দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য বিভাগ নিয়ে আজকাল সম্ভবত পত্রিকা-পাঠকদের তেমন আগ্রহ নেই। কয়েক বছর আগে বাংলাদেশের একটি দৈনিক পেশাদারি অনুসন্ধান চালিয়ে জেনেছিল, এর পাঠক এতই কম যে এর আদৌ দরকার আছে কি না তা নিয়েই ভাবা যেতে পারে। পত্রিকা বিক্রির দিক থেকে এর গুরুত্ব নেই বললেই চলে। জরিপ না চালিয়েও পত্রিকার মালিকরা তা জানেন বলে দৈনিকগুলোর সাহিত্য বিভাগকে আর সাহিত্যের স্বার্থে গুরুত্ব দেওয়া হয় না! এখনকার দিনে এই বিভাগকে পত্রিকার সামগ্রিক প্রভাবের অনুকূলে ব্যবহার করা হয় মাত্র। এই বিভাগ দেখাশোনার জন্য এখন আর সাহিত্যিক ব্যক্তিত্ব খোঁজার দরকার পড়ে না। একজন তরুণ লেখককে সাহিত্য বিভাগের সম্পাদকের দায়িত্ব দিয়ে রাখলেই চলে। প্রবীণ ও প্রতিষ্ঠিত (অবশ্য দু-একজনের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ছাড়া সামাজিক অর্থে সাহিত্যিক প্রতিষ্ঠা বলতে কিছু থেকে থাকলে) লেখকদের কাছে লেখা আহ্বান করা হয় তাদের ব্যবহার করে পত্রিকার পক্ষে সামাজিক ভাবমূর্তি রক্ষার স্বার্থে। অর্থাৎ দৈনিকের সাহিত্য সাময়িকীকে একটি সাংস্কৃতিক সংযোজন মাত্র হিসেবে দেখা হয়ে থাকে। বিভিন্ন উপলক্ষে কিছু দিবস পালন করার চল হয়েছে দেশে। এর জন্য উপলক্ষের ছাপ্পা মারা কিছু লেখকের লেখা ছাপতে হয় পত্রিকাগুলোকে! এগুলোও সামাজিক প্রভাবের স্বার্থেই দরকার পড়ে! ফলে দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য বিভাগের সম্পাদনার জন্য সাধারণত এমন কাউকে খোঁজা হয় যিনি এক দিকে বয়সে তরুণ, অন্যদিকে যার সঙ্গে রয়েছে দেশের পরিচিত লেখকদের ভালো জানাশোনা ও ভাব। কারণ, পত্রিকার পক্ষে এই বিভাগের সম্পাদককে প্রতিপালনের মূল উদ্দেশ্য দ্রুততম সময়ের মধ্যে যেন সেই তরুণটি উপলক্ষের লেখা তাদের কাছ থেকে সংগ্রহ করে ফেলতে পারেন; আর যেন তিনি পারেন পাতা সাজানোর রুটিন কাজটুকু। দু-একটা বহুল প্রচারিত পত্রিকা ছাড়া যাদের লেখা প্রকাশিত হয় তারা অনেক সময় ছাপা হয়ে যাওয়ার পরে নিজেদের লেখার খোঁজও নেন না। কিন্তু ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, এই সাহিত্য পাতা আদতে কেবল অবকাশের স্থান নয়; একসময় সাহিত্য পাতা ছিল এক গভীর বৌদ্ধিক পরিসর নির্মাণের স্থান। এর সূত্রপাত ঘটেছিল ইউরোপে। সেখানকার জনপরিসরের সামগ্রিক উন্মোষের সঙ্গে তা নিবিড়ভাবে জড়িত।
গভীরভাবে খোঁজ করলে আমরা হয়তো দেখতে পাব, ইংরেজি দৈনিক পত্রিকায় সাহিত্য সাময়িকী প্রকাশের ঘটনাটি আকস্মিক কিছু নয়। এর শিকড় প্রোথিত রয়েছে আঠারো শতকের ইংরেজি সাময়িকী-সংস্কৃতিতে, বিশেষত The Spectator-এর মতো পত্রিকায়। সেখানে যে দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠেছিল তাতে সাহিত্য হিসেবে কেবল কবিতা বা গল্পকে বিবেচনা করা হয়নি; বরং প্রবন্ধ, নৈতিক চিন্তা কিংবা সামাজিক পর্যবেক্ষণও অন্তর্ভুক্ত হচ্ছিল। সব মিলিয়ে অনুভব করা যায়, একটি নতুন ধরনের পাঠক নির্মাণের প্রয়াস এর পটভূমিতে কাজ করে এসেছে! এই পাঠক কেবল টেক্সটের ভোক্তা নন, বিচারকও; কেবল পাঠক নন, নাগরিকও।
তবে সাহিত্য সাময়িকীর বিকাশের ইতিহাস যদি কেবল ইংরেজি ভাষায় সীমাবদ্ধ রেখে খোঁজ হয় তাহলে বড় ভুল হবে। সমসাময়িক ফরাসি ও জার্মান ভাষার প্রয়াসগুলোর খোঁজ করে দেখলাম ইংরেজি সাময়িকীর আগেই ইউরোপের অন্য ভাষাগুলোও—বিশেষত ফরাসি ও জার্মান ভাষায়—আগে উল্লিখিত বৌদ্ধিক ক্ষেত্র নির্মাণে একধরনের পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করেছিল। Journal des Savants-এর মতো ফরাসি জার্নালে ঘটেছিল বই-আলোচনা, জ্ঞানতাত্ত্বিক বিতর্ক, এবং একধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সমালোচনারও সূচনা। একইভাবে জার্মান ভাষার সাহিত্য জার্নাল Allgemeine Literatur-Zeitung সাহিত্যকে একটি সমালোচনামূলক অনুশীলনে রূপ দেয়—যেখানে পাঠ মানে বিশ্লেষণ, এবং রুচি মানে যুক্তির চর্চা।
বোঝা গেল, এই ধারাবাহিকতায় ইংরেজি দৈনিক পত্রিকায় সাহিত্য পাতার স্থিতিশীল রূপ আসে অনেক পরে, বিশেষত উনিশ ও বিশ শতকে, যখন The Times Literary Supplement-এর মতো সাপ্লিমেন্ট সাহিত্যকে একটি স্বতন্ত্র বৌদ্ধিক প্রতিষ্ঠানে রূপ দেয়। যেখানে সাহিত্য আর নিছক প্রকাশ নয়; মূল্যায়ন, শ্রেণিবিন্যাস, এমনকি উচ্চতর মর্যাদাপূর্ণ সাহিত্যমণ্ডল নির্মাণের একটি প্রক্রিয়া। সাপ্লিমেন্টটি এখনো প্রকাশিত হয়ে চলেছে এবং এর কয়েক বছরের নিয়মিত গ্রাহক হিসাবে অনুভব করি, এখনো সমসাময়িক বৈশ্বিক সাহিত্য সম্পর্কিত ধারণা গঠনে সুগভীর ভূমিকা রেখে চলেছে।
এতক্ষণ ইতিহাসের যে পর্যালোচনা আমরা করলাম তা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্যের দিকে নিয়ে যায়, তা হলো সাহিত্য পাতা শুধু সাহিত্য ছাপার জায়গা ছিল না কখনোই; এই প্রয়াস ছিল সাহিত্যিকতার একটি জনপরিসর—যেখানে পাঠক, লেখক এবং সমালোচক মিলিত হয়ে একটি বৌদ্ধিক সমাজ নির্মাণ করে। আমি ব্যক্তিগতভাবে সত্তর দশক থেকে আশির দশক পর্যন্ত দৈনিকের সাহিত্য সাময়িকীর পাঠক হিসেবে বলতে পারি, বাংলাদেশের সামগ্রিক একটি প্রায় অখণ্ড সাহিত্যিক ধারণা নির্মাণ করেছিল সম্মিলিতভাবে দৈনিকের সাহিত্য বিভাগগুলো। তখনকার সাহিত্য বিভাগীয় সম্পাদকের সাহিত্যিক ব্যক্তিত্বের দৃষ্টিভঙ্গিতেও জাতীয় দায়বোধ কিছুটা অনুভব করা যেত। এমনকি লিটল ম্যাগাজিনের সৃজনশীলতাকেও আত্মীকরণ করে ছিল এই সাময়িকীর এগিয়ে চলা!
আমাদের তরুণ বয়সে বাংলাদেশের দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য পাতাগুলো দীর্ঘকাল ধরে যেন ছিল প্রধানত ‘প্রকাশমুখী’ একটি প্ল্যাটফর্ম। নতুন লেখকের আবির্ভাব, তাদের কবিতা-গল্পের প্রকাশ, এবং ব্যক্তিগত অনুভবের বিনিময়ের ক্ষেত্রও ছিল সেটা। এই সাময়িকীর পাতায় প্রকাশের মধ্য দিয়ে একজন লেখকের পরিচয় গড়ে উঠলে প্রকাশকরা লেখককে শনাক্ত করতে পারতেন। এখনো যে এই ভূমিকা নেই তা নয়; তবে সামগ্রিকভাবে বিশেষ দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া তরুণ লেখকের জাতীয় ভিত্তিক পরিচয় এখনকার পত্রিকার মাধ্যমে অর্জন করা কঠিন! সাহিত্য বিভাগের এই ভূমিকাটিও নিঃসন্দেহে খুবই গুরুত্বপূর্ণ; এই প্রবণতা সাহিত্যকে গণমানুষের বড় পরিসর থেকে উচ্চতর সাহিত্যিক মূল্যবোধের দিকে আগ্রহী করে তোলে। তবে দৈনিকের সাহিত্য সাময়িকীর একটা বড় সমস্যা হলো, এই পাতায় বৌদ্ধিক ও তর্কমূলক সংলাপ যতটা তৈরি হয় তা নিয়ে সন্তুষ্ট হওয়া যায় না, অনেকটা যেন সৃজনশীলতার সাদামাটা প্রদর্শনী মাত্র হয়েই থেকে যায়।
সমস্যাটি আরও স্পষ্ট হয় সমালোচনা বা ক্রিটিকধর্মী রচনার ক্ষেত্রে। ইউরোপীয় সাময়িকীগুলো যেখানে সমালোচনাকে কেন্দ্রীয় স্থানে বসিয়েছে সেখানে আমাদের সাময়িকীগুলো বই-পরিচিতিকে গুরুত্ব দেয় সবচেয়ে কম বা গুরুত্ব দেয়ই না। আমেরিকায় এসে দেখেছি নিউ ইয়র্ক টাইমস বা ওয়ালস্ট্রিট জার্নালের কিংবা ওয়াশিংটন পোস্টের সাময়িকীতে বই-পরিচিতি বা বই-সমালোচনা, লেখকদের সাক্ষাৎকার কিংবা সাহিত্যিক প্রবন্ধপ্রকাশকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। আমাদের সাহিত্য পাতায় সমালোচনা যেটুকুই-বা আছে তা সাধারণত সৌজন্যমূলক, সংযত; এমনকি বিশ্লেষণাত্মক সমালোচনা সেখানে প্রায় অনুপস্থিত। ফলে সাহিত্য সেখানে পর্যালোচনার বিষয় না হয়ে, স্বীকৃতির বস্তু হয়ে ওঠে। সংকুচিত হয়ে পড়ে পাঠকের ভূমিকা। তিনি আর বিচারক হয়ে ওঠার সুযোগ পান না, তিনি বরং কেবলই হয়ে থাকেন গ্রহণকারী। এখানে একটি গভীরতর বিচ্ছিন্নতাও লক্ষণীয়: সাহিত্য এবং সমাজের মধ্যে দূরত্ব। ইউরোপীয় ঐতিহ্যে সাহিত্য ছিল নাগরিক বোধের চর্চার অংশ—রাষ্ট্র, নৈতিকতা, সংস্কৃতি—সবকিছুর সঙ্গে এর সংযোগ ছিল। কিন্তু আমাদের সাহিত্য পাতায় এই সংযোগ অধিকাংশ ক্ষেত্রে দুর্বল। ফলে এটি বৃহত্তর জনপরিসরের পরিবর্তে একটি ক্ষুদ্র সাহিত্যিক গোষ্ঠীর অভ্যন্তরীণতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। আশির দশক পর্যন্ত তবু সাহিত্য সাময়িকী বাংলাদেশের সাহিত্যের সামগ্রিকতাকে ধারণ করতে চাইত। এখন পত্রিকাগুলোর লেখকেরা যেন বিচ্ছিন্ন থেকে খণ্ড খণ্ড ভুবন সৃষ্টি করে চলেছে।
এমন পটভূমিতে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, আমাদের সাহিত্য পাতা কি কেবল লেখকের জন্য, নাকি পাঠকের জন্যও? আরও গভীরে গিয়ে জিজ্ঞাসা করা যায়, এটি কি কেবল অনুভূতি প্রকাশের জায়গা, নাকি চিন্তারও? সম্ভবত এখানেই ভবিষ্যতের সম্ভাবনা নিহিত। যদি সাহিত্য পাতাকে আমরা কেবল প্রকাশের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে না দেখে, বরং একটি বৌদ্ধিক ক্ষেত্র হিসেবে পুনর্বিবেচনা করতে পারি তাহলে সেখানে সমালোচনা, তর্ক, এবং সামাজিক প্রশ্ন একত্রে উপস্থিত হতে পারে। তাহলে এটি আবার সেই ঐতিহাসিক ভূমিকায় ফিরে পেতে পারে, যা একসময় ইউরোপীয় সাময়িকীগুলো পালন করতে পেরেছিল এবং এখনো করে চলেছে কিংবা এখনকার আমেরিকার দৈনিকের সাময়িকীগুলো করে চলেছে।
এতক্ষণের আলোচনার পটভূমিতে এটুকুই বলতে পারি, আমাদের প্রয়োজন দৈনিকের এমন সাহিত্য পাতা বা বিভাগ, যেখানে কবিতা ও প্রবন্ধ, অনুভব ও বিশ্লেষণ, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও সামাজিক বোধ—মিলিয়ে একটি জটিল কিন্তু প্রাণবন্ত জনপরিসর গড়ে ওঠে। সাহিত্য পাতা তখন আর পত্রিকার একটি উপেক্ষাযোগ্য অংশ থাকবে না, হয়ে উঠতে পারবে পত্রিকার আত্মা।
