খুন, ধর্ষণ, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, মানব পাচার, অস্ত্র চোরাচালান, ইয়াবা ও স্বর্ণ চোরকারবারসহ নানা ধরনের ভয়ংকর সব অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে রোহিঙ্গারা। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কমে যাওয়ায় এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কারণে ছোট-বড় ৫০টির বেশি অস্ত্রধারী বাহিনী গড়ে তুলেছে রোহিঙ্গাদের একাংশ। ফলে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি ক্যাম্প হয়ে উঠেছে সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য।
রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির, শিবিরে নিয়োজিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, ২০১৭ সাল থেকে উখিয়া ও টেকনাফের ক্যাম্পে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এই জনগোষ্ঠীর জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কমছে মারাত্মক হারে। একই সঙ্গে দীর্ঘ ৯ বছর শিবিরে একপ্রকার বন্দি থাকায় হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন রোহিঙ্গারা। এসব কারণে তাদের একটি অংশ বিপথে হাঁটছেন। সময়ের সঙ্গে এই অংশের পাল্লা ভারী হচ্ছে।
এ বিষয়ে উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা ১৪ এপিবিএন অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ সিরাজ আমিন বলেন, ‘খুন, ধর্ষণ, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, মানব পাচার, অস্ত্র চোরাচালান, ইয়াবা ও স্বর্ণ চোরকারবারসহ আরও কয়েক ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে তারা। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্রে প্রায় সময়ে ক্যাম্পে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে।’
কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এএনএম সাজেদুর রহমান বলেন, ২০১৭ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত সাড়ে ৪ হাজার মামলায় ১০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা আসামি হয়েছে। এর মধ্যে ২৮৮টি হত্যার ঘটনায় ২৭৭ মামলায় ২ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা আসামি। সাড়ে ৩ হাজার মাদকের মামলায় ৫ হাজার ৯৩৫ জন, অস্ত্র-দস্যুতা অপরাধের ১৬৫ মামলায় ৩১২ জন, ধর্ষণ ও নারী-শিশু নির্যাতনের ৩৫২ মামলায় ৫২১ জন, অপহরণের ৩০৬ মামলায় ৩৫৩ জন ও মানব পাচারের ৪ শতাধিক মামলায় ৮৭৯ জন আসামি। এ ছাড়া অন্যান্য আইনে মামলা হয়েছে আরও শতাধিক।
রোহিঙ্গারা বলছেন, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে গণহত্যা থেকে প্রাণে বাঁচতে ৯ বছর আগে বাংলাদেশে শুরু হয়েছিল রোহিঙ্গাদের ঢল। তাদের আর নিজ দেশে ফেরানো যায়নি। দুইবার দিনক্ষণ চূড়ান্ত হয়েছিল, তবে প্রত্যাবাসন শুরু করা যায়নি। বরং গত দেড় বছরে নতুন করে এসেছে ২ লাখের মতো রোহিঙ্গা। নতুন করে জন্ম নিয়েছে ৩ লাখ শিশু। তবুও কমেছে দাতা দেশগুলোর সহযোগিতা।
টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. আলী বলেন, ক্যাম্পে এখনো সক্রিয় এক ডজনের বেশি অপরাধী চক্র। যাদের বেশিরভাগই সশস্ত্র সন্ত্রাসী। সরকারের এসব অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান চালানোর বিকল্প নেই।
এদিকে নিজেদের জাতির একাংশের এভাবে অপরাধে জড়িয়ে যাওয়ায় আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছে সাধারণ রোহিঙ্গারা। এ বিষয়ে উখিয়া কুতুপালং ৫ নম্বর ক্যাম্পের বাসিন্দা আয়েশা বেগম (৩৪) বলেন, ‘আমার স্বামী কোনো দল করতেন না, শুধু রাতে পাহারার কাজ করতেন। মাঝরাতে একদল মুখোশধারী এসে তাকে ঘর থেকে টেনেহিঁচড়ে বের করে নিয়ে যায় এবং গুলি করে মেরে ফেলে। এখন আমি চার সন্তান নিয়ে চরম আতঙ্কে আছি। ক্যাম্পে অন্ধকার নামলেই আমাদের বুক কাঁপে, কখন কার ঘরে হামলা হয় কেউ জানে না।’
বালুখালী ক্যাম্পের মাঝি মোহাম্মদ জুবায়ের (৪২) বলেন, ‘আমরা পুলিশকে অপরাধীদের তথ্য দিতে চাই, কিন্তু তথ্য দিলেই আমাদের ওপর নেমে আসে নির্মম নির্যাতন। আরসা, আরএসও, নবী হোসেন গ্রুপের সশস্ত্র গ্রুপগুলো সাধারণ মানুষের মাঝে মিশে থাকে। পুলিশ এলে তারা পাহাড়ে পালায়, পুলিশ চলে গেলে আবার এসে আমাদের হুমকি দেয়। এখানে সাধারণ রোহিঙ্গারা অপরাধীদের কাছে জিম্মি।’
টেকনাফের লেদা ক্যাম্প-সংলগ্ন স্থানীয় বাংলাদেশি বাসিন্দা নুরুল ইসলাম বলেন, ‘এখন রাত ৮টার পর এই সড়ক দিয়ে একা চলাফেরা করা যায় না। যেকোনো সময় অপহরণের শিকার হতে হয়। গত মাসেও আমাদের এক প্রতিবেশীকে পাহাড়ের ভেতর তুলে নিয়ে ৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায় করেছে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা। আমরা নিজেদের এলাকায় এখন পরবাসী।’
উখিয়ার কুতুপালং এলাকার বাসিন্দা রাজাপালংয়ের ইউপি সদস্য হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘আমার বসতবাড়ি কুতুপালং ক্যাম্পের সঙ্গে লাগানো। এখানকার রোহিঙ্গারা নানা ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। পাশাপাশি তারা স্থানীয়দের শ্রম বাজার দখল করছে। ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে।’
কক্সবাজারের রোহিঙ্গা প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি মাহাবুবুর রহমান বলেন, ‘শুধু ক্যাম্পের ভেতরেই রোহিঙ্গারা অপরাধে জড়াচ্ছে এমন নয়। সারা জেলায় সংঘটিত খুন, অপহরণ, মানব পাচার, ইয়াবা কারবারসহ নানা অপরাধে যত মামলা হয় তার এক-তৃতীয়াংশের সঙ্গে রোহিঙ্গারা জড়িত।’
এদিকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অপরাধ ও সহিংসতার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের বাংলাদেশ প্রধান ইভো ফ্রেজেন জানিয়েছেন, রোহিঙ্গাদের অপরাধমূলক কর্মকান্ড ও শিবিরের ভেতরের সহিংসতার পেছনে মূলত আন্তর্জাতিক অর্থায়ন বা মানবিক সহায়তার ব্যাপক ঘাটতি এবং দীর্ঘস্থায়ী বন্দি জীবন দায়ী। তিনি মনে করেন, শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দিয়ে এই অপরাধ দমন করা সম্ভব নয়। এর জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে তহবিল বা মানবিক সহায়তা বাড়াতে হবে এবং রোহিঙ্গাদের জীবন ধারণের জন্য ক্যাম্পের অভ্যন্তরে কিছু উৎপাদনশীল বা আত্মনির্ভরশীল কাজের সুযোগ তৈরি করতে হবে, যাতে তারা অপরাধমূলক পথে পা না বাড়ায়।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, ‘দীর্ঘ ৯ বছর ধরে প্রত্যাবাসন ঝুলে থাকায় এই বিশাল জনগোষ্ঠীর মাঝে চরম হতাশা তৈরি হয়েছে। এই হতাশাকে পুঁজি করে আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় অপরাধী চক্র তাদের মাদক ও অস্ত্র চোরাচালানের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। আমরা ক্যাম্পের ভেতর কাঁটাতারের বেষ্টনী ও সিসি ক্যামেরা কাভারেজ আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা করছি।’
এই বিষয়ে ক্যাম্পের নিরাপত্তায় নিয়োজিত এপিবিএন পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ সিরাজ আমিন বলেন, ক্যাম্পগুলোর ভৌগোলিক গঠন অত্যন্ত জটিল। এক একটি ব্লকে হাজার হাজার মানুষ অত্যন্ত গাদাগাদি করে থাকে। অপরাধ করে অন্য ব্লকে বা পাহাড়ে লুকিয়ে গেলে তাদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে আমরা গোয়েন্দা নজরদারি বাড়াচ্ছি এবং নিয়মিত বিশেষ যৌথ অভিযান পরিচালনা করছি। শিগগিরই যেকোনো অপরাধ নির্মূল করা হবে।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পের আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে কাজ করা এফডিএমএনের ডিআইজি মিয়া মাসুদ করিম বলেন, ‘উখিয়া-টেকনাফের পাহাড়ি পথের ৩৩টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ১৫ লাখ মানুষের মধ্য থেকে আসামিদের নিয়ন্ত্রণ এবং চিহ্নিত করা কঠিন। তবে ক্যাম্পের বর্তমান পরিস্থিতি অন্যান্য সময়ের চেয়ে অনেক ভালো।’