ভ্রমণের নিরাপত্তায় ইসলামের নির্দেশনা

আপডেট : ০৫ এপ্রিল ২০২৬, ০১:৫২ এএম

সফর বা ভ্রমণ মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। জীবিকা নির্বাহ, শিক্ষা অর্জন, দাওয়াত ও তাবলিগ, চিকিৎসা কিংবা বিনোদনের উদ্দেশ্যে মানুষকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সফরে করতে হয়। কিন্তু সফরের পথ সবসময় নিরাপদ ও সহজ হয় না। ঝুঁকি, অনিশ্চয়তা, দুর্ঘটনা এবং বিভিন্ন ধরনের বিপদের সম্ভাবনা থাকে। ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা হিসেবে মানুষের এই সফরকেও অবহেলা করেনি, বরং সফরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কোরআন ও হাদিসে বিস্তারিত দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত বিবরণী উল্লেখ করা হলো।

আল্লাহর ওপর ভরসা : সফরের নিরাপত্তার প্রথম ও প্রধান উপায় হলো আল্লাহর ওপর তায়াক্কুল বা পূর্ণ ভরসা রাখা। কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তিনিই তার জন্য যথেষ্ট।’ (সুরা তালাক ৩)

সফরে বের হওয়ার আগে একজন মুসলিম তার অন্তরকে আল্লাহমুখী করেন। কারণ, মানুষের সব পরিকল্পনা ও সতর্কতার পরও প্রকৃত নিরাপত্তা আল্লাহর হাতেই। তাই সফরের শুরুতেই তাওয়াক্কুল মানুষের মনে সাহস, ধৈর্য ও প্রশান্তি সৃষ্টি করে।

সফরের দোয়া ও জিকির : রাসুলুল্লাহ (সা.) সফরে বের হওয়ার সময় নির্দিষ্ট কিছু দোয়া পড়তেন, যা সফরের নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেমন ‘সুবহানাল্লাজি সাখ্খারা লানা হাজা ওয়া মা কুন্না লাহু মুকরিনিন, ওয়া ইন্না ইলা রব্বিনা লামুনকালিবুন।’ অর্থাৎ পবিত্র সেই সত্তা, যিনি এটিকে আমাদের অনুগত করে দিয়েছেন, অথচ আমরা তা বশে আনতে সক্ষম ছিলাম না এবং আমরা অবশ্যই আমাদের প্রতিপালকের কাছেই ফিরে যাব।

এই দোয়া পাঠের মাধ্যমে একজন মুসলিম আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে এবং তার সাহায্য কামনা করে। এতে তার অন্তরে নিরাপত্তার অনুভূতি জন্ম নেয় এবং আল্লাহর রহমত লাভের আশা বৃদ্ধি পায়।

সময় নির্বাচন ও পরিকল্পনা : ইসলাম সফরের ক্ষেত্রে সময় নির্বাচন ও সুশৃঙ্খল পরিকল্পনার প্রতি গুরুত্ব দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) অধিকাংশ সময় সফরে ভোরবেলা রওনা হতেন। তিনি বলেন, ‘হে আল্লাহ! আমার উম্মতের জন্য সকালবেলার সময়কে বরকতময় করে দিন।’ (সুনানে তিরমিজি)

সকালে সফর শুরু করলে ক্লান্তি কম হয় এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকিও তুলনামূলকভাবে কম থাকে। এ ছাড়া আগে থেকে পথ, যানবাহন, খাদ্য ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে নেওয়া ইসলামী শিক্ষার অংশ।

একা সফর পরিহার : ইসলাম একা সফর করতে নিরুৎসাহিত করেছে, বিশেষ করে দীর্ঘ ও ঝুঁকিপূর্ণ সফরের ক্ষেত্রে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যদি মানুষ জানত একা সফরে কী বিপদ আছে, তবে কেউ একা সফর করত না।’ (সহিহ বুখারি) দলবদ্ধভাবে সফর করলে বিপদের সময় একে অপরের সহযোগিতা পাওয়া যায়। এতে নিরাপত্তা বৃদ্ধি পায় এবং ভয় কমে।

সৎ সঙ্গী নির্বাচন : সফরের নিরাপত্তায় সৎ ও বিশ্বস্ত সঙ্গী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভালো সঙ্গী বিপদের সময় সাহায্য করে, ভুল পথে যেতে বাধা দেয় এবং নৈতিক শক্তি জোগায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) সফরের সময় একজনকে আমির (নেতা) নিযুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে শৃঙ্খলা বজায় থাকে।

নামাজ ও ইবাদতের প্রতি যত : সফরে থাকলেও ইসলাম ইবাদতকে গুরুত্ব দেয়, তবে কিছু ছাড়ও প্রদান করেছে। যেমন চার রাকাত ফরজকে নামাজ দুই রাকাত করে পড়া, প্রয়োজনে নামাজ একত্রে আদায় করা।

নামাজ মানুষকে আল্লাহর স্মরণে রাখে এবং তাকে সব ধরনের অশুভ পরিণাম থেকে রক্ষা করে। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই নামাজ অশ্লীলতা ও অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখে।’ (সুরা আনকাবুত ৪৫)

অতএব, সফরে নামাজ আদায় করা শুধু ইবাদতই নয়, বরং এটি আত্মিক নিরাপত্তারও একটি মাধ্যম।

সতর্কতা ও সাবধানতা অবলম্বন : ইসলাম কেবল আল্লাহর ওপর ভরসা করেই বসে থাকতে বলে না, বরং যথাযথ সতর্কতা অবলম্বনেরও নির্দেশ দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘প্রথমে তোমার উট বেঁধে রাখো, তারপর আল্লাহর ওপর ভরসা করো।’ (সুনানে তিরমিজি) এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, মানুষের উচিত নিজের সাধ্যের মধ্যে সব ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা। যেমনÑ যানবাহনের সঠিক ব্যবহার, ট্রাফিক নিয়ম মানা, প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সঙ্গে রাখা ইত্যাদি।

দোয়া ও ইস্তিগফার : সফরের সময় বেশি বেশি দোয়া ও ইস্তিগফার করা উচিত। কারণ সফর হলো এমন একটি অবস্থা, যেখানে দোয়া কবুল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তিন ব্যক্তির দোয়া কবুল হয়। মজলুমের দোয়া, মুসাফিরের দোয়া এবং সন্তানের জন্য পিতার দোয়া।’ (সুনানে আবু দাউদ) তাই সফরের সময় আল্লাহর কাছে নিরাপত্তা, সুস্থতা ও সফলতা কামনা করা উচিত।

অন্যের অধিকার রক্ষা : সফরের সময় অন্যকে কষ্ট না দেওয়া, কারও সম্পদ নষ্ট না করা এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। এটি সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে এবং পারস্পরিক সৌহার্দ বৃদ্ধি করে।

সফর শেষে কৃতজ্ঞতা : সফর শেষে নিরাপদে ফিরে আসার পর আল্লাহর শোকরিয়া আদায় করা একজন মুমিনের দায়িত্ব। এটি আল্লাহর নেয়ামতের স্বীকৃতি এবং ভবিষ্যতে আরও নিরাপত্তা লাভের একটি মাধ্যম।

আল্লাহর সন্তুষ্টি ও পরকালের সফলতা : ইসলাম সফরের প্রতিটি ধাপে নিরাপত্তার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছে। তাওয়াক্কুল, দোয়া, পরিকল্পনা, সৎ সঙ্গ, ইবাদত, সতর্কতা, সবকিছু মিলিয়ে ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রদান করেছে।

বর্তমান যুগে আধুনিক প্রযুক্তি ও উন্নত যানবাহন থাকা সত্ত্বেও দুর্ঘটনা ও বিপদের ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হয়নি। তাই একজন সচেতন মুসলিম হিসেবে আমাদের উচিত, ইসলামের এই নির্দেশনাগুলো মেনে চলা। এতে আমরা কেবল দুনিয়াবি নিরাপত্তাই অর্জন করব না, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি ও পরকালের সফলতাও লাভ করতে পারব।

লেখক : মুহাদ্দিস, জামিআতুস সুফফাহ আল ইসলামিয়া, গাজীপুর

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত