উপসাগরীয় অঞ্চলের ক্রমবর্ধমান সংঘাত, জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক কূটনীতির টানাপড়েনের মধ্যে এখন বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদ। কেননা ৪৭ বছরের মধ্যে প্রথমবার এ শহরে আজ বৈঠকে বসবেন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সরকার পর্যায়ের কর্মকর্তারা। লক্ষ্য স্থায়ীভাবে পশ্চিম এশিয়ার ত্রিমুখী লড়াইয়ের অবসান। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য সমঝোতার লক্ষ্যে আয়োজিত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠককে ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তৈরি হয়েছে ব্যাপক আগ্রহ, প্রত্যাশা এবং একই সঙ্গে শঙ্কা। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনায় অংশ নিতে ইতিমধ্যে পাকিস্তানে পৌঁছেছে ইরানের প্রতিনিধিদল। এ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে আছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ও পার্লামেন্টের স্পিকার বাঘের গালিবাফ। আর যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের নেতৃত্ব প্রতিনিধিদলে থাকবেন ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জামাতা জ্যারেড কুশনার।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক অভিযান শুরুর পর প্রথম প্রথম সরাসরি আলোচনা ঘিরে ইসলামাবাদকে নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেলা হয়েছে। পাঁচতারকা হোটেল সেরেনা এবং আশপাশের তিন কিলোমিটার এলাকা সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে ফেলা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদল সেখানেই অবস্থান করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, আলোচনায় ‘শাটল ডিপ্লোমেসি’ পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিরা আলাদা কক্ষে অবস্থান করবেন এবং পাকিস্তানের কর্মকর্তারা দুপক্ষের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান করবেন। পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার এই আলোচনায় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করবেন। বৈঠকের আগে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ পৃথকভাবে দুপক্ষের সঙ্গে বৈঠক করতে পারেন বলেও জানা গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এ পদ্ধতি সাধারণত তখনই ব্যবহৃত হয়, যখন দুপক্ষের মধ্যে সরাসরি আস্থা অত্যন্ত কম থাকে, যা এই সংঘাতের ক্ষেত্রেও স্পষ্ট।
যদিও শুরু থেকেই এই যুদ্ধবিরতি ছিল ভঙ্গুর। উভয় পক্ষের শর্ত ব্যাখ্যায় পার্থক্য, পাশাপাশি লেবাননে ইসরায়েলের নতুন করে হামলা সব মিলিয়ে এই সমঝোতা এখনো অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।
আলোচনার প্রধান বিষয়গুলোতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এখনো সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেহরানের দেওয়া প্রস্তাবগুলোকে আলোচনার ‘ভিত্তি’ হিসেবে বর্ণনা করলেও মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নির্ধারণী এই যুদ্ধ বন্ধে দুপক্ষই নিজ নিজ দাবিতে অনড়। রয়টার্স বলছে, ইরানের ১০ দফা প্রস্তাবের সঙ্গে ওয়াশিংটনের দেওয়া আগের ১৫ দফা পরিকল্পনার সঙ্গে এর মিল নেই বললেই চলে। যেমনÑ ইরানের প্রস্তাবে তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে, যা ওয়াশিংটন আগেই নাকচ করে দিয়েছিল এবং ট্রাম্প বলেছিলেন, এ বিষয়টি আলোচনাযোগ্য নয়। ইরানের ১০ দফায় তাদের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নিয়ে কিছু বলা হয়নি, অথচ ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ওই সক্ষমতা রাতারাতি কমিয়ে আনার দাবি জানিয়ে আসছে। তেহরান বলেছে, তাদের ‘শক্তিশালী’ ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার নিয়ে কোনো আপস হবে না। যদিও গত এক মাসের লড়াইয়ের পর আর কত ক্ষেপণাস্ত্র অবশিষ্ট আছে তা স্পষ্ট নয়। একজন পাকিস্তানি কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে রয়টার্স লিখেছে যুদ্ধপরবর্তী পুনর্গঠন, ক্ষতিপূরণ ও নিষেধাজ্ঞা শিথিলের মতো বিষয়ে ইরান হয়তো কিছু দাবি আদায় করে নিতে পারবে, কিন্তু ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে সমঝোতার আশা নেই বললেই চলে। আগের আলোচনাগুলোতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা গুরুত্ব পেত। কিন্তু এখন সেগুলো ছাপিয়ে গেছে হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ, যে জলপথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বিভিন্ন দেশে সরবরাহ করা হয়।
