পারস্য উপসাগর অঞ্চলে যুদ্ধ বন্ধ করার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দ্বিতীয় দফা সংলাপ ঘিরে কিছুটা অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সংলাপের জন্য ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সকে পাঠাচ্ছে ইসলামাবাদ; এমনকি সেখানে ইরানের সঙ্গে চুক্তি সই হবে এ কথাও জোর দিয়ে বলছেন। অন্যদিকে, ইরান বলছে, তারা সংলাপের জন্য প্রতিনিধিদল পাঠাবে না।
আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের শীর্ষ ব্যক্তিরা অনিশ্চয়তা কাটাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রেসিডেন্টদের সঙ্গে আলাপ করেছেন। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে কথা বলেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ। আর ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলেছেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির।
শেহবাজ শরিফ সংলাপের জন্য প্রতিনিধিদল পাঠাতে অনুরোধ করলে পেজেশকিয়ান জানান, নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত ইরান কোনো প্রতিনিধিদল পাঠাবে না।
শীর্ষ পর্যায়ে আলাপের সূত্র ধরে আসিম মুনির ট্রাম্পকে জানান, যুক্তরাষ্ট্রের ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নৌ-অবরোধ দেওয়ায় ও জাহাজ জব্দের ঘটনা নতুন করে আলোচনা শুরু করার ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে।
নৌ-অবরোধের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র গতকাল সোমবার হরমুজ প্রণালির কাছে ইরানের একটি বাণিজ্যিক জাহাজ আটক করলে পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটে। তুসকা নামের জাহাজটি আটকের প্রতিক্রিয়ায় ইরান পাল্টা জবাব দেওয়ার হুমকি দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশ দুটির মধ্যে আলোচনা আদৌ হবে কি না, সে বিষয়ে অনিশ্চয়তা আছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, নৌ-অবরোধের মধ্যেই তুসকা আরব সাগর থেকে হরমুজ প্রণালি হয়ে ইরানের বন্দর আব্বাসের দিকে যাচ্ছিল। টানা ছয় ঘণ্টা সতর্কবার্তা দেওয়ার পরও তুসকার ক্রুরা তা আমলে নেয়নি। এরপর আমেরিকার সৈন্যরা জাহাজটির ইঞ্জিন রুম খালি করার নির্দেশ দিয়ে গুলি চালায়। এরপর মেরিন সেনারা তুসকায় উঠে জাহাজটির দখল নেয়।
তুসকা জব্দ করার প্রতিক্রিয়ায় ওমান সাগরে অবস্থানরত যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক জাহাজ লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালায় ইরান। সংবাদমাধ্যম বিবিসি বলেছে, এ হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের জাহাজের ক্ষয়ক্ষতির তথ্য জানা যায়নি।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের গতকাল সন্ধ্যার দিকে যখন ইসলামাবাদ পৌঁছানোর কথা, তখন ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই তেহরানে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ইরান আলোচনার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়নি।
অন্যদিকে, জেনারেল মুনির নৌ-অবরোধ তুলে নেওয়ার জন্য অনুরোধ করলে ট্রাম্প জানান, তিনি বিষয়টি বিবেচনা করবেন।
তবে তুরস্কের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আনাদুলু বলছে, বিরোধ থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিতীয় দফা আলোচনায় অংশ নিতে পারে ইরান। পাকিস্তানের দুটি সূত্রের বরাতে বার্তা সংস্থাটি জানিয়েছে, আজ মঙ্গলবার ইরানের প্রতিনিধিদল ইসলামাবাদে পৌঁছাতে পারে। আশা করা হচ্ছে, চলতি এপ্রিল মাসের শুরুতে অনুষ্ঠিত প্রথম দফা আলোচনায় অংশ নেওয়া একই প্রতিনিধিদল এবারও আসবে। সেই দলের নেতৃত্ব দেবেন পার্লামেন্ট স্পিকার বাঘের গালিবাফ; সঙ্গে থাকবেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে আগ্রাসন চালালে পারস্য উপসাগরজুড়ে এ যুদ্ধ শুরু হয়। গতকাল ছিল এ যুদ্ধের ৫২তম দিন।
ট্রাম্প সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেছেন, পাকিস্তানে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তি সই হবে।
ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সসহ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা ইসলামাবাদের পথে রয়েছেন, এমন তথ্য দিয়ে নিউ ইয়র্ক টাইমসকে ট্রাম্প বলেন, আলোচনায় অগ্রগতি হলে তিনি ইরানের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাতে প্রস্তুত।
আলোচনার এই পর্যায়ে ‘কেউ অন্য কোনো খেলা খেলছে না’, এমন আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্রের মালিকানা ও পরমাণু অস্ত্র তৈরির উচ্চাকাক্সক্ষা ত্যাগ করতে হবে; এ বিষয়ে কোনো আপস করা হবে না।
যুক্তরাষ্ট্র আরও চায় হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত থাকবে। তবে তেহরানে বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) সাবেক কমান্ডার এবং বর্তমান সংসদ সদস্য ইব্রাহিম আজিজি বলেন, ইরান কখনোই হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ছাড়বে না।
ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত বার্তা সংস্থা ইরনা জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রকে অবিশ্বাস করলেও কূটনীতির ওপর জোর দিয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্টের মাসুদ পেজেশকিয়ান। তিনি বলেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে ‘সতর্কতা ও অবিশ্বাস’ একটি অনস্বীকার্য প্রয়োজনীয়তা। যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ দেখাচ্ছে যে, ওয়াশিংটন ‘কূটনীতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে তাদের আগের ধারার পুনরাবৃত্তি ঘটানোর’ দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। পেজেশকিয়ানের মতে, উত্তেজনা হ্র্রাস করতে প্রত্যেকটি যৌক্তিক ও কূটনৈতিক পথ ব্যবহার করা উচিত যুক্তরাষ্ট্রের।
এদিকে, উপসাগরীয় অঞ্চলের পরিস্থিতি নিয়ে ফোনালাপ করেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও সৌদি যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান। গতকাল সোমবার বিকেলে সৌদি যুবরাজের আমন্ত্রণে এই ফোনালাপে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এবং মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এ সময় চীনা প্রেসিডেন্ট বলেন, বেইজিং অবিলম্বে শত্রুতা বন্ধ ও একটি ব্যাপক যুদ্ধবিরতির পক্ষে।
যুক্তরাষ্ট্রের একসময় প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী রাশিয়াও আশা প্রকাশ করেছে, পারস্য উপসাগর অঞ্চল ও বিশ^-অর্থনীতির আরও নেতিবাচক পরিস্থতি এড়াতে ওয়াশিংটন ও তেহরান আলোচনা অব্যাহত রাখবে।
রুশ প্রেসিডেন্টের কার্যালয় ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ গতকাল মস্কোয় সাংবাদিকদের বলেন, রাশিয়া আশা করে আলোচনার প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে; পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়া বা সামরিক সংঘাতের দিকে যাওয়া এড়ানো যাবে। তিনি জানান, একটি শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য চুক্তিতে পৌঁছাতে রাশিয়া সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত।
