কক্সবাজারের চকরিয়া ও পেকুয়া উপজেলার উপকূলীয় এলাকায় ১৯৯১ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের ৩৫ বছর পরও টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ না হওয়ায় ঝুঁকি কাটেনি। বড় জোয়ার এলেই অনেক স্থানে পানি ঢুকে পড়ছে লোকালয়ে। ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাসের আশঙ্কা দেখা দিলেই নতুন করে আতঙ্কে পড়ছেন লাখো মানুষ।
২৯ এপ্রিল-উপকূলবাসীর জন্য এক শোকাবহ দিন। ১৯৯১ সালের এই রাতে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে প্রাণ হারান উপকূলের লাখো মানুষ। কক্সবাজারের চকরিয়া ও পেকুয়াতেই অন্তত ২৫ হাজার মানুষ প্রাণ হারান এ জলোচ্ছ্বাসে। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে বসতভিটা, ফসলের মাঠ ও জনপদ পরিণত হয় মৃত্যুপুরীতে। সেই বিভীষিকার স্মৃতি আজও তাড়া করে ফেরে উপকূলবাসীকে।
চকরিয়া উপজেলার বদরখালী ইউনিয়নের বাসিন্দা নুরুল আমিন (৬০) বলেন, রাতের মধ্যে হঠাৎ পানি বাড়তে থাকে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঘরবাড়ি ভেসে যায়। আমি কোনো রকমে গাছ আঁকড়ে বেঁচে ছিলাম, কিন্তু পরিবারের তিনজনকে হারাই।
পশ্চিম বড় ভেওলা ইউনিয়নের আয়েশা বেগম (৫৮) বলেন, চারদিকে শুধু পানি আর মানুষের আর্তনাদ ছিল। আমার চোখের সামনে আমার ছোট ভাইকে স্রোত ভাসিয়ে নিয়ে যায়। সেই দৃশ্য আজও ভুলতে পারিনি।
চিরিঙ্গা ইউনিয়নের মো. আলর হোসেন (৫২) বলেন, সেই রাতে বাতাস আর পানির শব্দে মনে হয়েছিল পৃথিবী শেষ হয়ে যাচ্ছে। কোনোভাবে বেঁচে গেলেও পুরো গ্রামটাই ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।
ঢেঁমুশিয়া ইউনিয়নের মো. কালু (৫৫) বলেন, রাতের অন্ধকারে শুধু মানুষ দৌড়াচ্ছিল। আমার দুই আত্মীয়কে আর খুঁজে পাইনি। এখনো জোয়ার বাড়লেই ভয় ফিরে আসে।
পেকুয়া উপজেলার মগনামা ইউনিয়নের নুরুল আলম (৬৩) বলেন, কোনো প্রস্তুতি ছিল না। হঠাৎ জলোচ্ছ্বাস এসে সব শেষ করে দেয়। ঘরবাড়ি, গবাদিপশু থেকে শুরু করে সব হারিয়েছি।
উজানটিয়া ইউনিয়নের ছিদ্দিক আহমদ (৬৮) বলেন, পানি এত দ্রুত এসেছিল যে পালানোর সময় পাইনি। এখনো ঝড়ের খবর শুনলেই মনে হয় আবার সেই রাত ফিরে আসছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ঘূর্ণিঝড়-পরবর্তী সময়ে নির্মিত বেড়িবাঁধগুলো দীর্ঘদিনের অবহেলা, অপর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণ এবং সমন্বিত পরিকল্পনার অভাবে এখন অনেকাংশেই ভঙ্গুর। বর্ষা মৌসুমে কোথাও কোথাও জোড়াতালি দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হলেও স্থায়ী সমাধান মেলেনি। ফলে সরকারি বরাদ্দের সুফলও কার্যত প্রশ্নের মুখে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, চকরিয়া ও পেকুয়ায় সমুদ্র উপকূল ও নদীতীর মিলিয়ে প্রায় ২৮৭ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ রয়েছে। এর মধ্যে চকরিয়ায় ৪৭ কিলোমিটার এবং পেকুয়ায় ২৪০ কিলোমিটার। চকরিয়ার প্রায় ৩৬ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ বর্তমানে ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে। এসব অংশ এবং প্রায় ২৭ কিলোমিটার নদীতীর টেকসইভাবে সংরক্ষণের জন্য প্রকল্প প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। অন্যদিকে পেকুয়ার অন্তত ৭ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ অত্যন্ত নাজুক। সেগুলো আধুনিকভাবে পুনর্নির্মাণের লক্ষ্যে সমীক্ষা চলছে বলে জানা যায়।
চকরিয়ার বদরখালী, পশ্চিম বড় ভেওলা, চিরিঙ্গা, কোনাখালী, ঢেমুশিয়া, ডুলাহাজারা এবং পেকুয়ার মগনামা, রাজাখালী ও উজানটিয়া ইউনিয়নের জনপ্রতিনিধিরা জানান, বিদ্যমান বেড়িবাঁধগুলো কার্যত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। তাদের আশঙ্কা, বড় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঘাত হানলে অতীতের মতোই ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো কঠিন হবে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড কক্সবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলাম বলেন, উপকূল এখনো পুরোপুরি সুরক্ষিত নয়। তবে ধাপে ধাপে দুর্বল অংশগুলো সংস্কার ও শক্তিশালী করা হচ্ছে। বড় আকারের সমন্বিত প্রকল্প এখনো বাস্তবায়িত না হলেও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। তিনি জানান, চকরিয়ায় জাইকার অর্থায়নে একটি প্রকল্প বর্তমানে বাস্তবায়নাধীন, যা চলতি বছরের জুনে শেষ হওয়ার কথা।
উপকূলবাসীর দাবি, বিচ্ছিন্ন সংস্কার নয়, সমন্বিত বড় প্রকল্পের মাধ্যমে পুরো চকরিয়া-পেকুয়া উপকূলে টেকসই ও আধুনিক বেড়িবাঁধ নির্মাণ জরুরি।
১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের সেই ভয়াল রাত উপকূলের মানুষকে এখনো তাড়া করে। তাদের প্রত্যাশা, আর কোনো পরিবার যেন স্বজন হারানোর বেদনায় না ডুবে যায়। টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে উপকূলকে নিরাপদ করা হোক।
অনিশ্চয়তায় ‘টক্সিক’ সিনেমার মুক্তি
বাংলাদেশেও পালিত হচ্ছে বিশ্ব নৃত্য দিবস