হরমুজ নিয়ে অনিশ্চয়তা : সাম্প্রতিক এই সংঘাতের সরাসরি প্রভাব পড়ে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট হরমুজ প্রণালিতে। যুদ্ধ শুরুর পরপরই ইরান কার্যত এই প্রণালিতে চলাচল সীমিত করে দেয়, যেখানে স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস পরিবাহিত হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছে যায় এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা আরও গভীর হয়। পারস্য উপসাগরের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী তেলবাহী ট্যাংকারগুলো থেকে ইরানের ‘টোল’ বা মাসুল আদায়ের খবরে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত বৃহস্পতিবার ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া পোস্টে তিনি এই টোল আদায় অবিলম্বে বন্ধের দাবি জানান। ট্রাম্প বলেন, ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়া ট্যাংকারগুলো থেকে ফি আদায় করছে। তারা যেন এমনটি না করে; আর যদি করেও থাকে তবে এখনই তা বন্ধ করা উচিত! যুক্তরাষ্ট্র দাবি করছে, হরমুজ প্রণালি ‘উন্মুক্ত’ রয়েছে। তবে ওয়াশিংটনের কর্মকর্তারা বলছেন, এখনো সেখানে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হয়নি। এদিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি ঘোষণা দিয়েছেন, এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি এখন থেকে ইরানের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। যুদ্ধবিরতির শর্তানুযায়ী হরমুজি প্রণালি খুললেও এই জলপথ দিয়ে যেতে হলে যে কিছু শর্ত ও সতর্কতা মেনে চলতে হবে এবং পথটি যুদ্ধের আগের অবস্থায় ফিরে যেতে এখনো দীর্ঘ সময় লাগবে, তা স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে ইরান। গত বৃহস্পতিবার তেহরান জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হলেও অগণিত জাহাজকে এ পথে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হবে না। দিনে ১৫টি জাহাজ এ পথ দিয়ে চলাচল করতে পারবে। রাশিয়ার বার্তা সংস্থা তাসকে এ কথা জানিয়েছেন ইরানের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) তত্ত্বাবধানে এই নতুন বিধিমালার আওতায় পরিচালিত হচ্ছে হরমুজ প্রণালি। তবে হরমুজ প্রণালিতে সামরিক পদক্ষেপের বিষয়ে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনালাপের মূল গুরুত্ব ছিল প্রণালিতে নিরাপদ নৌচলাচল নিশ্চিত করার বাস্তব পরিকল্পনা। স্টারমার বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন দেশকে নিয়ে একটি জোট গঠনের চেষ্টা করছি, যেখানে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পরিকল্পনার পাশাপাশি সামরিক সক্ষমতা এবং কীভাবে বাস্তবে জাহাজগুলোকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদে পার করা যায়, সেসব বিষয়েও কাজ চলছে’।
এদিকে গতকাল শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর নজরদারি ড্রোন এমকিউ-৪ সি হরমুজ প্রণালির ওপর থেকে নিখোঁজ হয়েছে। নিখোঁজ হওয়ার কিছুক্ষণ আগেই ড্রোনটি উড়ন্ত অবস্থায় জরুরি সতর্কবার্তা পাঠিয়েছিল। এটি বিধ্বস্ত হয়েছে নাকি ভূপাতিত করা হয়েছে, তা এখনো পরিষ্কার নয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ড্রোনটি পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিতে প্রায় তিন ঘণ্টার নজরদারি শেষ করে ইতালির ‘নেভাল এয়ার স্টেশন সিগোনেলা’ ঘাঁটিতে ফিরে আসছিল। এটি যখন ‘কোড ৭৭০০’ (সাধারণ জরুরি অবস্থার সংকেত) পাঠিয়েছে ও নিচে নামতে শুরু করেছে, তখন এটি ইরানের দিকে সামান্য মোড় নিয়েছিল। চালকবিহীন এই বিমান নিখোঁজ হওয়ার আগে দ্রুত উচ্চতা হারাচ্ছিল বলে শনাক্ত করা হয়।
