বন্দরে বিদেশি বিনিয়োগ সর্বাগ্রে দেশের স্বার্থ

আপডেট : ২৬ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৫৩ এএম

চট্টগ্রাম বন্দর অর্থনীতির লাইফ লাইন। দেশের ৯৩ শতাংশ আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম চলে বন্দর দিয়ে। কনটেইনার পরিবহনে বিগত ৪৮ বছরের পথচলায় এখন অর্থনীতির চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে বন্দরটি। বর্তমানে বন্দরে বছরে ৩৩ লাখ কনটেইনার ও ১৩ কোটি মেট্রিক টন কার্গো পণ্য উঠানামা করছে, ভিড়ছে ৪ হাজার দেশি-বিদেশি বড় জাহাজ। ৫০ বছর ধরে কনটেইনার পরিবহন করলেও, বন্দরের ইতিহাস হাজার বছর পুরনো। এই বন্দরকে পর্তুগিজ বণিকরা ষোড়শ শতকে নাম দিয়েছিল ‘পোর্তে গ্র্যান্দো দি বেঙ্গলা’, অষ্টদশ শতকে ব্রিটিশদের নাম ‘গ্র্যান্ড পোর্ট অব বেঙ্গল’। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি মেলে ১৮৮৮ সালের ২৫ এপ্রিল। প্রথম দিকে বাল্ক পণ্য উঠানামা করলেও বন্দরে কনটেইনার উঠানামা শুরু হয় ১৯৭৭ সালের ২২ মার্চ। একসময় বন্দরে বিদেশি বিনিয়োগের ভাটা ছিল। এখন চলছে জোয়ার। সহজেই প্রশ্ন আসে, এতদিন কেন ভাটা ছিল? প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই বন্দর ছিল মূলত সার্ভিস পোর্ট। বর্তমানে মোংলা ও পায়রা বন্দর সার্ভিস পোর্ট। ১৮৮৭ সালের ২৫ এপ্রিল চট্টগ্রাম বন্দর প্রতিষ্ঠিত হলেও ১৯৯১ সালে জেটিতে ক্রেন যুক্ত করা, ২০০৭ সালে নতুন টার্মিনাল নির্মাণ ও ইকুইপমেন্ট সংযুক্তির মাধ্যমে টুলস পোর্টে প্রবেশ করে এটি। তখন থেকে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে এগিয়ে চলে বন্দরটি। টুলস পোর্ট হিসেবে নিজেদের অবস্থান মজবুত করার পর,  বিশে^র আধুনিক বন্দরগুলোর মতো ল্যান্ডলর্ড পদ্ধতিতে প্রবেশ করেছে চট্টগ্রাম বন্দর। এই মডেলের ওপর নির্ভর করেই বন্দরে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ছে। কিন্তু বিনিয়োগের পরিমাণ কত?

বন্দরের বে টার্মিনালে পিএসএ সিঙ্গাপুর এবং ডিপি ওয়ার্ল্ড উভয় প্রতিষ্ঠানের ৭৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার হিসেবে ১৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করার কথা প্রাক্কলিত চুক্তি অনুযায়ী। এ ছাড়া মাল্টিপারপাস টার্মিনালে আরও ৭৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ হতে পারে। অপরদিকে লালদিয়ায় এপি মুলারের মায়ের্সক ৫৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালে রেডসি গেটওয়ে ২০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালে ডিপি ওয়ার্ল্ড ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের কথা রয়েছে। এ ছাড়া বে টার্মিনালে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ বিশ^ব্যাংক থেকে ৬৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং নদীর ওপারে কর্ণফুলী ড্রাইডকে বিদেশি বিনিয়োগ রয়েছে ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। সব মিলিয়ে ৩ হাজার ৮৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ আসছে বিদেশ থেকে। এ ছাড়া মাতারবাড়িতে জাইকার বিনিয়োগ প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা। পতেঙ্গার লালদিয়ায় এমজিএইচ বিনিয়োগ করবে ৫০০ কোটি এবং কর্ণফুলী ড্রাইডক ইতিমধ্যে বিনিয়োগ করেছে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরকেন্দ্রিক ৬২ হাজার ৯৭০ কোটি টাকা বিনিয়োগ হতে যাচ্ছে।

ইতিমধ্যে বন্দর পরিচালনায় দেশীয় অপারেটর গড়ে উঠেছে। এদের নেতৃত্বেই বন্দর পরিচালিত হয়েছে এবং একটি দক্ষ জনশক্তি গড়ে উঠেছে। তবে শতভাগ বিদেশি বিনিয়োগে চলে গেলে, দেশীয় অপারেটররা বিলুপ্ত হয়ে যাবে কি না তা ভাবার বিষয়। প্রয়োজনে টার্মিনাল পরিচালনায় দেশি-বিদেশি অপারেটর সমন্বিতভাবে হতে পারে। সেক্ষেত্রে বিদেশি কোম্পানিকে দেশীয় অপারেটরদের সঙ্গে রাখতে হবে। এতে বন্দরের আয়ের একটি অংশ যেমন দেশে থাকবে, তেমনি দেশীয় অপারেটরদের দক্ষতা বাড়বে। যদিও এক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় পলিসি নেবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। তবে বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে, দেশের স্বার্থ ও দেশীয় অপারেটরদের ভবিষ্যৎ আমলে নেওয়া উচিত। চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি টার্মিনাল পরিচালনা দিয়ে, বন্দর শ্রমিক-কর্মচারীরা অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে প্রবল আন্দোলন করে বন্দর অচল করেছিল। তারা এনসিটি টার্মিনালকে বিদেশিদের হাতে দেওয়ার প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে। কিন্তু নৌমন্ত্রী সম্প্রতি চট্টগ্রাম পরিদর্শনে গিয়ে এনসিটি বিদেশিদের হাতে দেওয়ার বিষয়টি উত্থাপন করেছেন এবং দেশের স্বার্থ সর্বোচ্চ বিবেচনায় এনে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা উল্লেখ করেন। আমরা চাইব, যেভাবে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা যায়, সরকার সেদিকে হাঁটবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত