বাস্তবের চেয়েও জীবন্ত ওপেন ওয়ার্ল্ড গেমস

আপডেট : ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:০৫ এএম

কল্পনা আর প্রযুক্তির মেলবন্ধনে তৈরি শ্রেষ্ঠ ওপেন ওয়ার্ল্ড গেমগুলোর বিবর্তন, স্বাধীনতা এবং জীবন্ত জগৎ নিয়ে লিখেছেন অনিন্দ্য নাহার হাবীব

মানুষের চিরন্তন স্বভাব হলো অজানাকে জানার চেষ্টা করা আর নতুন কোনো ভুবনে হারিয়ে যাওয়া। গেমিং জগতের বিবর্তনে এই আকাক্সক্ষাকে সবচেয়ে বেশি পূর্ণতা দিয়েছে ওপেন ওয়ার্ল্ড ঘরানার গেমগুলো। একটা সময় ছিল যখন গেম মানেই ছিল একটি নির্দিষ্ট পথ ধরে এগিয়ে যাওয়া যেখানে খেলোয়াড়ের নিজের ইচ্ছামতো কিছু করার সুযোগ ছিল সামান্যই। কিন্তু প্রযুক্তি যত উন্নত হয়েছে গেম ডেভেলপাররা আমাদের সামনে এমন সব জগৎ উন্মোচিত করেছেন যেখানে কোনো দেয়াল নেই কোনো অদৃশ্য বাধা নেই। আপনি চাইলেই পাহাড়ের চূড়ায় উঠতে পারেন বনের গভীরে হারিয়ে যেতে পারেন কিংবা জনাকীর্ণ শহরের অলিগলিতে ঘুরে বেড়াতে পারেন। ওপেন ওয়ার্ল্ড গেম কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, এটি এখন একেকটি জীবন্ত ডিজিটাল বাস্তুসংস্থান, যেখানে প্রতিটি কাজের প্রতিক্রিয়া আছে এবং প্রতিটি কোনায় লুকিয়ে আছে নতুন কোনো গল্প।

মূল দর্শন ও স্বাধীনতা

ওপেন ওয়ার্ল্ড বা উন্মুক্ত বিশে^র গেমগুলোর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো লিনিয়ার বা রৈখিক গেমপ্লে থেকে বেরিয়ে এসে খেলোয়াড়কে পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া। প্রথাগত গেমে আপনাকে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য পূরণ করতে হতো এবং তারপর পরবর্তী ধাপে যেতে হতো। কিন্তু ওপেন ওয়ার্ল্ডে আপনি নিজেই নিজের গল্পের নায়ক। এখানে প্লেয়ার এজেন্সি বা খেলোয়াড়ের কর্র্তৃত্ব সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়। আপনি প্রধান কাহিনী নিয়ে এগিয়ে যাবেন নাকি কেবল প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করবেন তা সম্পূর্ণ আপনার ওপর নির্ভর করে। এই ঘরানার গেমগুলোতে এক্সপ্লোরেশন বা অন্বেষণকে পুরস্কৃত করা হয়। কোনো নির্জন গুহার ভেতরে হয়তো মূল্যবান কোনো তলোয়ার লুকিয়ে আছে কিংবা কোনো সাধারণ গ্রামবাসীর সঙ্গে কথা বললে বেরিয়ে আসতে পারে মহাকাব্যিক কোনো অভিযানের সূত্র। এই যে অনিশ্চয়তা আর অজানাকে জানার রোমাঞ্চ এটাই ওপেন ওয়ার্ল্ড গেমকে অন্য সব ঘরানা থেকে আলাদা করে তোলে।

ওপেন ওয়ার্ল্ডের বিবর্তন

ওপেন ওয়ার্ল্ডের ধারণাটি হঠাৎ করে আসেনি। আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে দ্য লিজেন্ড অব জেল্ডা যখন মুক্তি পায় তখন থেকেই খেলোয়াড়দের একটি মানচিত্রের মধ্যে অবাধে ঘুরে বেড়ানোর স্বাদ দেওয়া শুরু হয়। তবে আধুনিক ত্রিমাত্রিক ওপেন ওয়ার্ল্ড গেমের ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল গ্র্যান্ড থেফট অটো থ্রি। একটি জীবন্ত শহরকে সিমুলেশনের মাধ্যমে পর্দায় ফুটিয়ে তোলা যে সম্ভব তা এই গেমটিই প্রথম প্রমাণ করে। এরপর স্কাইরিম আমাদের দেখিয়েছে ফ্যান্টাসি জগতের বিশালতা আর উইচার থ্রি শিখিয়েছে কীভাবে প্রতিটি সাইড কোয়েস্টকেও মূল গল্পের মতো শক্তিশালী করা যায়। বর্তমান সময়ে এলডেন রিং বা ব্রেথ অব দ্য ওয়াইল্ডের মতো গেমগুলো ওপেন ওয়ার্ল্ড ডিজাইনকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে গেছে, যেখানে গেমে কোনো ম্যাপ মার্কার বা নির্দেশিকা ছাড়াই খেলোয়াড় নিজের বুদ্ধিতে পথ খুঁজে নিতে পারে। এই বিবর্তনটি কেবল গ্রাফিক্সের উন্নতি নয় বরং এটি গেম ডিজাইনের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন।

দ্য উইচার থ্রি ওয়াইল্ড হান্ট

ফ্যান্টাসি ওপেন ওয়ার্ল্ড গেমের কথা বললে সবার আগে যে নামটি মাথায় আসে তা হলো দ্য উইচার থ্রি ওয়াইল্ড হান্ট। সিডি প্রজেক্ট রেড যখন এই গেমটি তৈরি করে তখন তারা ওপেন ওয়ার্ল্ড আরপিজি বা রোল প্লেয়িং গেমের মানদণ্ড চিরতরে বদলে দেয়। এই গেমের জগৎটি বিশাল কিন্তু সেটি কেবল আয়তনে বড় নয় বরং গভীরতায় অতুলনীয়। সাধারণত অনেক গেমে মূল কাহিনীর বাইরে ছোটখাটো কাজ বা সাইড কোয়েস্টগুলো বিরক্তিকর মনে হয়, কিন্তু উইচার থ্রি-তে প্রতিটি ছোট কাজও একটি চমৎকার গল্পের অংশ। এখানে আপনি মনস্টার হান্টার বা দানব শিকারি গেরাল্ট অব রিভিয়ার ভূমিকায় অভিনয় করেন। যুদ্ধের ভয়াবহতা রাজনীতি এবং মানবিক জটিলতায় ঘেরা এই মহাদেশের প্রতিটি প্রান্ত জীবন্ত মনে হয়। পরিবেশের আবহ সংগীত এবং চরিত্রগুলোর মিথস্ক্রিয়া আপনাকে এমনভাবে আচ্ছন্ন করবে যে আপনার মনে হবে আপনি সত্যিই কোনো মধ্যযুগীয় ফ্যান্টাসি দুনিয়ায় বাস করছেন। ওপেন ওয়ার্ল্ড ডিজাইনের ক্ষেত্রে এই গেমটি এখনো একটি পাঠ্যপুস্তক হিসেবে গণ্য করা হয়।

বাস্তবতাও হার মেনে যায়

যদি প্রশ্ন করা হয় এখন পর্যন্ত তৈরি করা সবচেয়ে ইমার্সিভ বা নিমগ্ন করার মতো ওপেন ওয়ার্ল্ড গেম কোনটি, তবে অধিকাংশ গেমার এক বাক্যে রেড ডেড রিডেম্পশন টু-এর নাম নেবেন। রকস্টার গেমস এখানে কেবল একটি গেম তৈরি করেনি বরং আমেরিকার বুনো পশ্চিমের একটি জীবন্ত প্রতিকৃতি তৈরি করেছে। এই গেমের ডিটেইলিং বা সূক্ষ্ম কাজগুলো দেখে বিস্ময়ে থমকে যেতে হয়। বনের পশুপাখির আচরণ থেকে শুরু করে আবহাওয়ার পরিবর্তন সবকিছুই অবিশ্বাস্য রকমের বাস্তব। আপনি যদি কাদা মাটির ওপর দিয়ে হেঁটে যান, তবে আপনার কাপড়ে কাদা লাগবে এবং সেই কাদা পরিষ্কার করার জন্য আপনাকে স্নান করতে হবে। এনপিসি বা নন প্লেয়েবল ক্যারেক্টারগুলোর আচরণ এখানে এতই উন্নত যে, আপনার প্রতিটি ছোট কাজ তাদের ওপর প্রভাব ফেলে। আপনি যদি কোনো শহরে অপরাধ করেন তবে সেখানকার মানুষ আপনাকে মনে রাখবে। এই গেমটি আমাদের শেখায় যে একটি ওপেন ওয়ার্ল্ড কেবল বড় হলেই হয় না সেটি কতটা রিঅ্যাক্টিভ বা প্রতিক্রিয়াশীল তার ওপরই তার সার্থকতা নির্ভর করে। আর্থার মরগানের ট্র্যাজিক জীবন আর এই বিশাল প্রান্তরের বিষন্ন সৌন্দর্য গেমারদের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে।

আবিষ্কারের আনন্দ

নিনটেনডো যখন দ্য লিজেন্ড অব জেল্ডা ব্রেথ অব দ্য ওয়াইল্ড প্রকাশ করে তখন তারা ওপেন ওয়ার্ল্ড গেমের প্রচলিত সব নিয়ম ভেঙে ফেলে। এই গেমটি খেলোয়াড়কে কোনো বাধ্যবাধকতায় রাখে না। গেমের শুরুতেই আপনাকে পুরো মানচিত্রের দিকে ছেড়ে দেওয়া হয় এবং বলা হয়, আপনার লক্ষ্য হলো চূড়ান্ত বসকে হারানো কিন্তু আপনি সেখানে কীভাবে পৌঁছাবেন তা সম্পূর্ণ আপনার ব্যাপার। এই গেমে এক্সপ্লোরেশন-ফাস্ট ডিজাইন ব্যবহার করা হয়েছে। আপনি যদি দূরে কোনো পাহাড় দেখেন তবে নিশ্চিত থাকুন যে আপনি সেই পাহাড়ে উঠতে পারবেন। এখানকার কেমিস্ট্রি ইঞ্জিন বা রাসায়নিক ইঞ্জিনটি এত চমৎকার যে আপনি প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদান ব্যবহার করে সমস্যার সমাধান করতে পারেন। যেমন বৃষ্টির সময় পিচ্ছিল পাহাড়ে ওঠা কঠিন কিংবা বজ্রপাতের সময় ধাতব অস্ত্র ব্যবহার করলে আপনার ওপর বিদ্যুৎ পড়তে পারে। এই গেমটি খেলোয়াড়ের কৌতূহলকে পুঁজি করে এগিয়ে যায়, যা আধুনিক ওপেন ওয়ার্ল্ড ডিজাইনে এক বিশাল বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে।

রহস্য-চ্যালেঞ্জের অনন্য মিশেল

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এলডেন রিং গেমিং দুনিয়ায় একটি প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ফ্রম সফটওয়্যার তাদের চিরচেনা সোলস ফর্মুলাকে ওপেন ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে যুক্ত করে এক অদ্ভুত সুন্দর এবং ভয়ংকর জগৎ তৈরি করেছে। এই গেমের বিশেষত্ব হলো এর মিনিমাল হ্যান্ড হোল্ডিং অর্থাৎ গেমটি আপনাকে হাত ধরে কোথাও নিয়ে যাবে না। মানচিত্রে কোনো প্রশ্নবোধক চিহ্ন নেই কোনো জিপিএস নেই। আপনাকে কেবল ল্যান্ডমার্ক দেখে এবং নিজের পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা ব্যবহার করে এগিয়ে যেতে হবে। এই রহস্যময়তা এলডেন রিংকে অন্য সব গেম থেকে আলাদা করেছে। এখানকার প্রতিটি ধ্বংসাবশেষ বা প্রতিটি গাছের পেছনে কোনো না কোনো রহস্য বা শক্তিশালী শত্রু লুকিয়ে আছে। ল্যান্ডস বিটুইন নামের এই জগৎটি এতই বৈচিত্র্যময় যে প্রতিটি নতুন এলাকা আবিষ্কার করার সময় এক ধরনের অপার্থিব আনন্দ অনুভূত হয়। ওপেন ওয়ার্ল্ড যে কেবল সুন্দর হবে তা নয়, সেটি যে কতটা চ্যালেঞ্জিং এবং অন্ধকারাচ্ছন্ন হতে পারে তার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ এলডেন রিং।

আধুনিক শহরের উন্মাদনা

আরবান স্যান্ডবক্স বা আধুনিক শহরের ওপেন ওয়ার্ল্ড গেমের কথা বললে গ্র্যান্ড থেফট অটো ফাইভ বা জিটিএ ফাইভ হলো অপ্রতিদ্বন্দ্বী রাজা। লস স্যান্তোস শহরটি একটি পূর্ণাঙ্গ ডাইনামিক সিটি সিমুলেশন। এখানে আপনি যখন গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছেন তখন আপনার চারপাশে হাজার হাজার মানুষ তাদের দৈনন্দিন কাজ করে যাচ্ছে। এই গেমটি আধুনিক পপ কালচারের একটি বড় অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনটি ভিন্ন চরিত্রের মাধ্যমে গল্প বলার ধরন এবং শহরের প্রতিটি অলিগলিতে ছড়িয়ে থাকা নানা কর্মকাণ্ড গেমটিকে কয়েক দশক ধরে জনপ্রিয় করে রেখেছে। হাইস্ট বা বড় ধরনের ডাকাতি করার পরিকল্পনা থেকে শুরু করে গলফ খেলা কিংবা স্রেফ সমুদ্রের পাড়ে সূর্যাস্ত দেখা সব মিলিয়ে জিটিএ ফাইভ আমাদের এক বিকল্প জীবনের স্বাদ দেয়। এর অনলাইন মোড গেমটিকে একটি ভার্চুয়াল সোশ্যাল নেটওয়ার্কে পরিণত করেছে যেখানে মানুষ বছরের পর বছর কাটিয়ে দিচ্ছে।

ভবিষ্যতের শহর

সাইবারপাঙ্ক ২০৭৭ যখন প্রথম বাজারে আসে তখন অনেক যান্ত্রিক ত্রুটি থাকলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি অন্যতম সেরা ওপেন ওয়ার্ল্ড অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়েছে। নাইট সিটি নামের এই শহরটি দেখতে যেমন ঘন এবং জাঁকজমকপূর্ণ এর ভেতরকার গল্পগুলোও তেমনি অন্ধকার এবং গভীর। নিয়ন আলো আর ভবিষ্যতের প্রযুক্তির আড়ালে মানবিক আবেগের এক দারুণ সমন্বয় এখানে দেখা যায়। অন্যদিকে দ্য এল্ডার স্ক্রলস ফাইভ স্কাইরিম হলো এমন এক গেম, যা প্রায় পনেরো বছর ধরে গেমারদের মাতিয়ে রেখেছে। ড্রাগন আর জাদুর এই জগৎটি মডিং কমিউনিটির কল্যাণে আজও নতুনের মতো সতেজ। স্কাইরিম আমাদের দেখিয়েছে যে একটি গেমের জগৎ যদি যথেষ্ট আকর্ষণীয় হয় তবে মানুষ বছরের পর বছর একই জায়গায় ফিরে যেতে দ্বিধা করে না। এই দুটি গেম দুই ভিন্ন সময়ের প্রতিনিধিত্ব করলেও ওপেন ওয়ার্ল্ড গেমের ইতিহাসে এদের অবদান অনস্বীকার্য।

ওপেন ওয়ার্ল্ডের আলোচনায় মাইনক্রাফ্ট না থাকলে তা অপূর্ণ থেকে যাবে। এটি হলো পিওর স্যান্ডবক্স ওপেন ওয়ার্ল্ড যেখানে পুরো পৃথিবীটাই আপনার ক্যানভাস। প্রসিডিউরাল জেনারেশন বা স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি হওয়া এই অসীম বিশ্বে আপনি যা খুশি তাই করতে পারেন। এখানে কোনো নির্দিষ্ট গল্প নেই, নেই কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম। আপনি চাইলে মাটির নিচে বিশাল খনি খুঁড়তে পারেন কিংবা আকাশে বিশাল প্রাসাদ বানাতে পারেন। মাইনক্রাফ্ট প্রমাণ করেছে যে, গ্রাফিক্সই সব নয়, গেমের মেকানিক্স এবং খেলোয়াড়ের সৃজনশীলতা ব্যবহারের সুযোগ থাকলে একটি গেম কালজয়ী হতে পারে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত