অধস্তন আদালতের ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ (কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতিদান ও ছুটি মঞ্জুরিসহ) শৃঙ্খলা বিধান রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত থাকবে সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের এমন বিধান বাতিল করে হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় গতকাল মঙ্গলবার প্রকাশিত হয়েছে। এতে সুপ্রিম কোর্টের পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করতে নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট।
এ সংক্রান্ত একটি রিট আবেদনের ওপর চূড়ান্ত শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট সাত মাস আগে রায় দেয়। সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা জানান, ১৮৫ পৃষ্ঠার এ রায়ের অনুলিপি গতকাল তারা হাতে পেয়েছেন। রায়টি ইতিমধ্যে সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে।
রায়ে হাইকোর্ট বলে, ‘আমাদের মতামত হলো, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে দ্বৈত-শাসন নীতি চলতে পারে না। অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ থাকবে সুপ্রিম কোর্টের হাতে। এ জন্য একটি পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে।’
হাইকোর্ট রায়ে বলেছে, ‘সার্বিক পরিস্থিতিতে আমাদের নির্দেশনা হলো, সুপ্রিম কোর্ট সীমানার মধ্যে একটি স্বাধীন সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে।’
হাইকোর্ট আশা প্রকাশ করেছে, বিচার বিভাগ নিয়ে দ্বৈত কর্তৃপক্ষের বিষয় বাতিল করে সুপ্রিম কোর্টের অধীনে পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে। এ জন্য প্রয়োজনীয় বাজেট, অবকাঠামো ও লোকবলের ব্যবস্থা করা হবে। সুপ্রিম কোর্টের আলাদা সচিবালয় প্রতিষ্ঠার জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গত বছরের ৩০ নভেম্বর ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়। অধ্যাদেশ অনুযায়ী, বিচার বিভাগের সব প্রশাসনিক ও সাচিবিক দায়িত্ব এখন থেকে পালন করবে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়। অধস্তন আদালতের তত্ত্বাবধান, নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলার সবকিছুর দায়িত্ব থাকবে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়। এ দায়িত্ব এতদিন নির্বাহী বিভাগ তথা আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের হাতে ছিল।
বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চ গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর এ রায় দেয়। রায়ে বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলাসংক্রান্ত ১৯৭২ সালের সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ পুনর্বহাল করেছে আদালত। পাশাপাশি অধস্তন আদালতের জন্য ২০১৭ সালে জারি করা শৃঙ্খলাবিধি বাতিল করেছে হাইকোর্ট।
এ রায়ের ধারাবাহিকতায় গত বছরের ১২ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্টের একটি প্রশাসনিক ভবনে যাত্রা শুরু করে বিচার বিভাগের এই পৃথক সচিবালয়।
এদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে করা সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপির নেতৃত্বাধীন নবনির্বাচিত সরকার। এ সংক্রান্ত একটি বিল গত সোমবার জাতীয় সংসদে উত্থাপন করেছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।
এমন পরিস্থিতিতে হাইকোর্টের এই রায়ের পর সরকার ও বিচার বিভাগের মধ্যে টানাপড়েন এবং সাংবিধানিক জটিলতা তৈরি হতে পারে, এমন আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা। তারা মনে করেন, রায় অনুযায়ী এ সমস্যাটি নিয়ে আপিল বিভাগের কাছ থেকে একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুুযোগ আছে।
এ মামলায় আদালতে রিট আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন তখনকার অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান, যিনি এখন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী।
অ্যামিকাস কিউরি (আদালতকে আইনি সহায়তাকারী) হিসেবে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া। তিনি গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, হাইকোর্টের এই রায়ের আলোকে বিচার বিভাগের পৃথক সচিবালয় না করলে তা আদালত অবমাননার শামিল হবে। তবে সরকার চাইলে হাইকোর্টের এই রায় স্থগিত চেয়ে আপিল বিভাগে আবেদন করতে পারে। তখন সর্বোচ্চ আদালত আপিল বিভাগে বিষয়টির সুরাহা হবে।
এক প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় নিয়ে সরকার ও বিচার বিভাগের মধ্যে এক ধরনের টানাপড়েন তৈরি হতে পারে। কারণ সরকার ইতিমধ্যে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ বাতিলের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। অন্যদিকে হাইকোর্ট বলেছে সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে।’
রিটকারীদের আইনজীবী শিশির মনির এক ভিডিওবার্তায় বলেন, হাইকোর্ট সুস্পষ্ট রায় দিয়ে বলেছে, এখন থেকে অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ সুপ্রিম কোর্টের হাতে থাকবে। রাষ্ট্রপতি, সরকার বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষের ওপরে নয়। তিনি বলেন, ‘বিচারকদের বদলি, পদোন্নতি, ছুটি ও শৃঙ্খলা সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করবে সুপ্রিম কোর্ট। কোনো নির্বাহী বিভাগ এটি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না।’
