সংশোধিত আকারে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সংসদে বিল উত্থাপনের জন্য সুপারিশ করে।

বাতিল ৪টি অধ্যাদেশ : যে চারটি অধ্যাদেশ রহিতকরণের সুপারিশ করা হয়েছে সেগুলো হলো জাতীয় সংসদ সচিবালয় (অন্তর্বর্তীকালীন বিশেষ বিধান) অধ্যাদেশ, ২০২৪। সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ, ২০২৫। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫ এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬।

যাচাই-বাছাইয়ের সুপারিশকৃত অধ্যাদেশ : নতুন করে বিল আকারে উত্থাপনের জন্য সুপারিশ করা ১৬টি অধ্যাদেশের কয়েকটি হলো জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৪, রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ-২০২৫, রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ-২০২৫, গণভোট অধ্যাদেশ-২০২৫, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ-২০২৫, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫, দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৬, মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক অধ্যাদেশ-২০২৬ এবং তথ্য অধিকার (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৬।

বিরোধী দলের আপত্তি না থাকা অধ্যাদেশগুলো হলো মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক (দ্বিতীয় সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫, কাস্টমস (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫, আয়কর (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫, বেসামরিক বিমান চলাচল (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৬ এবং বাংলাদেশ ট্রাভেল এজেন্সি (নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ) সংশোধন অধ্যাদেশ-২০২৬।

সংশোধিত আকারে পাসের সুপারিশ ১৫টির

১৫টি অধ্যাদেশ সংশোধিত আকারে উত্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে। তবে কোথায় কী সংশোধনী আনা হবে, তা বিশেষ কমিটির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।

এগুলো হলো ২০২৫ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ, সন্ত্রাসবিরোধী অধ্যাদেশ, কোড অব ক্রিমিনাল প্রসিডিউর (সেকেন্ড অ্যামেন্ডমেন্ট), জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ, বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) অধ্যাদেশ, মানবদেহে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংযোজন অধ্যাদেশ, পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ, ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধান) অধ্যাদেশ, ২০২৬ সালের মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন অধ্যাদেশ, ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও কৃষিভূমি সুরক্ষা অধ্যাদেশ, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) অধ্যাদেশ, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসর সুবিধা (সংশোধন) অধ্যাদেশ এবং বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট (সংশোধন) অধ্যাদেশ।

বিরোধীদলীয় নেতা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পাল্টাপাল্টি বক্তব্য

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের সপ্তম দিন গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় ও পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের ঘটনা ঘটেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ‘সত্যকে মিথ্যা বানাতে দক্ষ’ বলে কটাক্ষ করেন বিরোধীদলীয় নেতা। অন্যদিকে ‘মিথ্যা’ শব্দটিকে অসংসদীয় আখ্যা দিয়ে সংসদের কার্যবিবরণী থেকে তা এক্সপাঞ্জ (বাদ দেওয়া) করার দাবি জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে বিরোধীদলীয় নেতা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে এই পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দিতে দেখা যায়।

অধিবেশনে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে ডা. শফিকুর রহমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আগের দিনের এক বক্তব্যের আপত্তি জানিয়ে বলেন, ‘আমার কালকে চলে যাওয়ার পরে আমাকে ভালোবেসে তিনি একটা কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন যে, আমি একটি অসত্য কথা এখানে বলে গেছি। আমি এটা জানতে পারলাম।’

তিনি বলেন, ‘আসলে আল্লাহ তায়ালা তাকে অপূর্ব দক্ষতা দিয়েছেন। জাস্ট বোতলটা পরিবর্তন করে মেটেরিয়ালসটা ঠিক রেখে তিনি সত্যকে মিথ্যা হিসেবে এবং মিথ্যাকে সত্য হিসেবে চমৎকারভাবে পরিবেশন করতে পারেন। এজন্য শুধু তাকে ধন্যবাদ জানানোর জন্যই আমি এখানে দাঁড়িয়েছি।’

এ সময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম বলেন, ‘বিরোধী দলের নেতা, আপনি পয়েন্ট অব অর্ডারে নিশ্চয়ই এ বক্তব্য রেখেছেন। পয়েন্ট অব অর্ডার চলমান বিষয়ের ওপর হয়। এটা তো গতকালকের বিষয়, গতকালকেই শেষ হয়ে গিয়েছে। সুতরাং এটা এখন আর নতুন করে তোলার কোনো প্রয়োজন নেই। মন্ত্রী, উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন নেই। উনি যদি হাউজে থেকে বলতেন তাহলে নিশ্চয়ই আপনাকে রাইট অব রিপ্লাই দিতাম।’

