মৃত্যু-পরবর্তী অন্তকালের জীবনকে পরকাল বলে। মানুষের মৃত্যু, কবর, কেয়ামত, হাশর, আমলের হিসাব-নিকাশ, জান্নাত-জাহান্নামের মতো সব বিষয় এর অন্তর্ভুক্ত। মানুষের সৃষ্টি ও জীবনের উদ্দেশ্যের সঙ্গে আখেরাত বা পরকাল গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষের কৃতকর্ম ও কর্মফলের সঙ্গেও আখেরাত সম্পর্কিত। আখেরাত বা পরকালের পাথেয় অর্জন করা একজন মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
পরকালের প্রতি দৃঢ়বিশ্বাস ও তার ভয়াবহতা দুনিয়ার প্রতি অনাগ্রহ এবং পরকালের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করে। এ ছাড়া পরকালের চিন্তা মানুষের পার্থিব জীবনকে সুশৃঙ্খল করে এবং আত্মনিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করে। প্রত্যেক মানুষ সুখ-শান্তি ও সফলতা চায়। কিন্তু সুখ-শান্তি ও সফলতা বলতে অনেকেই শুধু পার্থিব জীবনের আরাম-আয়েশ আর স্বাচ্ছন্দ্যকেই বুঝে থাকে। এ জন্য দেখা যায়, পার্থিব দুনিয়া অর্জনের পেছনেই সব পরিশ্রম-প্রচেষ্টা। অথচ পরকালের জীবনই আসল ও চিরস্থায়ী জীবন। পরকালের সুখ-শান্তি ও সফলতাই হলো প্রকৃত এবং চিরস্থায়ী সফলতা। বুদ্ধিমান তো তারাই, যারা সেই অনন্ত-অসীম, চিরস্থায়ী জীবনের জন্য পাথেয় সংগ্রহ করে। তাদের কাছে পার্থিব দুনিয়া মূল্যহীন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘এ দুনিয়ার জীবন তো খেল-তামাশা ছাড়া আর কিছুই নয়। নিশ্চয়ই আখেরাতের জীবনই হলো প্রকৃত জীবন, যদি তারা জানত।’ (সুরা আনকাবুত ৬৪) তাই আখেরাত বা পরকাল নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে হবে। পরকালে মুক্তির উপায় সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণী উল্লেখ করা হলো।
আল্লাহ ও নবীজির আদেশ-নিষেধ মানা : মহান আল্লাহ ও তার রাসুল (সা.)-এর আদেশ-নিষেধ মেনে চললে এবং তাদের বিধিনিষেধ লঙ্ঘন না করলে জাহান্নামের শাস্তি থেকে মুক্তি ও জান্নাত লাভ করা যাবে। এ ব্যাপারে পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘যে আল্লাহ ও তার রাসুলের আদেশমতো চলবে, আল্লাহ তাকে জান্নাতসমূহে প্রবেশ করাবেন, যেগুলোর তলদেশ দিয়ে নদী প্রবাহিত রয়েছে। তারা সেখানে চিরকাল থাকবে। এ হলো বিরাট সাফল্য। আর যে আল্লাহ ও তার রাসুলের অবাধ্য হবে এবং সীমা লঙ্ঘন করবে, তিনি তাকে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষিপ্ত করবেন। সে সেখানে চিরকাল থাকবে। তার জন্য রয়েছে অপমানজনক শাস্তি।’ (সুরা নিসা ১৩-১৪)
ইস্তিগফার করা : ইস্তিগফার আরবি শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ ক্ষমা প্রার্থনা করা। ইসলামের পরিভাষায় গুনাহের কথা স্মরণ করে লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয়ে মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করাকে ইস্তিগফার বলা হয়। আল্লাহর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করলে আল্লাহ বান্দাকে ক্ষমা করেন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘কেউ যদি কোনো মন্দ কাজ করে বা নিজের প্রতি জুলুম করে, এরপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে, সে আল্লাহকে ক্ষমাশীল, পরম দয়ালুরূপে পাবে।’ (সুরা নিসা ১১০)
হাদিসে একাধিক ইস্তিগফার বর্ণিত হয়েছে। সেগুলোর মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হলো সাইয়্যেদুল ইস্তিগফার। তাই সকাল-সন্ধ্যা সাইয়্যেদুল ইস্তিগফার পাঠ করা উচিত। শাদ্দাদ ইবনে আওস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, সাইয়্যেদুল ইস্তিগফার হলো বান্দার এ দোয়া পড়া, ‘আল্লাহুম্মা আন্তা রাব্বি, লা ইলাহা ইল্লা আন্তা খলাকতানি ওয়া আনা আবদুকা, ওয়া আনা আলা আহদিকা ওয়া ওয়াদিকা মাসতাতয়তু, আউজু বিকা মিন শাররি মা ছনাতু, আবুউ লাকা বিনিমাতিকা আলাইয়া, ওয়া আবুউ লাকা বিজামবি, ফাগফির লি, ফা ইন্নাহু লা ইয়াগফিরুজজুনুবা ইল্লা আন্তা।’
অর্থাৎ হে আল্লাহ! আপনি আমার প্রতিপালক। আপনিই আমাকে সৃষ্টি করেছেন। আমি আপনারই গোলাম। আমি যথাসাধ্য আপনার সঙ্গে কৃত প্রতিজ্ঞা ও অঙ্গীকারের ওপর অবিচল আছি। আমি আমার সব গুনাহের অনিষ্টতা থেকে আপনার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আপনি আমার প্রতি আপনার যে নেয়ামত দিয়েছেন তা স্বীকার করছি। আর আমার কৃত গুনাহের কথাও স্বীকার করছি। আপনি আমাকে ক্ষমা করুন। আপনি ছাড়া আর কেউ গুনাহ ক্ষমা করতে পারে না।’ (সহিহ বুখারি ৬৩০৬) হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, যে ব্যক্তি দিনে (সকালে) দৃঢ় বিশ্বাসের সঙ্গে এ ইস্তিগফার পড়বে আর সন্ধ্যা হওয়ার আগেই যদি মারা যায়, তাহলে সে জান্নাতি হবে। আর যে ব্যক্তি রাতে (প্রথম ভাগে) দৃঢ় বিশ্বাসের সঙ্গে এ দোয়া পড়ে নেবে আর সকাল হওয়ার আগেই মারা গেলে সে জান্নাতি হবে।’ (তিরমিজি ৩৩৯৩)
আল্লাহর ভয়ে কাঁদা : কান্না মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। কান্নায় মানুষের নম্রতা ও বিনয়ীভাব প্রকাশ পায়। এটা আল্লাহর অত্যন্ত প্রিয়। আল্লাহর ভয়ে ক্রন্দনের ফজিলত অত্যধিক। আল্লাহর ভয়ে দুফোঁটা চোখের পানি ফেলতে পারা গোটা পৃথিবীর প্রশান্তি, পরিতৃপ্তি ও মুগ্ধতার চেয়ে অনেক বেশি উত্তম। যার মূল্য হচ্ছে কেয়ামতের দিনে আল্লাহর আরশের নিচে ছায়া লাভ এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি। চোখের পানির কত মূল্য! এই চোখের পানি আল্লাহর কাছে অনেক প্রিয়। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর ভয়ে কাঁদে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে না। দুধ দোহন করার পর তা যেমন আর গাভীর ওলানে ফিরিয়ে নেওয়া অসম্ভব। (তিরমিজি ১৬৩৩)
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, দুই প্রকার চোখকে জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবে না। যে চোখ মহান আল্লাহর ভয়ে ক্রন্দন করে এবং যে চোখ আল্লাহর রাস্তায় পাহারাদারিতে নির্ঘুম রাত অতিবাহিত করে।’ (তিরমিজি ১৬৩৯)
নামাজ আদায় করা : নামাজ শ্রেষ্ঠ ইবাদত। প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক ও জ্ঞানসম্পন্ন মুসলমানের জন্য দিনে-রাতে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা ফরজ। হানজালা উসাইদি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ যথাযথভাবে আদায় করে, উত্তমরূপে অজু করে, সময়ের প্রতি খেয়াল রাখে, রুকু-সেজদা ঠিকমতো আদায় করে এবং এভাবে নামাজ আদায় করাকে নিজের ওপর আল্লাহতায়ালার হক মনে করে, তবে জাহান্নামের আগুন তার জন্য হারাম করে দেওয়া হবে।’ (মুসনাদে আহমাদ ৪/২৬৮)
অন্য হাদিসে উবাদা ইবনে সামেত (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, আল্লাহতায়ালা বান্দার ওপর যে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আবশ্যক করে দিয়েছেন, যে ব্যক্তি তা গুরুত্ব সহকারে আদায় করবে কোনোরূপ অবহেলা ছাড়া, আল্লাহ সেই ব্যক্তির জন্য প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, তিনি তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। (সুনানে আবু দাউদ ১৪২০)
রমজানের রোজা পালন : রোজা কল্যাণকর ইবাদত। রমজানের রোজা ইহকাল ও পরকালে মানুষের জন্য কল্যাণ বয়ে আনে। আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য একদিন রোজা রাখবে, আল্লাহতায়ালা ওই একদিনের বিনিময়ে তার থেকে জাহান্নামকে সত্তর বছর (পরিমাণ পথ) দূরে রাখবেন। (সহিহ বুখারি ২৮৪০)
আবু সাঈদ খুদরি (রা.) আরও বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, নিশ্চয় আল্লাহতায়ালা রমজান মাসের প্রত্যেক দিনে ও রাতে অসংখ্য লোককে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়ে থাকেন।’ (মুসনাদে আহমাদ)
লেখক : ইসলামবিষয়ক গবেষক