অ্যাডভোকেট শিশির মনির আরও বলেন, ‘আমরা শুনছি, অন্তর্বর্তী সরকারের করা সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশটি বাতিল করা হচ্ছে। আমি অনুরোধ করব, আপনারা (সরকার) হাইকোর্টের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবেন। আজ (গতকাল) রায় প্রকাশিত হয়েছে, এই রায়ের আলোকে বিচার বিভাগের পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা অনিবার্য। তিন মাসের মধ্যে এর কার্যক্রম শুরু করতে হবে।’
এসব বিষয়ে কথা বলতে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের সঙ্গে মুঠোফোনে ও হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে দেশ রূপান্তর থেকে যোগাযোগ করলেও সাড়া মেলেনি।
১৯৭২ সালের সংবিধানে ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলাসংক্রান্ত বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত থাকার কথা। তবে ১৯৭৫ সালে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে এই দায়িত্ব রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত করা হয়। এরপর পঞ্চম সংশোধনীতে এই অনুচ্ছেদে ‘সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক তা প্রযুক্ত হবে’ শব্দগুলো যুক্ত করা হয়।
বর্তমান সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের ভাষ্য, ‘বিচার কর্মবিভাগে নিযুক্ত ব্যক্তিদের এবং বিচার বিভাগীয় দায়িত্বপালনরত ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ (কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতি দান ও ছুটি মঞ্জুরিসহ) ও শৃঙ্খলা বিধান রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত থাকবে এবং সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক তা প্রযুক্ত হবে।’
হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়েছে, ১১৬ অনুচ্ছেদ সংশোধন সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এতে আরও বলা হয়, ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের ৩৯ ধারা অনুসারে ১১৬ অনুচ্ছেদের সংশোধন সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে বাতিল করা হলো। এ ছাড়া ১৯৭৫ সালের চতুর্থ সংশোধনী আইনের ১৯ ধারার মাধ্যমে ১১৬ অনুচ্ছেদ সংশোধনও সাংঘর্ষিক উল্লেখ করে বাতিল করে হাইকোর্ট।
রায়ে আরও বলা হয়, ১৯৭২ সালের সংবিধানে ১১৬ অনুচ্ছেদ যেভাবে ছিল, তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুনরুজ্জীবিত ও সংবিধানে পুনর্বহাল হবে।
ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ (কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতিদান ও ছুটি মঞ্জুরিসহ) শৃঙ্খলা বিধানের দায়িত্ব সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত চেয়ে ২০২৪ সালের ২৫ আগস্ট সুপ্রিম কোর্টের কয়েকজন আইনজীবীর পক্ষে অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির এ রিট আবেদনটি করেন। আবেদনের যুক্তিতে তখন তিনি বলেন, মূলত রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত এ দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগের তথা আইন ও বিচার মন্ত্রণালয়ের সরাসরি হস্তক্ষেপ দেখা যায়; কার্যত তা আইন মন্ত্রণালয়ই করে, যা বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে খর্ব করে।
শুনানি নিয়ে ওই বছরের ২৭ অক্টোবর ১১৬ অনুচ্ছেদের এই বিধানের বৈধতা প্রশ্নে এবং বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয় নিয়ে রুল দেয় হাইকোর্ট। ১১৬ অনুচ্ছেদের এ বিধান কেন অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চায় আদালত। পাশাপাশি ২০১৭ সালে প্রণীত বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (ডিসিপ্লিনারি) রুলস কেন অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না, বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয় করার নির্দেশনা কেন দেওয়া হবে না, রুলে তাও জানতে চায় হাইকোর্ট। এ মামলায় শুনানি শেষ হয় গত বছরের ১৩ আগস্ট; আর রায় হয় ২ সেপ্টেম্বর।
অধস্তন আদালতের ২৮ বিচারককে শোকজ : বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ায় অধস্তন আদালতের ২৮ জন বিচারককে কারণ দর্শানোর নোটিস (শোকজ) দিয়েছে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়। গত ১ এপ্রিল এ নোটিস দেওয়া হয়। নোটিস পাওয়ার ৭ কার্যদিবসের মধ্যে তাদের এ বিষয়ে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নোটিসে সংশ্লিষ্ট বিচারকদের বলা হয়েছে, তারা সামাজিকমাধ্যম ব্যবহার করে নিয়োগকারী ও নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ সম্পর্কে নানাবিধ বিরূপ মন্তব্য ও উসকানি দিয়েছেন। এর মাধ্যমে ব্যক্তিগত অনুভূতি প্রকাশ করে সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক জারিকৃত সামাজিকমাধ্যম ব্যবহার-সংক্রান্ত নির্দেশনা অমান্য করেছেন, যা অসদাচরণ হিসেবে গণ্য।
এতে আরও বলা হয়েছে, ওই বিচারকরা উক্ত কার্যকলাপের মাধ্যমে ‘বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (শৃঙ্খলা) বিধিমালা, ২০১৭’-এর সংশ্লিষ্ট বিধি অনুযায়ী চাকরির শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে ক্ষতিকর কার্যে লিপ্ত হয়েছেন, যা অসদাচরণের শামিল।
চিঠিতে বর্ণিত অভিযোগের বিষয়ে পত্র প্রাপ্তির ৭ (সাত) কার্যদিবসের মধ্যে লিখিত ব্যাখ্যা দাখিল করার জন্য তাদের অনুরোধ করা হয়।
