একদিকে কালবৈশাখী, বজ্রপাত। অন্যদিকে বৃষ্টির পানিতে ডুবে গেছে জমি। শ্রমিকের সংকটের ফলে জেলার বোরো জমিতে থাকা পাকা ধান গোলায় তুলতে পারছেন না অগণিত কৃষক। এ ছাড়া রোদের অভাবে কাটা ধান পচে নষ্ট হচ্ছে। সরকারি হিসাবে সতর্কতার সময় শেষ প্রান্তে এসে জেলার হাওর এলাকার পাঁচটি উপজেলার ৫০ ভাগ বোরো ধান কাটা হয়েছে। বাকি অংশ ধান এখনো নানা ঝুঁকিতে রয়েছে। মাঠে থাকা ধান ঘরে তুলতে পারবেন কিনা এ নিয়ে দুচিন্তায় রয়েছেন কৃষকরা। ২৮ এপ্রিলের মধ্যে ধান কেটে শেষ করার জন্য সরকারিভাবে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল।
চলতি মৌসুমে জেলার শুধু হাওর এলাকায় ৪৬ হাজার ৯৫৩ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে এক হেক্টর বেশি জমিতে বোরো আবাদ হয়। এর মধ্যে বাহুবল উপজেলায় চার হাজার ৪৯৯ হেক্টর, নবীগঞ্জে পাঁচ হাজার ৬০৬ হেক্টর, লাখাইয়ে আট হাজার ৩৩২ হেক্টর, বানিয়াচংয়ে ১৭ হাজার ৯৮৪ হেক্টর ও আজমিরীগঞ্জে আট হাজার ৬৩৩ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, হাওর এলাকায় শতকরা ৫৩ ভাগ ধান এ পর্যন্ত কাটা হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ হিসাব অনুযায়ী জেলার ৯টি উপজেলায় মোট এক লাখ ২৩ হাজার ৬৪৪ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২০৪ হেক্টর কম। এর মধ্যে হাওর এলাকায় ৪৬ হাজার ৯৫৪ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়। অবশিষ্ট নন-হাওর এলাকায়।
বানিয়াচং উপজেলা কৃষি অফিসের উপ-সহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা অলক কুমার চন্দ জানান, বানিয়াচং উপজেলায় ১০৬টি কম্বাইন্ড হারভেস্টার রয়েছে। দৈনিক ১০ হাজার লিটার জ¦ালানি তেলের চাহিদা রয়েছে। প্রতিটি হারভেস্টার দৈনিক ১০০ থেকে ১৫০ লিটার জ¦ালানি তেল প্রয়োজন। তিনি জানান, দৈনিক এক হাজার লিটারের বেশি তেল পাওয়া যায় না। অপরদিকে জমিতে পানি থাকায় হারভেস্টার চালানো যাচ্ছে না। এদিকে বন্যার পূর্বাভাস থাকায় হাওরে দ্রুত ধান কেটে ফেলার জন্য সতর্ক বার্তা জারি করা হয়েছে। অপরদিকে ধান কাটা শ্রমিকের সংকট রয়েছে।
সরকারি হিসাবে গত কয়েক বছর ধরে হাওরের ৮০ ভাগ ধান হারভেস্টার দিয়ে কাটা হচ্ছে। চলতি মৌসুমে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জ্বালানি সংকট প্রভৃতি কারণে বোরো ফসল কাটা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। বানিয়াচং উপজেলার কুমড়ী গ্রামের কৃষক শহীদ চৌধুরী জানান, চলতি মৌসুমে গত ৮ এপ্রিল থেকে তিনি তার হারভেস্টার দিয়ে ধান কাটা শুরু করেন। জমিতে পানি থাকায় এবং তেল না পাওয়ায় ধান কাটতে নানা সমস্যা সম্মুখীন হন। তিনি এক ফোঁটা তেলও পাম্প না পেয়ে খোলাবাজার থেকে বেশি দামে তেল সংগ্রহ করছেন।
হবিগঞ্জ সদর উপজেলার রিচি গ্রামের ফারুক মিয়া বলেন, গত কয়েক দিন ধরে তুফান ও অবিরাম বৃষ্টির কারণে জমির পাকা ধান পানিতে ডুবে গেছে। বজ্রপাতে জেলার বিভিন্ন স্থানে কৃষক মারা যাওয়ার খবর শুনে অনেকে জমিতে যাওয়ার সাহস হারিয়ে ফেলেছেন। এ ছাড়া রোদের অভাবে কাটা ধান শুকানো যাচ্ছে না। ফলে ধান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে মাঠ থেকে ফড়িয়ারা সাড়ে ৬ থেকে ৭০০ টাকা ধরে ধান ক্রয় করছে।
উল্লেখ্য, চলতি মৌসুমে অতিবৃষ্টি, শিলা, বাঁধ ভাঙাসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে জেলার ৬টি উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকার বোরো ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলা কৃষি পুনর্বাসন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী বানিয়াচং উপজেলায় ২৪৮ হেক্টর, আজমিরীগঞ্জে ১৫৪ হেক্টর, হবিগঞ্জ সদরে ৯০ হেক্টর, লাখাইয়ে ২৫ হেক্টর, নবীগঞ্জে ২০ হেক্টর ও চুনারুঘাটে ১৯ হেক্টর জমির বোরো ফসল বিনষ্ট হয়েছে।