হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী জাহাজের সুরক্ষায় ‘প্রতিরক্ষামূলক’ সামরিক শক্তি প্রয়োগের অনুমোদন দিতে একটি খসড়া প্রস্তাবের ওপর জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ভোট অনুষ্ঠিত হবে। নিরাপত্তা পরিষদের ১৫টি সদস্য রাষ্ট্রের এই বৈঠক এবং ভোটগ্রহণ আজ শনিবার হওয়ার কথা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে প্রস্তাবটি উত্থাপন করেছে বাহরাইন। এতে বলা হয়েছে, ইরানের হামলার প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে জাহাজ চলাচল অব্যাহত রাখতে প্রয়োজনীয় প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দিতে যুক্তরাজ্যের নেতৃত্বে একজোট হয়েছে ৪০টি দেশ।
হরমুজ খোলার বিকল্প উপায়গুলো নিয়ে আলোচনা করতে এই দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা গত বৃহস্পতিবার ভার্চুয়াল বৈঠক করেছেন। তারা একটি যৌথ বিবৃতি সই করে ইরানকে হরমুজ প্রণালি অবরোধ বন্ধ করার দাবি জানিয়েছে এবং এই জলপথ দিয়ে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যথাযথ প্রচেষ্টায় অবদান রাখার অঙ্গীকার করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাবে ইরান হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে। এতে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের হুমকি তৈরি হয়েছে এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
কূটনীতিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতিত্বকারী দেশ বাহরাইন একটি খসড়া প্রস্তাব চূড়ান্ত করেছে, যেখানে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল রক্ষায় ‘প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা’ গ্রহণের অনুমোদনের কথা বলা হয়েছে। বাহরাইন এ প্রস্তাব পাস করাতে উপসাগরীয় আরব দেশগুলো ও যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন পেয়েছে।
জাতিসংঘে বাহরাইনের রাষ্ট্রদূত জামাল আলরোয়াইয়ি বলেন, ‘আমরা অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ মেনে নিতে পারি না। এর প্রভাব শুধু আমাদের অঞ্চলে নয়, পুরো বিশ্বেই পড়ছে।’
এএফপির দেখা ষষ্ঠ ও চূড়ান্ত খসড়ায় বলা হয়েছে, সদস্য দেশগুলো এককভাবে বা বহুজাতিক নৌ জোট গঠন করে ‘প্রয়োজনীয় ও পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক সব ধরনের ব্যবস্থা’ নিতে পারবে। এ ব্যবস্থা হরমুজ প্রণালি ও আশপাশের জলসীমায় প্রযোজ্য হবে। এর লক্ষ্য আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচল নিশ্চিত করা এবং যেকোনো ধরনের অবরোধ বা বাধা প্রতিহত করা। প্রস্তাবটি অন্তত ছয় মাস কার্যকর রাখার কথা বলা হয়েছে।
তবে এ প্রস্তাব আলোর মুখ দেখবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র ভেটো ক্ষমতাধর চীন ও রাশিয়া হরমুজ প্রণালি খুলতে বলপ্রয়োগের অনুমোদনের বিরোধিতা করতে পারে।
এদিকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নিয়ে ট্রাম্প যে দাবি করেছেন, তার উল্টো কথা বলছে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক গোয়েন্দা প্রতিবেদন। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক হামলার পরও ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি অটুট রয়েছে এমনটাই দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দারা। সিএনএনের প্রতিবেদন বলছে, ইরানের ভাণ্ডারে এখনো মজুদ আছে কয়েক হাজার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র। এমনকি পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর সক্ষমতা এখনো ইরানের রয়েছে বলেও জানিয়েছে গোয়েন্দা সূত্র। দুটি সূত্রের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইরানের ড্রোন সক্ষমতার প্রায় ৫০ শতাংশ এখনো অটুট আছে। পাশাপাশি ইরানের উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ক্রুজ মিসাইলের এক বড় অংশও অক্ষত আছে।
যুদ্ধের ৩৫তম দিন গতকাল শুক্রবারও পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত ছিল। কুয়েতের গুরুত্বপূর্ণ তেল শোধনাগার মিনা আল-আহমাদিতে ড্রোন হামলা হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের অন্যতম প্রধান গ্যাস প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র ‘হাবশান গ্যাস কমপ্লেক্স’-এ অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। যার ফলে উৎপাদন বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইরান থেকে আমিরাত লক্ষ্য করে ১৮টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ৪টি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ৪৭টি ড্রোন ছোড়া হয়। সবই আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিতে প্রতিহত করা হয়েছে।
ইরানি বাহিনী জানিয়েছে, শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানসহ দুটি উন্নত যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে। একই সঙ্গে তারা ‘অপারেশন ট্রু প্রমিজ ৪’-এর অংশ হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাতে যুক্তরাষ্ট্রের পাইলটদের একটি গোপন আস্তানা ধ্বংস করে দিয়েছে। ইরানের আকাশে যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার কথা নিশ্চিত করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা।
সেই যুদ্ধবিমানে পাইলটদের খুঁজতে যুক্তরাষ্ট্রের একটি উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার ওই এলাকায় গেলে সেটিকেও ভূপাতিত করা হয়েছে। ইরানের মেহর নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদনে এমন দাবি করে বলা হয়েছে, ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে মার্কিন হেলিকপ্টারটি ভূপাতিত হয়।
