অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (এএমআর) বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্যের একটি জটিল ও ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জ। অ্যান্টিবায়োটিকসহ অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ওষুধের প্রতি জীবাণুর প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির ফলে যে চিকিৎসা ব্যর্থতা সৃষ্টি হয় তা স্বাস্থ্যব্যবস্থা, কৃষি, প্রাণিসম্পদ এবং অর্থনীতির জন্য গুরুতর সমস্যা সৃষ্টি করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০১৪ সালে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সকে বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্যের অন্যতম প্রধান হুমকি হিসেবে ঘোষণা করে। বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর প্রায় ১.২৭ মিলিয়ন মানুষ সরাসরি অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের কারণে মারা যায় এবং মোট ৪.৯৫ মিলিয়ন মৃত্যুর পেছনে এর প্রভাব রয়েছে। বাংলাদেশেও তা ক্রমে জটিল আকার ধারণ করছে, যেখানে মানব, প্রাণী এবং পরিবেশ তিন ক্ষেত্রেই প্রতিরোধী জীবাণুর বিস্তার সুস্পষ্ট।
অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কার চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে এক বিপ্লব। তবে মাত্র কয়েক দশকের ব্যবধানে এই জীবনরক্ষাকারী ওষুধের কার্যকারিতা হ্রাস পাচ্ছে। জীবাণুর জিনগত অভিযোজন এবং মানবসৃষ্ট ভুল ব্যবহারের কারণে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের বিকাশ এখন একটি বহুমুখী স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রূপ নিয়েছে। এ সমস্যার ফলে সাধারণ সংক্রমণ জটিল হয়ে উঠছে, চিকিৎসা ব্যয় বাড়ছে, রোগীর হাসপাতালে থাকার সময় দীর্ঘ হচ্ছে এবং সার্জারির মতো চিকিৎসা প্রক্রিয়া ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ছে। প্রাণিসম্পদ উৎপাদন ও খাদ্যনিরাপত্তার ওপরও এর সুস্পষ্ট প্রভাব রয়েছে।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এএমআরের অসুস্থতা ও মৃত্যুহার
দ্য ল্যানসেট-২০২২ এ প্রকাশিত একটি বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০১৯ সালে ১.২৭ মিলিয়ন মানুষ সরাসরি অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের কারণে মারা গেছে। বিশ্বের প্রায় ৪.৯৫ মিলিয়ন মানুষের মৃত্যুর সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স জড়িত ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৫০ সাল নাগাদ এএমআরে মৃতের সংখ্যা বছরে ১ কোটিতে পৌঁছাবে। দক্ষিণ এশিয়া ও সাব-সাহারা আফ্রিকা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল।
প্রতিরোধী জীবাণুর বিস্তার : বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী সাধারণ ব্যাকটেরিয়া (যেমন E. coli, Klebsiella pneumoniae, Staphylococcus aureus)-এর ৭০%-এর বেশি অন্তত একটি অ্যান্টিবায়োটিকের প্রতি প্রতিরোধী। Carbapenem-resistant Klebsiella pneumoniae এখন অনেক দেশে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত। | Multidrug-resistant (MDR) I Extensively drug-resistant (XDR) জীবাণুর প্রাদুর্ভাব দ্রুত বাড়ছে।
অর্থনৈতিক প্রভাব : বিশ্ব ব্যাংক ২০১৭ সালের হিসাব অনুযায়ী ২০৩০ সাল নাগাদ অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে ১ থেকে ৩.৪ ট্রিলিয়ন ডলার ক্ষতি হতে পারে। খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থায় ১১% পর্যন্ত ক্ষতির আশঙ্কা করছে।
প্রাণিসম্পদ খাতের পরিস্থিতি : গবেষণায় দেখা গেছে, ৭০-৮০% খামারে অ্যান্টিবায়োটিককে গ্রোথ প্রোমোটর হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ব্রয়লার ফার্মের নালাজলে ও মাংসের নমুনায় Tetracycline ও Colistin প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া ব্যাপক। গবাদিপশুর রোগের ক্ষেত্রে অনিয়ন্ত্রিত চিকিৎসা অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স ছড়িয়ে দিচ্ছে।
পরিবেশগত উৎস : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ICDDR,B এবং BUET-এর গবেষণায় দেখা গেছে, হাসপাতাল বর্জ্য ও কারখানা বর্জ্যে অ্যান্টিবায়োটিকের অবশিষ্টাংশ রয়েছে। নদী ও নর্দমার পানিতে MDR জীবাণু শনাক্ত হচ্ছে, যা পরিবেশগত রিজার্ভায়ার হিসেবে কাজ করছে।
এএমআর বৃদ্ধির মূল কারণ : মানব চিকিৎসায় অপব্যবহার। ভাইরাল রোগেও অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ। আংশিক ডোজ গ্রহণ। প্রেসক্রিপশন ছাড়া ওষুধ বিক্রি।
প্রাণিসম্পদ খাতে নিয়ন্ত্রণহীন ব্যবহার : দ্রুত ওজন বৃদ্ধির আশায় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার। ভেটেরিনারি নির্দেশনার অভাব। অপর্যাপ্ত বায়োসিকিউরিটি।
পরিবেশদূষণ : হাসপাতালের বর্জ্যে অ্যান্টিবায়োটিক অবশিষ্টাংশ। ওষুধ কারখানার বর্জ্য পানিতে প্রবেশ। নর্দমায় প্রতিরোধী জীবাণুর বিস্তার।
স্বাস্থ্য, কৃষি ও অর্থনীতিতে এএমআরের প্রভাব :
অস্ত্রোপচারে সংক্রমণ ঝুঁকি বৃদ্ধি। সেপসিস, নিউমোনিয়া, ইউটিআই চিকিৎসা জটিল। নবজাতকের ঝুঁকি বৃদ্ধি। রোগ বিস্তার ও প্রাণিসম্পদ উৎপাদনক্ষমতা হ্রাস। খামারের ব্যয় বৃদ্ধি। খাদ্যনিরাপত্তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব। চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধি। কর্মক্ষমতা হ্রাস। রপ্তানিমুখী কৃষিপণ্যে ঝুঁকি সৃষ্টি।
প্রতিরোধ কৌশল ও নীতিনির্ধারণী পদক্ষেপ : ওয়ান হেলথ কাঠামোতে সমাধান। অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রয়ে কঠোর আইন। প্রাণিসম্পদ খাতে গ্রোথ প্রোমোটর নিষিদ্ধ। ×| Antibiotic Stewardship Program বাস্তবায়ন। ল্যাব ভিত্তিক রোগ নির্ণয়। জেলা পর্যায়ে বিএসএল-২ ল্যাব স্থাপন। কালচার ও AST সহজলভ্য করা। Molecular diagnostics (PCR, RT-PCR) ব্যবহার বাড়ানো। প্রাণিসম্পদ খাতে উন্নতি। ভ্যাকসিনেশন সম্প্রসারণ। বায়োসিকিউরিটি নিশ্চিত। খামারিদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা। হাসপাতাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করতে হবে। শিল্প বর্জ্য পরিশোধন বাধ্যতামূলক। নর্দমা ও নদীর পানি পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা। জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে স্কুল-কলেজ পর্যায়ে এএমআর শিক্ষা নিশ্চিতকরণ। গণমাধ্যমে প্রচার-প্রচারণার ব্যবস্থা গ্রহণ। ফার্মাসিস্ট ও চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ। গবেষণায় অগ্রাধিকার দেওয়া। নতুন ভ্যাকসিন উন্নয়ন। অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল পেপটাইড, ফেজ থেরাপি। প্রাণিসম্পদ খাতে বিকল্প প্রযুক্তি। স্থানীয় রেজিস্ট্যান্স ডেটা সংগ্রহ।
অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স একটি বৈশ্বিক সংকট হলেও এটি প্রতিরোধযোগ্য। সঠিক নীতি, কার্যকর সমন্বয়, জনসচেতনতা ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাধ্যমে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সকে সফলভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। বাংলাদেশে ইতোমধ্যে সার্ভিল্যান্স, নীতিমালা, প্রশিক্ষণ এবং গবেষণায় অগ্রগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ওয়ান হেলথভিত্তিক অভিন্ন কর্মপরিকল্পনা অনুসরণ করলে মানবস্বাস্থ্য, প্রাণিসম্পদ উৎপাদন ও পরিবেশ সব ক্ষেত্রেই ইতিবাচক ফল পাওয়া সম্ভব।
লেখক : শিক্ষার্থী, ইনস্টিটিউট অব লাইভস্টক সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি
