সহকর্মীর সঙ্গে সদ্ব্যবহারের নির্দেশনা

আপডেট : ২৭ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৫০ এএম

ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা। পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও পেশাগত জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলাম শিষ্টাচার, সৌজন্য ও সদাচরণের দিকনির্দেশনা দিয়েছে। মানুষের কর্মজীবনে সহকর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কর্মক্ষেত্রে সুসম্পর্ক, সৌহার্দ্য ও সহানুভূতিশীল আচরণ কর্মপরিবেশকে সুন্দর ও উৎপাদনক্ষম করে তোলে। কোরআন ও হাদিসে এ বিষয়ে অসংখ্য মূল্যবান নির্দেশনা রয়েছে, যা আমাদের সহকর্মীদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার ও সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক গড়তে সাহায্য করে।

সহকর্মীর গুরুত্ব : সহকর্মীরা আমাদের কর্মক্ষেত্রে প্রতিদিনের সঙ্গী। একজন মানুষের পেশাগত সাফল্য অনেকাংশেই নির্ভর করে তার সহকর্মীদের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর। উত্তম ব্যবহার, সহানুভূতি, সহযোগিতা এবং ধৈর্য প্রদর্শনের মাধ্যমে একটি শান্তিপূর্ণ ও কার্যকর কর্মপরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব। ইসলাম এসব গুণাবলিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে।

কোরআনের নির্দেশনা : মহান আল্লাহ কোরআনে বলেন, ‘তোমরা সৎকাজ ও তাকওয়ায় একে অপরের সাহায্য করো, কিন্তু পাপ ও সীমা লঙ্ঘনে একে অপরের সাহায্য করো না।’ (সুরা মায়েদা ২) এই আয়াতে ইসলামের দৃষ্টিতে পারস্পরিক সহযোগিতার গুরুত্ব স্পষ্ট। কর্মক্ষেত্রে সহকর্মীদের প্রতি সহানুভূতি, দায়িত্ববোধ ও দলগত কাজের চেতনা গড়ে তোলার নির্দেশনা এ আয়াতের অন্তর্নিহিত বার্তা।

অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তোমরা মানুষদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করো।’ (সুরা বাকারা ৮৩) এই সাধারণ নির্দেশনার আওতায় সবার সঙ্গে, বিশেষ করে সহকর্মীদের সঙ্গে সদাচরণ অপরিহার্য।

নবীজির আদর্শ : হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী। তিনি সাহাবিদের সঙ্গে অত্যন্ত সদাচরণ করতেন। রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই উত্তম, যার চরিত্র উত্তম।’ (সহিহ বুখারি) তিনি আরও বলেন, ‘মুসলমান সেই ব্যক্তি, যার হাত ও মুখ থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদ থাকে।’ (সহিহ বুখারি ও মুসলিম) এই হাদিস দুটি থেকে বোঝা যায়, কর্মক্ষেত্রেও আমাদের এমন আচরণ করা উচিত, যাতে কেউ কষ্ট না পায় এবং সবসময় নিরাপদ বোধ করে। সহকর্মীদের সঙ্গে সদ্ব্যবহারের বিষয়ে ইসলামের বিভিন্ন দিকনির্দেশনা উল্লেখ করা হলো।

আন্তরিকতা ও সৌহার্দ বজায় রাখা : রাসুল (সা.) বলেন, ‘ভাইয়ের মুখে হাসিমুখে তাকানোও সদকা।’ (তিরমিজি) সহকর্মীদের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলা, তাদের খোঁজখবর রাখা ইসলামের দৃষ্টিতে ইবাদতের মর্যাদা পায়।

সহানুভূতি ও সহমর্মিতা প্রদর্শন : রাসুল (সা.) বলেন, ‘তুমি তোমার ভাইয়ের জন্য তাই চাও, যা তুমি নিজের জন্য চাও। তবেই তুমি প্রকৃত মুমিন হবে।’ (সহিহ বুখারি) এই নীতিকে কাজে লাগিয়ে কর্মক্ষেত্রে সবার উন্নতি ও কল্যাণ কামনা করাই ইসলামের শিক্ষা।

পরস্পরের সহযোগিতা করা : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ তার বান্দার সাহায্য করেন, যতক্ষণ সে তার ভাইয়ের সাহায্যে থাকে।’ (সহিহ মুসলিম) কর্মক্ষেত্রে কেউ সমস্যায় পড়লে, দায়িত্বভার বেশি হলে অথবা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত থাকলে সহকর্মীদের সাহায্যে এগিয়ে আসা ইসলামের অন্যতম বড় শিক্ষা।

দোষ-ত্রুটি ক্ষমা করা : সহকর্মীদের কিছু ভুলত্রুটি হতে পারে। ইসলাম ধৈর্য ও ক্ষমাশীলতা অবলম্বনের শিক্ষা দেয়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তুমি মাফ করার পথ অবলম্বন করো, সৎকাজের আদেশ দাও এবং অজ্ঞদের উপেক্ষা করো।’ (সুরা আরাফ ১৯৯)

পরনিন্দা ও হিংসা পরিহার : অনেক সময় কর্মক্ষেত্রে ঈর্ষা ও পরনিন্দা পরিবেশ নষ্ট করে দেয়। অথচ কোরআনে পরনিন্দাকে মৃত ভাইয়ের গোশত ভক্ষণের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? নিশ্চয়ই তা তোমরা অপছন্দ করো!’ (সুরা হুজুরাত ১২)

ইনসাফ করা : কর্মক্ষেত্রে ইনসাফ (ন্যায়পরায়ণতা) বজায় রাখা ইসলামের অন্যতম নীতিমালা। কোনো সহকর্মীর প্রতি পক্ষপাতিত্ব বা অবিচার করা হারাম। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন, তোমরা আমানত তাদের প্রাপকদের কাছে পৌঁছে দেবে এবং যখন মানুষের মধ্যে বিচার করবে, তখন ন্যায়বিচার করবে।’ (সুরা নিসা ৫৮) আর ইসলাম নারীদের সম্মান ও মর্যাদা দিতে বলেছে। কর্মক্ষেত্রে পুরুষ ও নারী সহকর্মীরা একে অপরের প্রতি সম্মান, সততা ও পবিত্র ব্যবহার বজায় রাখার দায়িত্বে আবদ্ধ।

কর্মপরিবেশে সুসম্পর্ক গঠনের উপায় : এক. সকাল বেলায় সালাম দিয়ে কথা শুরু করা। দুই. সময়মতো দায়িত্ব পালন করা। তিন. একে অপরের দোষ না খোঁজা। চার. পরচর্চা ও ষড়যন্ত্র থেকে দূরে থাকা। পাঁচ. ছোটখাটো ভুলকে ক্ষমা করে দেওয়া। ছয়. কাউকে হেয় বা অপমান না করা। সাত. প্রয়োজনীয় পরামর্শ বা সাহায্যে এগিয়ে আসা। আট. ঈদ বা বিশেষ সময়ে শুভেচ্ছা বিনিময় করা। নয়. সমমর্যাদার সহকর্মীকে বন্ধু হিসেবে গণ্য করা। দশ. কর্তা ও অধীনস্থ উভয়ের সঙ্গে সম্মানজনক ব্যবহার করা।

ইসলামে কর্মসংস্কৃতি : সহকর্মীদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করা শুধু সামাজিক শিষ্টাচার নয়, বরং এটি ইসলামি চরিত্রের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। ইসলাম আমাদের শেখায় কীভাবে কর্মক্ষেত্রে শান্তিপূর্ণ, সম্মানজনক ও সহানুভূতিশীল সম্পর্ক গড়ে তুলতে হয়। কোরআন ও হাদিসের আলোকে আমরা যদি কর্মক্ষেত্রে এই নির্দেশনাগুলো বাস্তবায়ন করি, তবে কেবল আমাদের ব্যক্তিগত উন্নতিই নয়, বরং সমগ্র সমাজই উপকৃত হবে। আসুন, আমরা সহকর্মীদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার, সহানুভূতি ও ইনসাফের আচরণ গড়ে তুলে এক ইসলামী কর্মসংস্কৃতি গড়ে তুলি।

লেখক : মুহাদ্দিস ও শিক্ষা সচিব, জামিয়া দারুল হিকমাহ, কেওয়া, শ্রীপুর, গাজীপুর

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত