কোরআনের প্রতি শিশুদের আগ্রহী করার উপায়

আপডেট : ০৪ এপ্রিল ২০২৬, ০১:০৪ এএম

শিশুদের হৃদয় নরম। তাদের হৃদয়ে যে বীজ বোনা হয়, সেটিই একসময় চরিত্র হয়ে ওঠে। তাই শৈশবেই তাদের হৃদয়ে সঠিক দিকনির্দেশনা পৌঁছে দেওয়া জরুরি। দুনিয়ার নানা প্রলোভন ও ব্যস্ততার ভিড়ে সন্তানদের আধ্যাত্মিক ভিত্তি মজবুত করা এখন সময়ের দাবি। এই প্রেক্ষাপটে কোরআনের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক গড়ে তোলা শুধু একটি ধর্মীয় দায়িত্বই নয়, বরং জীবনের পথচলার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য দিশা। ভালোবাসা, অনুপ্রেরণা ও সঠিক পদ্ধতির মাধ্যমে সন্তানদের মনে কোরআনের প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টি করা সম্ভব। ছোট ছোট উদ্যোগই পারে তাদের হৃদয়ে কোরআনের আলো জ¦ালাতে। কোরআনের প্রতি শিশুদের আগ্রহী করে তোলার ছয়টি উপায় উল্লেখ করা হলো।

এক. সন্তানদের কোরআনের প্রতি আগ্রহী করার প্রথম ও প্রধান উপায় হলো নিজেদের দৃষ্টান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা। শিশুরা স্বভাবজাতভাবেই অনুকরণপ্রিয়। তারা যা দেখে তা অনুসরণ করে। বাবা-মায়েরা যদি নিয়মিত কোরআন তেলাওয়াত করেন এবং এর বিধিবিধান নিজেদের জীবনে মেনে চলেন, তবে সন্তানরা তা দেখেই বড় হবে। তারা যখন দেখবে তাদের প্রিয় মানুষগুলো কোরআনের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে, তখন স্বাভাবিকভাবেই তাদের মনে এই কিতাবের প্রতি এক ধরনের শ্রদ্ধা জন্মাবে।

দুই. কোরআনের সঙ্গে সম্পর্কের দ্বিতীয় ধাপটি শুরু হয় শ্রবণ দিয়ে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুরা তাদের পারিপার্শ্বিক শব্দের মাধ্যমে গভীরভাবে প্রভাবিত হয়। এমনকি অতি অল্প বয়সে বা শৈশবকালীনও তারা শব্দের প্রতি সংবেদনশীল থাকে। যদি একটি শিশু নিয়মিত কোরআনের তেলাওয়াত শুনতে শুনতে বড় হয়, তবে তার কান এই পবিত্র সুরের সঙ্গে পরিচিত হয়ে ওঠে। এটি তাদের মনে এক ধরনের প্রশান্তি দেয় এবং তারা স্বভাবগতভাবেই কোরআনের প্রতি গভীর টান অনুভব করতে শুরু করে। ঘরের পরিবেশে নিয়মিত কোরআনের তেলাওয়াত বাজানো বা তেলাওয়াত করা শিশুদের অবচেতন মনে এর স্থায়ী প্রভাব ফেলে।

তিন. আরেকটি কার্যকরী পদ্ধতি হলো প্রতিযোগিতার মাধ্যমে উৎসাহ দেওয়া। শিশুরা সহজাতভাবেই চ্যালেঞ্জ এবং পুরস্কার পছন্দ করে। কোরআন পাঠ, হিফজ কিংবা এর মূল শিক্ষা ও মূল্যবোধ নিয়ে ছোটখাটো প্রতিযোগিতা বা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা যেতে পারে। প্রতিযোগিতায় তাদের অংশগ্রহণ এবং ছোট ছোট অর্জনে প্রশংসা ও পুরস্কার প্রদান করলে তারা দ্বিগুণ উৎসাহে এগিয়ে আসবে। ইতিবাচক মন্তব্য এবং সুন্দর কথা শিশুদের মনে আত্মবিশ্বাস তৈরি করে। বাবা-মায়েরা সন্তানদের সঙ্গে বিশেষ চুক্তি করতে পারেন যে, যদি তারা নিষ্ঠার সঙ্গে কোরআন পড়ার চেষ্টা করে তবে তাদের পছন্দের কোনো কিছু উপহার দেওয়া হবে। এই ধরনের উৎসাহ তাদের শেখার গতিকে ত্বরান্বিত করে।

চার. প্রতিটি সন্তানের জন্য নিজস্ব একটি কোরআনের কপির ব্যবস্থা করা অত্যন্ত কার্যকরী। যখন কোনো শিশুর নিজের একটি সুন্দর এবং রঙিন কোরআন শরিফ থাকে, তখন তার মধ্যে এক ধরনের ভালো লাগা তৈরি হয়। এটি তাদের স্বাতন্ত্র্যবোধকে তৃপ্ত করে। নিজস্ব একটি কিতাব থাকা শিশুদের মনে এর প্রতি বাড়তি যতœ ও ভালোবাসা তৈরি করে। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই নিজস্ব কপির প্রতি তাদের টান অটুট থাকে এবং তারা নিয়মিত এটি পাঠ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।

পাঁচ. সন্তানদের শাসন বা নৈতিকতা শিক্ষার ক্ষেত্রে কোরআনের আয়াতকে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা। দৈনন্দিন জীবনে আমরা সন্তানদের ঘর গোছানো, বিছানা ঠিক করা কিংবা সত্য বলা ও বড়দের সম্মান করার মতো অনেক নৈতিক শিক্ষা দিয়ে থাকি। এই শিক্ষাগুলো দেওয়ার সময় যদি আমরা সংশ্লিষ্ট কোরআনের আয়াতগুলো উল্লেখ করি, তবে তা তাদের মনে গভীর রেখাপাত করে। পবিত্র কোরআন এমন সব মূল্যবোধে পরিপূর্ণ, যা আমরা আমাদের সন্তানদের শেখাতে চাই। যেমন যখন কোনো সন্তান সত্য কথা বলে, তখন আমরা তাদের সুরা মায়েদার ১১৯ নম্বর আয়াতের শিক্ষা দিতে পারি। সেখানে আল্লাহ তায়ালা ইসা (আ.)-এর সত্যবাদিতার প্রশংসা করে বলেছেন, এটি এমন একদিন যেদিন সত্যবাদীরা তাদের সত্যবাদিতার জন্য উপকৃত হবে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত, যার তলদেশ দিয়ে নদী প্রবাহিত, সেখানে তারা চিরকাল থাকবে। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট। এটিই হলো মহাসাফল্য। (সুরা মায়েদা  ১১৯) এভাবে কুরআনের রেফারেন্স ব্যবহার করলে শিশুরা বুঝবে যে, তাদের ভালো কাজগুলো সরাসরি আল্লাহর নির্দেশের প্রতিফলন।

ছয়. অত্যন্ত আকর্ষণীয় একটি পদ্ধতি হলো গল্পের মাধ্যমে শিক্ষা দেওয়া। কোরআনে এমন অনেক শিক্ষণীয় ও চমৎকার গল্প রয়েছে, যা শিশুদের কল্পনাশক্তিকে নাড়া দেয়। বিশেষ করে পশু-পাখিদের নিয়ে বর্ণিত গল্পগুলো শিশুরা খুব পছন্দ করে। যেমন আবরাহার হাতি, গুহাবাসীদের কুকুর, সালেহ (আ.)-এর উটনি, ইউনুস (আ.)-এর মাছ, কাবিলের কাক এবং সুলাইমান (আ.)-এর পিঁপড়া ও হুদহুদ পাখির গল্প। এই গল্পগুলো যখন আকর্ষণীয়ভাবে তাদের শোনানো হয়, তখন তারা কোরআনের সঙ্গে এক ধরনের আত্মিক বন্ধন অনুভব করে। এই গল্পগুলো কেবল বিনোদন নয়, বরং ইমান ও আখলাকের পাঠ হিসেবে তাদের মনে গেঁথে থাকে।

আমরা যখন এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যাব, তখন আমাদের সন্তানদের জন্য রেখে যাওয়া সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার হবে তাদের ইমান এবং আল্লাহর পথে অটল থাকা। আর এই লক্ষ্য অর্জনে কোরআনের বিকল্প নেই। কোরআন আমাদের সেই পথ দেখায়, যা অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নিয়ে যায়। তাই সন্তান কত ছোট তা বিবেচনা না করে আজ থেকেই তাদের হৃদয়ে কোরআনের ভালোবাসা গেঁথে দেওয়ার চেষ্টা শুরু করা উচিত। এই প্রচেষ্টাই তাদের আগামীর সুন্দর ও আদর্শ জীবনের ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।

লেখক : ইসলামবিষয়ক গবেষক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত