মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ

৪৫ দিনের যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা

আপডেট : ০৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:৩৬ এএম

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলমান যুদ্ধের অবসানে ৪৫ দিনের একটি সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতির শর্তাবলি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। গতকাল সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, সংঘাত বন্ধের জন্য পাকিস্তান একটি কাঠামো তৈরি করেছে যেখানে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একটি যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনার রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। এতে দুই ধাপের একটি প্রস্তাবনা রয়েছে প্রথমে তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতি এবং পরে একটি সমন্বিত শান্তিচুক্তি। পাকিস্তান, মিসর ও তুর্কি মধ্যস্থতাকারীদের সাহায্যে তেহরান-ওয়াশিংটন এ আলোচনার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচির মধ্যেও বার্তা আদান-প্রদান চলছে বলে জানিয়েছে অ্যাক্সিওস। মধ্যস্থতাকারীরা মনে করছেন, কেবল চূড়ান্ত চুক্তির মাধ্যমেই হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি উন্মুক্ত এবং ইরানের উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিয়ে সংকটের অবসান ঘটতে পারে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আংশিক কোনো চুক্তিতে পৌঁছানোর সম্ভাবনা ক্ষীণ হলেও পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি ঠেকাতে এই প্রচেষ্টাটিই এখন একমাত্র সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই চেষ্টা ব্যর্থ হলে ইরানের বেসামরিক অবকাঠামোতে ব্যাপক হামলা এবং পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে উপসাগরীয় দেশগুলোর জ¦ালানি ও পানি শোধনাগারগুলোতে ভয়াবহ হামলার আশঙ্কা রয়েছে।

প্রস্তাব অনুযায়ী, অবিলম্বে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে, বিস্তৃত সমঝোতা চূড়ান্ত হওয়ার পর ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি ফের খোলা হবে। এর মধ্যে প্রণালিটির জন্য একটি আঞ্চলিক কাঠামো অন্তর্ভুক্ত থাকবে, আর সরাসরি চূড়ান্ত আলোচনা হবে ইসলামাবাদে। এ প্রস্তাবগুলোকে অস্থায়ীভাবে ‘ইসলামাবাদ অ্যাকর্ড’ বলা হচ্ছে। ইরানি কর্মকর্তারা এর আগে রয়টার্সকে জানিয়েছিলেন, তেহরান একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতি চায়। ওই সূত্র জানায়, চূড়ান্ত সমঝোতায় নিষেধাজ্ঞায় ছাড় ও জব্দ করা সম্পদ ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে তেহরান পারমাণবিক অস্ত্র বানানোর চেষ্টা করবে না, এমন প্রতিশ্রুতি দেবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। পাকিস্তানের দুই সূত্র জানিয়েছে, সামরিক ও বেসামরিক পর্যায়ে ব্যাপক উদ্যোগ নেওয়া সত্ত্বেও ইরান এখনো কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি। এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানি কর্মকর্তাদের কাছ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আন্দ্রাবি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে আস্থা বাড়াতে মধ্যস্থতাকারীরা আপাতত দুপক্ষের কাছ থেকেই অগ্রগতি দেখতে চাইছেন। ইরানের কী কী দাবি যুক্তরাষ্ট্র মেনে নিতে পারে, সেগুলো নিয়েও মধ্যস্থতাকারীরা কাজ করছেন। তারা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের বেঁধে দেওয়া ৪৮ ঘণ্টা সময়সীমার মধ্যেই ইরানের দিক থেকে ইতিবাচক পদক্ষেপ চান। তবে ইরানি আলোচকরা মধ্যস্থতাকারীদের স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন তারা গাজা বা লেবাননের মতো পরিস্থিতি চান না, যেখানে ‘কাগজে যুদ্ধবিরতি থাকলেও পুনরায় আক্রমণ করার সুযোগ থাকবে।

রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে গতকাল সোমবার ইরানের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কোনো সাময়িক যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে ইরান হরমুজ প্রণালি খুলবে না। এ ছাড়া শান্তি প্রস্তাবটি পর্যালোচনার ক্ষেত্রে তেহরান কোনো ধরনের ‘ডেডলাইন’ বা সময়সীমাও মেনে নেবে না। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) ঘনিষ্ঠ তাসনিম নিউজ বলছে, ইরানের নীতিতে যুদ্ধের ছায়ায় ৪৫ দিনের অস্থায়ী বিরতির কোনো স্থান নেই। অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদন বিষয়ে তাসনিমের যুদ্ধবিষয়ক বিশ্লেষক দলের মত হলো ইরানি বিদ্যুৎকেন্দ্র ও অন্যান্য স্থাপনায় হামলার মতো পাগলামি করা হলে, ইরান যে সমুচিত জবাব দেবে, সে বিষয়ে বুঝতে পেরে ট্রাম্প তৃতীয়বারের মতো তার হুমকি থেকে পিছু হটার সুযোগ খুঁজছেন।

আইআরজিসির দুই শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত : ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর গোয়েন্দাপ্রধান মাজিদ খাদেমি নিহত হয়েছেন। গতকাল সোমবার আইআরজিসি তার নিহতের খবর নিশ্চিত করেছে। এ হামলার জন্য সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে দায়ী করেছে। তবে খাদেমি ঠিক কোথায় বা কীভাবে নিহত হয়েছেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। পরে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ এবং ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) পক্ষ থেকে এই হত্যার দায় স্বীকার করা হয়। টেলিগ্রামে দেওয়া এক পোস্টে আইডিএফ বলেছে, এই হত্যাকাণ্ড ইরানের বিপ্লবী গার্ডের জন্য আরও একটি বড় ধাক্কা। ২০২৫ সালের ১৫ জুন ইসরায়েলি হামলায় আইআরজিসির তৎকালীন গোয়েন্দাপ্রধান মোহাম্মদ কাজেমি নিহত হন। এর চার দিন পর তার স্থলাভিষিক্ত হন খাদেমি। গোয়েন্দাপ্রধানের পাশাপাশি আইআরজিসির অভিজাত শাখা কুদস ফোর্সের গোপন বা আন্ডারকাভার ইউনিটের প্রধান আসগর বাকেরিকে হত্যার দাবি করেছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। আইডিএফের মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাদাভ শোশানি বলেন, ইসরায়েল, সিরিয়া ও লেবাননে কুদস ফোর্সের বিভিন্ন গোপন সামরিক অভিযান পরিচালনার পেছনে নিহত বাকেরির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

হামলা অব্যাহত : গতকাল সোমবারও ইরান-ইসরায়েলের পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত ছিল। ইসরায়েলের মধ্যাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চলে বিকট বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া গেছে। জেরুজালেম, তেলআবিব এবং এলিয়াতে এসব বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। আইডিএফ বলছে, এলিয়াতকে ইয়েমেন থেকে আসা ড্রোনের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। ইসরায়েলের আরুৎজ সেভা মিডিয়া জানিয়েছে ইরান, লেবানন ও ইয়েমেন থেকে সমন্বিত হামলা চালানো হয়েছে। ইসরায়েলের হাইফা শহরের একটি ভবনে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত চারজন নিহত হয়েছেন। ইসরায়েলের জরুরি সেবা বিভাগের তথ্যমতে, ইরান ক্ষেপণাস্ত্রে গুচ্ছ বোমা ব্যবহার করায় ইসরায়েলের অন্তত ২৮ স্থানে ক্ষতি হয়েছে। অন্যদিকে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে সাউথ পার্স পেট্রোকেমিক্যাল প্ল্যান্টে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ বলেন, এটি ইরানের প্রায় ৫০ শতাংশ পেট্রোকেমিক্যাল উৎপাদন করে। এরপর মারভদাশত পেট্রোকেমিক্যাল কমপ্লেক্সেও হামলা হয়। মারভদাশত কাউন্টি গভর্নরের অফিসের বরাতে তাসনিম নিউজ জানিয়েছে, এ হামলায় উল্লেখযোগ্য কোনো ক্ষতি হয়নি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত