শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপি কারা

আপডেট : ০৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:৩৩ এএম

দেশে বর্তমানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫ লাখ ৪৪ হাজার ৮৩১ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে বর্তমান সংসদ সদস্য ও তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ ১১ হাজার ১১৭ কোটি ৩১ লাখ টাকা। ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত হিসাব তুলে ধরে এ তথ্য জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। গতকাল সোমবার জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে এনসিপির সংসদ সদস্য আবুল হাসনাতের (হাসনাত আবদুল্লাহ) প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এ তথ্য জানান। ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে প্রশ্নোত্তর টেবিলে উপস্থাপিত হয়।

হাসনাত আবদুল্লাহর প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপির তালিকা সংসদে তুলে ধরেন। তালিকা অনুযায়ী শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠান হলো এস আলম সুপার এডিবল অয়েল লিমিটেড, এস আলম ভেজিটেবল অয়েল লিমিটেড, এস আলম রিফাইন্ড সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, এস আলম কোল্ড রোলড স্টিলস লিমিটেড, সোনালি ট্রেডার্স, বাংলাদেশ এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট কোম্পানি লিমিটেড, গ্লোবাল ট্রেডিং করপোরেশন লিমিটেড, চেমন ইস্পাত লিমিটেড, এস আলম ট্রেডিং কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড, ইনফিনিট সিআর স্ট্রিপস ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, কেয়া কসমেটিকস লিমিটেড, দেশবন্ধু সুগার মিলস লিমিটেড, পাওয়ার প্যাক মুতিয়ারা কেরানীগঞ্জ পাওয়ার প্ল্যান্ট লিমিটেড, পাওয়ার প্যাক মুতিয়ারা জামালপুর পাওয়ার প্ল্যান্ট লিমিটেড, প্যাসিফিক বাংলাদেশ টেলিকম লিমিটেড, কর্ণফুলী ফুডস (প্রা.) লিমিটেড, মুরাদ এন্টারপ্রাইজ, সিএলসি পাওয়ার কোম্পানি, বেক্সিমকো কমিউনিকেশনস লিমিটেড ও রংধনু বিল্ডার্স (প্রা.) লিমিটেড।

অর্থমন্ত্রী জানান, বর্তমান সংসদ সদস্য ও তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণের পরিমাণ ১১ হাজার ১১৭ কোটি ৩১ লাখ টাকা। এর মধ্যে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী ঋণের মধ্যে ৩ হাজার ৩৩০ কোটি ৮ লাখ টাকা খেলাপি হিসেবে দেখানো হয়নি।

প্রশ্নোত্তরে অর্থমন্ত্রী খেলাপি ঋণ আদায়ে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলো তুলে ধরেন। পদক্ষেপগুলোর মধ্যে রয়েছে শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপি/শ্রেণিকৃত ঋণ আদায়ের অগ্রগতি যাচাই, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি, ক্রেডিট রিস্ক ম্যানেজমেন্ট গাইডলাইন ও ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের তালিকা প্রকাশ, তফসিলি ঋণের নীতিমালা হালনাগাদকরণ।

মাথাপিছু আয় ২ হাজার ৭৬৯ মার্কিন ডলার : বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ প্রকাশিত সরকারি তথ্য অনুযায়ী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের মাথাপিছু আয় ২ হাজার ৭৬৯ মার্কিন ডলার বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সংসদ সদস্য এস এম জাহাঙ্গীর হোসেনের লিখিত প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এ কথা জানান। তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের অন্যতম লক্ষ্য ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির মাইলফলক অর্জন করা। এ লক্ষ্যে সরকার বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়ন, ক্রিয়েটিভ অর্থনীতি, স্পোর্টস অর্থনীতি ইত্যাদিকে বিবেচনার নিয়ে কর্মপরিকল্পনা তৈরি করছে। ইতিমধ্যে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়কে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী সংসদে জনগণের মাথাপিছু আয় বাড়ানোর জন্য সরকার শুধু একটি খাতে নয়, বরং কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, উৎপাদন, রপ্তনি, প্রবাস আয়, দক্ষতা উন্নয়ন, সামাজিক সুরক্ষা এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা সবগুলো দিক একসঙ্গে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে।

গৃহীত পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে- ক) কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বেকারত্ব কমানো দেশে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। উৎপাদন, নির্মাণ, সেবা, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি-প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা খাতে কাজের সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কর্মসংস্থান বাড়লে পরিবারের আয় বাড়ে, ফলে মাথাপিছু আয়ও ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায়। খ) বেসরকারি বিনিয়োগ ও শিল্পায়ন বৃদ্ধি: ব্যবসা শুরু ও সম্প্রসারণের প্রক্রিয়া সহজ করা, বিনিয়োগ-সহায়ক পরিবেশ তৈরি, শিল্প স্থাপনে উৎসাহ দেওয়া এবং উৎপাদনমুখী খাতে অর্থপ্রবাহ বাড়ানোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়লে নতুন কারখানা, নতুন ব্যবসা এবং নতুন চাকরির সুযোগ সৃষ্টি হয়, যা সরাসরি আয় বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। গ) ক্ষুদ্র, মাঝারি ও উদ্যোক্তা খাতে সহায়তা: ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ দেশের কর্মসংস্থানের বড় উৎস। এ খাতের জন্য অর্থায়ন সহজ করা, নতুন উদ্যোক্তাকে সহায়তা দেওয়া, নারী ও যুব উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করা এবং বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে ছোট ব্যবসা বড় হবে, নতুন কর্মসংস্থান ও আয়ের সুযোগ তৈরি হবে এবং স্থানীয় পর্যায়ে অর্থনৈতিক কার্যক্রম বাড়বে। ঘ) রপ্তানি বৃদ্ধি ও বাজার সম্প্র্রসারণ: রপ্তানিমুখী শিল্পকে উৎসাহ প্রদান, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, নতুন বাজার অনুসন্ধান এবং বিদ্যমান বাজার ধরে রাখার মাধ্যমে বৈদেশিক আয় বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। রপ্তানি আয় বাড়লে উৎপাদন বাড়ে, শিল্পে কর্মসংস্থান বাড়ে এবং সামগ্রিকভাবে মানুষের আয় বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়। ঙ) প্রবাস আয় বৃদ্ধি : বিদেশগামী কর্মীদের দক্ষতা বাড়ানো, বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্র্রসারণ, প্রবাস আয় বৈধ পথে পাঠাতে উৎসাহ দেওয়া এবং এ সংক্রান্ত সেবা সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রবাস আয় বাড়লে পরিবারভিত্তিক আয় বাড়ে, গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙা হয় এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অবস্থাও শক্তিশালী হয়। চ) দক্ষতা উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণ দেশীয় ও বিদেশি শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী কারিগরি ও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ সম্প্র্রসারণ করা হচ্ছে। দক্ষ জনশক্তি বেশি আয় করতে পারে, ভালো কাজ পায় এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ায়। এই কারণে দক্ষতা উন্নয়নকে মাথাপিছু আয় বাড়ানোর একটি মৌলিক উপাদান হিসেবে ধরা হচ্ছে। ছ) কৃষি, গ্রামাঞ্চল ও উৎপাদনভিত্তি শক্তিশালী করা : কৃষি উৎপাদন, গ্রামীণ অবকাঠামো, সেচ, খাদ্য সরবরাহ এবং কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র ব্যবসা জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গ্রামে আয় বাড়লে দেশের মোট আয়ও বাড়ে, কারণ জনসংখ্যার বড় অংশ এখনো গ্রামাঞ্চলে বসবাস করে। জ) বাস্তবায়নের সময়সীমা : উল্লিখিত পদক্ষেপগুলোর একটি অংশ চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরেই বাস্তবায়নাধীন আছে। আর বাকি পদক্ষেপগুলো স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে। বিশেষ করে কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, দক্ষতা উন্নয়ন, রপ্তানি ও প্রবাস আয় বৃদ্ধির উদ্যোগগুলো ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে নেওয়া হবে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, মাথাপিছু আয় বাড়ানোর লক্ষ্যে সরকার এমন পদক্ষেপ নিচ্ছে, যেগুলো মানুষের আয় বাড়াবে, বেকারত্ব কমাবে, উৎপাদন ও বিনিয়োগ বাড়াবে, প্রবাস আয় ও রপ্তানি শক্তিশালী করবে এবং একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সুরক্ষিত রাখবে।

পুঁজিবাজারকে গতিশীল করতে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা : দেশের শেয়ার বাজার উন্নয়নে সরকারের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। তিনি জানান, বর্তমান সরকার পুঁজিবাজারকে ‘প্রাণবন্ত’ ও ‘গতিশীল’ করার পাশাপাশি একে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে বদ্ধপরিকর। সরকারদলীয় সংসদ সদস্য মোহাম্মদ ফখরুল ইসলামের এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, পুঁজিবাজারের উন্নয়ন মূলত বিনিয়োগকারীর আস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত। বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধিতে সুশাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, পণ্যের বৈচিত্র্য এবং বিনিয়োগ শিক্ষার প্রসারের মাধ্যমে একটি উন্নত ও টেকসই পুঁজিবাজার গঠনে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এসবের মধ্যে রয়েছে বাজারের গভীরতা বৃদ্ধি, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ, আইনি সংস্কার, বিনিয়োগ শিক্ষার প্রসার।

সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তকে বিনিয়োগ শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশব্যাপী তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য প্রশিক্ষণের পাশাপাশি ‘নিরাপদ বিনিয়োগ-সচেতন নাগরিক’ কর্মসূচির আওতায় তৃণমূল পর্যায়ে প্রচার চালানো হচ্ছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ টেলিভিশনে ‘পুঁজিবাজারের জানা-অজানা’ নামে পাক্ষিক অনুষ্ঠান এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিয়মিত সচেতনতামূলক কনটেন্ট আপলোড করা হচ্ছে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এসব লক্ষ্য বাস্তবায়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে বলে সংসদকে অবহিত করেন অর্থমন্ত্রী।

এক এনআইডিতে একটিই এমএফএস হিসাব : মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস (এমএফএস) বা মোবাইল ব্যাংকিং এবং ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ে প্রতারণা ও হ্যাকিং রোধে কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার। এখন থেকে একজন গ্রাহক একটি জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ব্যবহার করে একটি এমএফএস প্রোভাইডারের অধীনে মাত্র একটি হিসাবই সচল রাখতে পারবেন। এ ছাড়া গ্রাহকের সিমটি তার এনআইডিতে নিবন্ধিত কি না, তাও কঠোরভাবে যাচাই করা হবে। সংসদ সদস্য এস এম জাহাঙ্গীর হোসেনের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী আরও জানান, অনলাইন ব্যাংকিংয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সব ব্যাংকে ‘টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন’ (২ঋঅ) বা দুই স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত