জেলা প্রশাসক ও জেলা পরিষদে ক্ষমতার সমন্বয় করবে সরকার

আপডেট : ০৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:৪০ এএম

আমলারা সেরা, না নির্বাচিত রাজনীতিবিদরা সেরা এমন বিতর্ক না করে দেশ সেবায় সমন্বিত অংশগ্রহণ চান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তার আমলারা চলবেন প্রচলিত বিধি-বিধান মেনে আর রাজনীতিবিদরা মানবেন সংবিধান। গত ৩০ মার্চ গুরুত্বপূর্ণ দুই বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর এমন নির্দেশনা আসে জেলা প্রশাসক ও জেলা পরিষদে নবনিযুক্ত প্রশাসকদের জন্য। এদিন রাতে গুলশান কার্যালয়ে ৪২ জেলা পরিষদ প্রশাসকের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। নতুন নিয়োগ পাওয়া ১১ জেলার ডিসিদের সঙ্গে সরাসরি বৈঠক করেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী। সভায় ভার্চুয়ালি যুক্ত হন আরও ৩ ডিসি। নির্দেশনা একটাই দেশে স্থিতিশীলতা আর অর্থনৈতিক গতিশীলতা আনতে হবে। সামাল দিতে হবে বৈশ্বিক সংকট পরিস্থিতি।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, নতুন ডিসি নিয়োগ দেওয়ার পর সৌজন্য বৈঠক হয়। এবার বিশেষ কিছু নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সারাবিশ্বের মতো দেশেও জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে। সেই সংকট মোকাবিলায় কাঠোর হতে হবে। যেকোনো ধরনের সিন্ডিকেট, মজুদদারি ও বিশৃঙ্খলা রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ ও তালিকা তৈরির প্রক্রিয়া তদারকি করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। কৃষক কার্ড, ইমাম-মুয়াজ্জিনদের ভাতা তদারকি করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে কঠোর থাকতে বলা হয়েছে। দল ও মত নয় জনজীবনের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিতে বলা হয়েছে। বৈঠকে প্রতিমন্ত্রী এসব নির্দেশনা দেন। পরে অন্যান্য জেলার ডিসিদেরও এই বৈঠকের নির্দেশনাগুলো জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।

বৈঠকে অংশ নেওয়া ডিসিদের কয়েকজন দেশ রূপান্তরকে বলেন, সরকারের অংশ হিসেবে প্রশাসন নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলে। নিয়মের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। সরকারের যে নির্দেশনা এসেছে, তা মানা হবে।

নির্বাচিত সরকার আসার পর ২০ জেলায় নতুন জেলা প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার কাঠামোকে শৃঙ্খলায় ফেরাতে ৫৬ জেলায় নতুন প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। ‘জেলা পরিষদ (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৪’ অনুযায়ী এই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং তারা জেলা পরিষদে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করবেন। মাঠ প্রশাসনে গতি আনতে জনপ্রশাসন ও স্থানীয় সরকারের কাজ এগিয়ে নিতে এসব নিয়োগ দেয় সরকার। ৪২ জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগের পর প্রধানমন্ত্রী তাদের সঙ্গে প্রথম বৈঠকে মাঠ পর্যায়ে কার্যকরভাবে কাজ করার নির্দেশ দেন। বিশেষ করে স্থানীয় সরকার কাঠামো শক্তিশালী করা, তৃণমূল পর্যায়ে উন্নয়ন কর্মকা- ত্বরান্বিত করা এবং জনসেবা নিশ্চিতের বিষয়ে নবনিযুক্ত প্রশাসকদের কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়।

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী দেশ রূপান্তরকে বলেন, সুশাসন নিশ্চিত করতে হলে নিরপেক্ষ প্রশাসনের বিকল্প নেই। প্রশাসনে নিরপেক্ষতা ও দক্ষতা না থাকলে রাষ্ট্রে বিশৃঙ্খলা, লুটপাট এবং অস্থিরতা তৈরি হয়, যা বিদেশি বা আধিপত্যবাদী শক্তির হস্তক্ষেপের সুযোগ সৃষ্টি করে। প্রশাসনিক কাজে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বরদাশত করা হবে না।

জনপ্রশাসন বিশ্লেষকরাও বলছেন, প্রশাসনিক কাজে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ করা যাবে না, প্রয়োজনে আইনের সংস্কার করা যেতে পারে, সময়ের প্রয়োজনে নতুন বিধি-বিধান সংযুক্ত করা যেতে পারে। তবে সবচেয়ে জরুরি হচ্ছে সমন্বিত কাজ। জেলা প্রশাসকরা বরাবরই প্রশাসন দেখে আর স্থানীয় পর্যায় নির্বাচিত প্রতিনিধিরা জনগণের চাওয়াকে সরকারের কাছে উপস্থাপন করে। এখানে সংকট নেই।

সাবেক অতিরিক্ত সচিব ফিরোজ মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, সরকারি চাকরিজীবী বা রাজনীতিবিদ কাউকে নিয়ন্ত্রণে বিশেষ কোনো বিধানের প্রয়োজন নেই। ডিসিদের প্রশাসনিক কাজে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ না হলেই হয়। আবার জেলা পরিষদের কাজে আমলাতান্ত্রিক নাক গলানোর প্রয়োজনও নেই। দুটি ক্ষেত্রই তৈরি হয়েছে সময়ের প্রয়োজনে। তারা নিজের মতো নিজেরদের প্রশাসনিক কাঠামোর আওতায় কাজ করবেন।

তিনি আরও বলেন, আমলারা দুর্নীতি করলে, সরকারের আদেশের বাইরে কাজ করলে রাজনীতিবিদদের উচিত হবে এটি বন্ধ করতে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে জানানো।

সম্প্রতি স্বাধীনতার ঘোষক না বলা নিয়ে এক ইউএনওকে বদলির পর জনপ্রশাসনের প্রতিক্রিয়া ও জটিলতা প্রসঙ্গে ফিরোজ মিয়া বলেন, এসব ক্ষেত্রে সরকার সার্কুলার জারি করতে পারে, জাতীয় দিবস বা বিশেষ দিবসে সরকারি বক্তব্য কী হবে। তাহলে আর জটিলতা তৈরি হবে না। তবে রাজনীতিবিদরা রাজনৈতিক বক্তব্য দেবেন আর প্রশাসনের কর্মকর্তারা তাদের বিধির মধ্যে বক্তব্য দিলেই সংকট তৈরি হয় না। এ ধরনের রাজনৈতিক সংকট প্রায়ই তৈরি হচ্ছে, যা সার্কুলার জারি করে দিলে সমাধান হবে।

এদিকে বিএনপির দলীয় সূত্র জানিয়েছে, দলের নেতাকর্মীদের কর্মকান্ডে সরকারি কর্মকর্তাদের কাজে যেন বিঘ্ন না ঘটে, এ বিষয়ে কঠোর বার্তা দেওয়া হবে। স্থানীয় নেতাকর্মীদের সতর্ক করে দেওয়া হবে, তারা যেন অতি বাড়াবাড়ি না করেন।

বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অনেকবার বক্তব্যে বলেছেন, এমন কিছু করা যাবে না, যাতে জনগণ বিগত আওয়ামী ফ্যাসিবাদের সঙ্গে বিএনপির শাসনামল মেলাতে পারে। এ ব্যাপারে সব সময় সতর্ক থাকতে হবে, প্রধানমন্ত্রী প্রতিটি অন্যায়ের ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স নীতিতে বিশ্বাসী।

বাংলাদেশে জেলার প্রশাসনিক কাঠামোর সূচনা ঘটে মোগল আমলে। স্বাধীনতার পর সংবিধানে স্থানীয় সরকারের সব স্তর নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের দ্বারা পরিচালিত হওয়ার কথা বলা হলেও বাস্তবে তা হয়নি। ১৯৭২ সালে জেলা কাউন্সিলের নাম পরিবর্তন করে ‘জেলা বোর্ড’ করা হয়। জেলা বোর্ড আমলাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ১৯৭৫ সালে বাকশাল প্রতিষ্ঠার পর প্রতিটি জেলায় সংসদ সদস্যকে গভর্নর করার পরিকল্পনা থাকলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। জিয়াউর রহমানের শাসনামলে জেলা পর্যায়ে ‘ডিস্ট্রিক্ট ডেভেলপমেন্ট কো-অর্ডিনেটর (ডিডিসি)’ নামে একটি পদ সৃষ্টি করা হয়, যেখানে সংসদ সদস্যদের উন্নয়ন কার্যক্রম সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়।  খালেদা জিয়ার শাসনামলে (১৯৯১-৯৬) জেলা পরিষদ কাঠামো ভেঙে দিয়ে এতে আবার প্রশাসনিক কর্তৃত্ব পুনঃস্থাপন করা হয় এবং জেলা প্রশাসকের হাতেই ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত রাখা হয়। শেখ হাসিনার শাসনামলে ২০০০ সালে জেলা পরিষদ আইন প্রণয়ন করা হয়। এতে চেয়ারম্যানসহ ২১ সদস্যবিশিষ্ট পরিষদের কাঠামো নির্ধারণ করা হয়। তবে এ সময়েও পরোক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচনের প্রক্রিয়া চালু রাখা হয়। চেয়ারম্যান নিজ নিজ দায়িত্বের এলাকায় ডিসি সমমর্যাদার প্রটোকল পেয়ে থাকেন। ৫ বছরের জন্য নির্বাচিত হন চেয়ারম্যান।

মাঠ প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তা, বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকরা (ডিসি) সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে মাঠ প্রশাসন তারাই নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন। একজন ডিসি জেলায় অন্তত ৩০২টি দায়িত্ব পালন করে আসছেন। প্রতিবছরই জেলা প্রশাসক সম্মেলনে নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর প্রস্তাব করেন ডিসিরা। তবে সর্বশেষ ডিসি সম্মেলনে তারা আইনি ক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তাব করেছেন। এ জন্য ৬৪ ডিসি এবং ৮ বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে লিগ্যাল অ্যাফেয়ার্স লিয়াজোঁ অফিসারের পদ দ্রুত সৃষ্টি করতে বলেছেন তারা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত