নদীর নাব্যতা হ্রাস ও বালু উত্তোলনের কারণে লক্ষ্মীপুর-ভোলা নৌরুটে ফেরি চলাচলে মারাত্মক বিঘœ ঘটছে। এর মধ্যে একদিকে রয়েছে ফেরি সংকট, অন্যদিকে যাতায়াত করতে হয় জোয়ার-ভাটার ওপর নির্ভর করে। এতে যাতায়াতে বিলম্ব হওয়ার কারণে যাত্রী ও গাড়িচালকদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
উপকুলীয় জেলা লক্ষ্মীপুর শহর থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে মেঘনা নদীর তীরে মজু চৌধুরী ফেরি ঘাট। ২০১৪ সালে ১৭ মার্চ নদীবন্দর ঘোষণা করা হয়। ওই সময় তিনটি ফেরি দিয়ে লক্ষ্মীপুর-ভোলা ফেরি সার্ভিস চালু হয়। বর্তমানে চারটি ফেরি রয়েছে। এগুলো হচ্ছে বেগম রোকেয়া, বেগম সুফিয়া কামাল, কাবেরী ও কুসুমকলি। দক্ষিণবঙ্গের ভোলা, বরিশাল, ঝালকাঠি, পটুয়াখালী, পিরোজপুর, বৃহত্তর খুলনা, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, সিলেট ও ব্রাক্ষণবাড়িয়ার ১৫টি জেলার যানবাহন এই ফেরি ঘাট দিয়ে যাতায়াত করে।
এই রুট দিয়ে মোটরসাইকেল, অ্যাম্বুলেন্স, প্রাইভেট কার, পিকাপ, পণ্যবাহী ট্রাক চলাচল করে। জোয়ার-ভাটার সঙ্গে ফেরি যাতায়াতের কারণে গাড়িচালক ও যাত্রীরা চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন।
বর্তমানে নদীর নাব্য কমে যাওয়ায় এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীদের বালু উত্তোলনের ফলে ফেরি যাতায়াতে মারাত্মক সমস্যা হচ্ছে। এতে ফেরি চলাচলের সময় যেমন বেশি লাগে, তেমনি জ্বালানি খরচও বেশি পড়ছে।
গত ৯ এপ্রিল বৃহস্পতিবার সকালে সরেজমিন দেখা যায়, ফেরি ঘাটে বেগম সুফিয়া কামাল ফেরিটি যানবাহন নিয়ে ভোলা যাওয়ার অপেক্ষা করছে। ফেরি ঘাটে তখনও ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রাম ছেড়ে আসা অর্ধ-শতাধিক মালবাহী যানবাহন লাইনে রয়েছে। একাধিক ট্রাক ও পিকআপের গাড়িচালক জানিয়েছেন, আগের দিন বিকালে এবং সন্ধ্যায় তারা মজু চৌধুরী ফেরি ঘাটে আসেন। ফেরি না পাওয়ায় পরের দিনও তারা ভোলাসহ দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় যাতায়াত করতে পারছেন না। পর্যাপ্ত ফেরি না থাকায় যাতায়াতের ক্ষেত্রে এই বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে। এখানে থাকা-খাওয়া ও ওয়াশরুমের মারাত্মক সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন যাত্রীরা।
টিকিট বিক্রেতা বাচ্চু মিয়া জানান, মজু চৌধুরী ঘাট থেকে মেঘনা নদী পর্যন্ত প্রায় ৫ কিলোমিটার রহমতখালী নদী রয়েছে। পলি জমে এর গভীরতা যেমন কম, তেমনি বালুবাহী বলগেট বা বাল্কহেড স্টিমারের কারণে ফেরি ঘুরতে ও চলাচল করতে সমস্যা হয়।
স্থানীয় একটি সূত্র জানায়, ১০০টিরও বেশি বালুবাহী বলগেট বা বাল্কহেড ফেরি ঘাটের পাশেই প্রতিদিন যাতায়াত করে। এ ছাড়া, ফেরি ঘাটের মুখে ও আশপাশে ২০টির বেশি বালুমহাল রয়েছে। একটু বৃষ্টিতে ফেরি ঘাটের মুখের রাস্তা বালুর কারণে যাতায়াতের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। বালু ব্যবসায়ী মো. সেলিম মিয়া জানান, অনুমতি নিয়ে তারা বালু ব্যবসা করছেন।
ঢাকা মেট্রো-ট গাড়ি নম্বর ১৬-১৮০৪ এর গাড়িচালক মো. সজীব জানান, আগের দিন সন্ধ্যায় ঢাকা থেকে ছেড়ে লক্ষ্মীপুর ফেরি ঘাটে আসেন তিনি। আজকে সারাদিন থাকার পর আগামী দিন তিনি ফেরি পার হতে পারবেন। ফেরি না থাকায় ঘাটে এসে তারা বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হন।
বেগম সুফিয়া কামাল ফেরির মাস্টার জহিরুল ইসলাম জানান, জোয়ার থাকলে ২ ঘণ্টা আর জোয়ার না থাকলে ৩ ঘণ্টা সময় লাগে লক্ষ্মীপুরের মজু চৌধুরী থেকে ভোলার ফেরি ঘাটে যেতে। জোয়ারের সঙ্গে পলি মাটি এসে রহমতখালী নদীর ৫ কিলোমিটার নাব্য কমে যায়। বলগেট সন্ধ্যা ৬টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত সারাদেশে বন্ধ থাকলেও রহমতখালী নদীতে তা কেউ মানছে না। রহমতখালী নদীতে ড্রেজিং চলমান রয়েছে।
ফেরির মাস্টার জহিরুল ইসলাম জানান, ঈদের সময় এই ঘাটে যানবাহনের প্রচুর ভিড় থাকে। ওই সময় পাঁচ থেকে ছয় দিনেও এই যানজট স্বাভাবিক হয় না।
একাধিক গাড়িচালক জানান, যাত্রী ও গাড়িচালকদের জন্য ওয়াশ রুমের ব্যবস্থা না থাকায় মারাত্মক সমস্যায় পড়তে হয়।
বিআইডব্লিওটিসির ম্যানেজার আতিকুর জামান বলেন, ফেরি ঘাটে দুটি সমস্যাই বড়। একটি হলো রহমতখালী নদীর নাব্য হ্রাস আর অপরটি হচ্ছে চওড়া কম। এ কারণে ফেরি যাতায়াতে অনেক সমস্যা হয়।
লক্ষ্মীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য আবুল খায়ের ভুইয়া জানান, মজু চৌধুরীর হাট একটি নদীবন্দর। এখানে একটি লঞ্চ ঘাট ও ফেরি ঘাট রয়েছে। জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে এ বিষয়ে সংসদে নোটিস দেওয়া হয়েছে। মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
