সহসায় ইরান যুদ্ধ না থামলে এর উত্তাপে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা অব্যাহত থাকবে, যা বিশ্ব অর্থনীতিকে মন্দার দিকে নিয়ে যাবে বলে পূর্বাভাসের পাশাপাশি সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)।
জানা গেছে, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আক্রমণের শুরুতে খ- যুদ্ধ মনে করা হলেও টানা ৪০ দিন পর দুই সপ্তাহের যুদ্ধ বিরতি চলছে। এর মধ্যে পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত প্রথম দ্বিপাক্ষিক বৈঠক সমাধান ছাড়া শেষ হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, উভয় পক্ষের মধ্যে সমঝোতা না হলে আবার যুদ্ধ শুরু হতে পারে। ফলে বিশ^জুড়ে জ্বালানি তেলের বাজার ঊর্ধ্বগতি অপরিবর্তিত থাকবে। সব শেষ ইরানের হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ আরোপ করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। এতে পণ্য পরিবহনের পাশাপাশি জ্বালানি তেলের দাম আরও বাড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সদ্য প্রকাশিত প্রতিবেদনে জ্বালানি সংকট ও শঙ্কার বিষয় উঠে এসেছে। সংস্থাটি বলছে, যুদ্ধের কারণে ‘বিশ^ব্যপী নজিরবিহীন মাত্রার জ্বালানি সংকট’ তৈরির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, যা অর্থনীতিকে বিশ্বমন্দার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এর প্রভাব সব থেকে বেশি জি-৭ ভুক্ত দেশগুলোতে পড়বে।
গত ১৪ এপ্রিল প্রকাশিত আইএমএফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে বিশ্ব অর্থনীতির ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ক্রমেই বাড়ছে। যুদ্ধের প্রভাব বিবেচনায় ২০২৬ সালের জন্য বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির হার কমিয়ে দিয়েছে সংস্থাটি।
আইএমএফের অর্ধবার্ষিক হালনাগাদ তথ্যানুযায়ী, জ্বালানির আকাশচুম্বী দাম যদি ২০২৬ সালের মাঝামাঝিও নিয়ন্ত্রণে আসে, তবুও জি-৭ ভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে এ বছর যুক্তরাজ্যেই প্রবৃদ্ধির হার সবচেয়ে বেশি কমবে এবং মূল্যস্ফীতি সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকবে। তবে পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে অর্থাৎ যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিলে এবং জ্বালানির দাম অপরিবর্তিত থাকলে বিশ্ব অর্থনীতি ১৯৮০ সালের পর পঞ্চম বারের মতো ভয়াবহ মন্দার মুখে পড়বে।
প্রতিবেদনে সংস্থাটি জ্বালানি পরিস্থিতি বিবেচনায় তিনটি পূর্বাভাস দিয়েছে। এর মধ্যে স্বল্প সময়ের মধ্যে যুদ্ধ থেমে গেলে ২০২৬ সালের দ্বিতীয়ার্ধে তেলের দাম স্বাভাবিক হয়ে আসতে পারে। এতে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম গড়ে ৮২ ডলারে নেমে আসবে। দ্বিতীয়ত যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে তেলের দাম চলতি বছর ১০০ ডলারের আশপাশে থাকবে এবং ২০২৭ সালে তা ৭৫ ডলারে নামতে পারে। সে ক্ষেত্রে ২০২৫ সালের ৩ দশমিক ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির তুলনায় এ বছর বিশ্ব প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়াবে ২ দশমিক ৫ শতাংশে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসে বলা হয়েছে দেশটির প্রবৃদ্ধি শূন্য দশমিক ১ শতাংশ কমে ২ দশমিক ৩ শতাংশ হতে পারে। যুক্তরাজ্যের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ কমে শূন্য দশমিক ৮ শতাংশে হতে পারে। পাশাপাশি দেশটির মূল্যস্ফীতি লক্ষ্যমাত্রা দ্বিগুণ অর্থাৎ ৪ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
প্রতিবেদনের বিষয়ে আইএমএফের প্রধান অর্থনীতিবিদ পিয়ের-অলিভিয়ের গৌরিনকাস সাংবাদিকদের বলেছেন, বর্তমানে জ্বালানি সরবরাহে যে ধরনের বিঘœ ঘটছে এবং যুদ্ধ শেষ হওয়ার কোনো সুনির্দিষ্ট পথ দেখা যাচ্ছে না, তাতে এই ‘মধ্যম পথ’ বা প্রতিকূল পরিস্থিতিই এখন বেশি বাস্তবসম্মত মনে হচ্ছে। এই সংকট বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
আইএমএফ জানিয়েছে, বিশ্বজুড়ে প্রবৃদ্ধি কমলেও জ্বালানি আমদানিকারক ও উন্নয়নশীল দেশগুলোই সবচেয়ে বড় ধাক্কা খাবে।
এদিকে আইএমএফের এই সতর্কবার্তার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কড়া সমালোচনা করেছেন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক মহল। ব্রিটিশ চ্যান্সেলর র্যাচেল রিভস বলেছেন, ‘ইরান যুদ্ধ আমাদের যুদ্ধ নয়, কিন্তু এর জন্য যুক্তরাজ্যকে চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে। আমি এই ব্যয় চাইনি, কিন্তু এখন আমাদের এর মোকাবিলা করতে হবে। আমি অত্যন্ত হতাশ ও ক্রুদ্ধ যে যুক্তরাষ্ট্র কোনো এক্সিট প্ল্যান ছাড়াই এই যুদ্ধে জড়িয়েছে।’