এরপর স্পিকারের অনুমতিক্রমে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যের জবাব দেন। তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে মাননীয় বিরোধীদলীয় নেতা দুটি অসংসদীয় শব্দ ব্যবহার করেছেন, সেটা হচ্ছে “মিথ্যা”। উনি “অসত্য” বললে আমি আপত্তি করতাম না। যে আমি কালকে মিথ্যা বলেছি বয়ান। এই “মিথ্যা” শব্দটা অসংসদীয় হিসেবে এক্সপাঞ্জ করার জন্য আমি অনুরোধ করছি।’

আগের দিনের ঘটনার ব্যাখ্যা দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘ওনার কালকের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে আমি বলেছিলাম বিরোধীদলীয় নেতা এখানে একটা অসত্য বক্তব্য উত্থাপন করেছেন। সেটা ছিল, যেখানে রুল ৬২ অনুসারে আপনি (স্পিকার) একজন বেসরকারি সদস্যের উত্থাপিত মুলতবি প্রস্তাব গ্রহণ করেছেন ওনারা ওয়াকআউট করার আরও অনেক পরে। তাহলে সেটা পার্লামেন্টে উত্থাপিত বা পঠিত হলো কীভাবে? সুতরাং আমি বলেছি সেই বক্তব্যটা অসত্য।’

পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বিভ্রান্তি দূর করতে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘বিভ্রান্তিটা এখানে মাননীয় স্পিকার। একই বিষয়, একই প্রস্তাব একজন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য এনেছিলেন। সেই প্রস্তাবটি ভিন্ন নামে গতকাল এসেছে। শুধু নাম বদল হয়েছে, প্রস্তাবটি ঠিক আছে। আমি তো আগেরটা জানতাম বলেই বলেছি। এখানে আমি কোনো ভুল তথ্য দিইনি।’

রাস্তায় গাড়ির দীর্ঘ সারি মন্ত্রী কি দেখতে পাচ্ছেন না’

জ্বালানি সংকটের কারণে দেশের পেট্রোলপাম্প একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, তেলের জন্য রাস্তায় গাড়ির দীর্ঘ সারি, মন্ত্রী কি দেখতে পাচ্ছেন না? এই সমস্যার সমাধান কবে হবে তা জানতে চেয়ে প্রশ্ন করেন কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ। জাতীয় সংসদে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রীর কাছে এই প্রশ্ন করেন।

জবাবে মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, ‘প্রতিটি পাম্পে যে পরিমাণ তেল প্রতিদিন দেওয়ার কথা সেই পরিমাণ তেল পাম্পগুলোতে সাপ্লাই করা হচ্ছে। কিন্তু ইরানের ঘটনার পর থেকে হঠাৎ করে বিক্রি বেড়ে গেছে। বিক্রি বেড়ে যাওয়ার ফলে পেট্রোলপাম্পে যে পরিমাণ তেল দিতাম একদিন-দেড় দিন লাগত বিক্রি হতে, এখন দুই ঘণ্টায় শেষ হয়ে যায়। সেজন্য মানুষের যে প্যানিক বায়িংটা শুরু হয়েছে লাইন দেখা যায়। কিন্তু পেট্রোল সাপ্লাই হয় না এটা ঠিক না, পেট্রোল প্রতিদিন সাপ্লাই করা হয়।

চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুতের ঘাটতি নেই, লোডশেডিং বন্ধে ১৮০ দিনের পরিকল্পনা

ঢাকা-১৮ আসনের সংসদ সদস্য এসএম জাহাঙ্গীর হোসেনের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী জানান, দেশে চাহিদা অনুযায়ী বর্তমানে বিদ্যুতের কোনো ঘাটতি নেই। তবে গ্রীষ্মকালে প্রাথমিক জ্বালানির ঘাটতি ও সঞ্চালন সীমাবদ্ধতায় মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটে জানিয়ে ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, গ্রাহকের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে ও লোডশেডিং বন্ধে সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে।

সংসদ অধিবেশন আগামী রবিবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত মুলতবি ঘোষণা করা হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত