চট্টগ্রামের নাসিরাবাদ শিল্প এলাকার ৫ দশমিক ২০ একর বা ৩১৪ কাঠার বেশি আয়তনের চারটি সরকারি শিল্প-প্লট হাতবদলে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে। সরকারের অনুমতি ছাড়াই জালিয়াতির মাধ্যমে বাংলাদেশ অক্সিজেন কোম্পানি (বিওসি) প্লটগুলো মাত্র ১২ কোটি ৫১ লাখ টাকায় বিকে টেক্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. হারুন অর রশিদের কাছে বিক্রি করে দিয়েছে। এসব প্লটের বাজারমূল্য ১৫০ থেকে ৩০০ কোটি টাকা হলেও কম দামে বিক্রি দেখিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার করা হয়েছে। জালিয়াতির মাধ্যমে সরকারি প্লট বিক্রির অপরাধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) দুজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে।
নথিপত্রের তথ্যানুযায়ী, শিল্পের জন্য গ্যাস উৎপাদনের উদ্দেশ্যে পাকিস্তান আমলে চট্টগ্রামের নাসিরাবাদ শিল্পাঞ্চলের ২৩৩, ২৩৩-এ, ২৩৪ ও ২৩৪-এ (বিএস দাগ-১৬৭২) নম্বর দাগের ৫ দশমিক ২০ একর জমি ৯৯ বছরের জন্য তৎকালীন পাকিস্তান অক্সিজেন লিমিটেডের নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়। স্বাধীনতার পর প্লটগুলো বাংলাদেশ অক্সিজেন লিমিটেডের (এখন লিন্ডে বাংলাদেশ) নামে হস্তান্তর করা হয়। প্লটগুলো মূলত অক্সিজেন, নাইট্রোজেন ও এসিটাইলিন উৎপাদনের জন্য দেওয়া হয়েছিল, যা শিল্পের জন্য দরকারি। লিজের চুক্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা ছিলসরকারের পূর্বানুমতি ছাড়া প্লট বিক্রি, হস্তান্তর বা বন্ধক রাখা যাবে না এবং নির্ধারিত উদ্দেশ্য ছাড়া অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করা যাবে না। কিন্তু এ ক্ষেত্রে লিজের কোনো শর্তই মানা হয়নি।
তথ্য বলছে, ২০০৫ সালের ২০ অক্টোবরে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ অক্সিজেন লিমিটেডের (বিওসি) ১৭৭তম বোর্ডসভার সংশোধিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ওই সম্পত্তি বিক্রি ও রেজিস্ট্রি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পরে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় চারটি শর্তে বিকে টেক্স লিমিটেডের কাছে এসব সম্পত্তি হস্তান্তরের অনুমতি দেয়। সেসবের ২ নম্বর শর্তানুযায়ী, রেজিস্টার্ড দলিলমূলে হস্তান্তর সম্পাদনের কথা বলা হলেও প্লটগুলো ১২ কোটি ৫১ লাখ টাকায় চট্টগ্রাম সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সাফকাবলা দলিল (দলিল নম্বর-৪৬০৬) বিক্রি করে দেওয়া হয়। দলিল সম্পাদনের সময় কোম্পানির পক্ষে স্বাক্ষর করেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওয়ালি উর রহমান ভূঁইয়া এবং দলিলগ্রহীতা হিসেবে স্বাক্ষর করেন বিকে টেক্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. হারুন অর রশিদ।
জানা গেছে, পাকিস্তান অক্সিজেন লিমিটেড নামে প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ অক্সিজেন লিমিটেড কোম্পানিতে (লিন্ডে বাংলাদেশ লিমিটেড) রূপান্তরিত হয়। বিওসি লিজের শর্ত অমান্য করে সরকারি চারটি শিল্প-প্লট বিক্রি ও বন্ধক রেখেছে বলে ২০২০ সালে দুদকে অভিযোগ জমা পড়ে। ওই অভিযোগে বলা হয়, চট্টগ্রামের কয়েকটি সরকারি লিজের জমি বিক্রি করে বিদেশে অর্থপাচার করা হয়েছে। কমিশন অভিযোগের অনুসন্ধান করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য একজন সহকারী পরিচালককে অনুসন্ধান কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেয়। অনুসন্ধান শেষে মামলার সুপারিশসহ কমিশনে প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারি লিজের বা অধিগ্রহণ করা জমি লিজদাতার অনুমতি ছাড়াই পারস্পারিক যোগসাজশে প্রতারণার মাধ্যমে সাফকাবলা দলিলমূলে বিক্রি করা এবং ব্যাংকে বন্ধক রেখে ফৌজদারি অপরাধ করায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইন বিভাগের মতামতের ভিত্তিতে মামলার সুপারিশ করা হলো। কমিশন দুদকের আইন অনুবিভাগের মতামত নিয়ে মামলার অনুমোদন দেয়। এরপর ৮ মার্চ দুদকের চট্টগ্রাম কার্যালয়ে মামলাটি করা হয়েছে।
দুদকের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হারুন অর রশিদ ২০২৩ সালের ২৬ অক্টোবর চট্টগ্রাম সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের হস্তান্তর-দলিলসংক্রান্ত সংশোধনী ঘোষণাপত্র দলিল সম্পাদন করেন। এ দলিলে বিওসির ওয়ালিউর রহমান ভূঁইয়া বা অন্য কোনো কর্মকর্তার স্বাক্ষর নেই। ২০২৩ সালের হস্তান্তরসংক্রান্ত সংশোধনী ঘোষণাপত্র দলিল সম্পাদনের মাধ্যমে প্রমাণিত হয় আগের সাফকাবলা দলিল সঠিক ছিল না। জালিয়াতির মাধ্যমে ওই দলিল সম্পাদন করা হয়েছে এবং হস্তান্তরসংক্রান্ত ঘোষণাপত্র দলিল সম্পাদনের মাধ্যমে অপরাধের দায় থেকে বাঁচার চেষ্টা করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্লটগ্রহীতা হারুন অর রশিদের মালিকানাধীন বি কে ওভারসিজ ও বি কে রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড অ্যাপার্টমেন্ট লিমিটেডের নামে ব্যাংক এশিয়া লিমিটেডের কাছে একটি ঋণ ক্লাসিফায়েড ছিল। হারুন অর রশিদ ২০০৯ সালে সরকারি প্লটগুলো ব্যাংকে বন্ধক রাখার বিষয়ে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন। তখন মন্ত্রণালয় জানায়, প্লটগুলো বন্ধক রাখার অনুমতি দেওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু হারুন অর রশিদ সরকারি আদেশ অমান্য করে ২০১০ সালে প্লটগুলো ব্যাংক এশিয়ার খাতুনগঞ্জ শাখায় বন্ধক রাখেন।
স্থানীয় সূত্র বলছে, চট্টগ্রামের নাসিরাবাদ শিল্পাঞ্চলে বর্তমানে জমির দাম অনেক বেড়েছে। এখন ওই প্লটগুলোর বাজারমূল্য ১৫০ থেকে ৩০০ কোটি টাকা বলে ধারণা। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, নাসিরাবাদ শিল্পাঞ্চলে প্লটের দামে ভিন্নতা রয়েছে। যেসব প্লট বাণিজ্যিক প্লটে রূপান্তরিত হয়েছে, সেগুলোর দাম অনেক। আর যেগুলো শিল্প-প্লট, সেগুলো রাস্তার পাশে হলে দাম বেশি, ভেতরে হলে কম। তবে সেখানে ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা কাঠার নিচে জমি নেই।
সিডিএর হিসাব অনুযায়ী, ৩১৪ কাঠা জমির দাম ১৬০ থেকে ১৯০ কোটি টাকা। যদি প্লট রাস্তার পাশে হয় তাহলে তার দাম ৩০০ কোটি টাকার বেশি। এ মূল্যবান জমি নামমাত্র মূল্যে ১২ কোটি ৫১ লাখ টাকায় বিক্রি করা হয়েছে। সরকারের লিজ নেওয়া শিল্প-প্লট বিক্রি এবং ব্যাংকে বন্ধক রাখার ক্ষেত্রে সরকারের অনুমতি নেওয়া হয়নি, যা লিজচুক্তির স্পষ্ট লঙ্ঘন। অভিযুক্তরা লিজচুক্তির শর্ত অমান্য করে সরকারি সম্পত্তি বিক্রি ও ব্যাংকে বন্ধক রেখে আর্থিক সুবিধা নিয়েছে। মামলার তদন্তে এ ঘটনার সঙ্গে অন্য কারও সম্পৃক্ত তা পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
