সুস্থতা অমূল্য নেয়ামত। এর প্রকৃত মূল্য মানুষ সাধারণত তখনই উপলব্ধি করে, যখন তা হারিয়ে ফেলে। সুস্থতা বলতে শুধু শারীরিক সুস্থতাকে বোঝায় না, বরং এর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত মানসিক, সামাজিক ও আধ্যাত্মিক সুস্থতাও। একজন মানুষ তখনই প্রকৃত অর্থে সুস্থ বলে বিবেচিত হয়, যখন তার দেহ ও মন উভয়ই ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় থাকে। শরীর সুস্থ কিন্তু মন অশান্ত, এ অবস্থায় জীবনে শান্তি আসে না। আবার মন ভালো থাকলেও শরীর অসুস্থ হলে জীবন হয়ে ওঠে দুর্বিষহ। তাই সুস্থতা একটি সমন্বিত অবস্থা, যা মানুষের সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত করে।
আল্লাহ প্রদত্ত প্রতিটি নেয়ামতের মতো সুস্থতার বিষয়েও মানুষকে জবাবদিহি করতে হবে। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘অতঃপর সেদিন অবশ্যই তোমাদের নেয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (সুরা তাকাসুর ৮)
রাসুলুল্লাহ (সা.) সুস্থতার গুরুত্ব সম্পর্কে সতর্ক করে বলেন, ‘দুটি নেয়ামত আছে, যেগুলোর ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষ অসচেতন। তা হলো সুস্থতা ও অবসর সময়।’ (সহিহ বুখারি) সুস্থতা মানুষের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং তাকে দায়িত্বশীল জীবনযাপনে সহায়তা করে। একজন সুস্থ ব্যক্তি পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারে। বিপরীতে অসুস্থতা মানুষের কর্মশক্তিকে হ্রাস করে এবং তাকে অন্যের ওপর নির্ভরশীল করে তোলে। ফলে ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বর্তমান যুগে আধুনিক জীবনযাত্রার নানা পরিবর্তনের ফলে মানুষের সুস্থতা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। প্রযুক্তিনির্ভরতা, অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব এবং মানসিক চাপের কারণে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের মতো অসুখ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। অথচ সামান্য সচেতনতা ও নিয়ম মেনে চললে এসব রোগ অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব।
সুস্থ থাকার জন্য কিছু মৌলিক বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুষম খাদ্য গ্রহণ, নিয়মিত শরীরচর্চা, পর্যাপ্ত ঘুম এবং মানসিক প্রশান্তি, এসবই সুস্থ জীবনের ভিত্তি। প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা বা হালকা ব্যায়াম শরীরকে কর্মক্ষম রাখে। পাশাপাশি দুশ্চিন্তা কমিয়ে আল্লাহর স্মরণে নিজেকে নিয়োজিত রাখার বিষয়টি মানসিক শান্তি এনে দেয়। পরিচ্ছন্নতা সুস্থতার আরেকটি অপরিহার্য দিক। ইসলাম পরিচ্ছন্নতাকে ইমানের অংশ হিসেবে ঘোষণা করেছে। ব্যক্তিগত ও সামাজিক পরিচ্ছন্নতা রোগ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নিয়মিত হাত ধোয়া, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পোশাক পরিধান এবং বিশুদ্ধ পানি পান, এসব অভ্যাস সুস্থ জীবন গঠনে সহায়ক।
সুস্থতা একটি আমানতও। এটি আমাদের ইচ্ছামতো ব্যবহার করার জন্য নয়, বরং সংরক্ষণ করার জন্য। তাই ধূমপান, মাদকাসক্তি কিংবা যেকোনো ক্ষতিকর অভ্যাস থেকে দূরে থাকা অপরিহার্য। এসব শুধু ব্যক্তির স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে না, বরং সমাজের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
মানসিক সুস্থতাও আজকের যুগে বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। কর্মক্ষেত্রের চাপ, পারিবারিক জটিলতা এবং সামাজিক প্রতিযোগিতা মানুষের মনে অস্থিরতা তৈরি করছে। এজন্য সময়মতো বিশ্রাম নেওয়া, পরিবারকে সময় দেওয়া এবং ইতিবাচক চিন্তায় নিজেকে অভ্যস্ত করা জরুরি। পাশাপাশি ইবাদত ও আল্লাহর স্মরণ মানুষের হৃদয়ে প্রশান্তি এনে দেয়।
লেখক : শিক্ষক, মাদরাসাতুদ দাওয়াহ শরইয়্যাহ, নারায়ণগঞ্জ