রাজবাড়ী সদর উপজেলার বরাট ইউনিয়নের উড়াকান্দা এলাকার বাসিন্দা সাবিনা খাতুন। জ¦র-ঠা-ায় আক্রান্ত ১৩ মাস বয়সী শিশুসন্তান নিয়ে গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৯টায় জেলা সদর হাসপাতালের বহির্বিভাগে আসেন তিনি। দুপুর সাড়ে ১২টায়ও তিনি চিকিৎসকের কক্ষে প্রবেশ করতে পারেননি। সামনে আরও ২০ রোগী লাইনে দাঁড়িয়ে আছে বলে জানান। শুধু সাবিনা নয়, তার মতো শতাধিক নারী-পুরুষ অসুস্থ শিশু নিয়ে চিকিৎসকের কক্ষের সামনে অপেক্ষায়। এটা একদিনের চিত্র নয়, এ হাসপাতালের নিত্যদিনের চিত্র।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, বহুদিন ধরেই হাসপাতালে কোনো সিনিয়র কনসালটেন্ট শিশু চিকিৎসক নেই। রোমেনা আক্তার নামে একজন জুনিয়র কনসালটেন্ট দিয়ে হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনা করা হতো। কিন্তু তিনি হজ পালনে সৌদি আরব যাওয়ায় শিশু বিভাগ সংকটে পড়ে। পরে পাংশা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে একজন মেডিকেল অফিসার এনে হাসপাতালের কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এদিকে প্রতিদিনই হামে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বাড়ছে। গতকাল মঙ্গলবার নতুন আটজনসহ মোট ১৯ জন হামে আক্রান্ত শিশু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বলে জানা গেছে।
হাসপাতালের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালটিতে চিকিৎসকের মঞ্জুরিকৃত পদের সংখ্যা ৬৮টি। বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসক রয়েছেন ১৯ জন। ৪৯টি পদই শূন্য। অর্থাৎ, চিকিৎসকের ৭২ শতাংশ পদই শূন্য রয়েছে। সিনিয়র কনসালটেন্টের মোট পদ ১০টি। এর মধ্যে শুধু আর্থসার্জারি চিকিৎসক রয়েছেন। সিনিয়র কনসালটেন্ট শিশু, কার্ডিওলজি, মেডিসিন, সার্জারি, গাইনি, চর্ম ও যৌন, ফরেনসিক মেডিসিন, ইএনটি ও অ্যানেসথেসিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে কোনো চিকিৎসক নেই। এ ছাড়া জুনিয়র কনসালটেন্ট মেডিসিন, প্যাথলজি, আবাসিক মেডিকেল অফিসার, সহকারী সার্জনসহ ৪০টি চিকিৎসকের পদ শূন্য রয়েছে।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ১৫ দিনের ব্যবধানে কার্ডিওলজি বিভাগের দুজন চিকিৎসকে বদলি করা হয়। গত বছরের জানুয়ারিতে হাসপাতালের একমাত্র মেডিসিন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক শামীম আহসানকে বদলি করা হয়। এরপর মার্চ মাসে দুজন চক্ষু চিকিৎসকও বদিল হয়ে যান। কিন্তু আজ পর্যন্ত হাসপাতালে নতুন কোনো চিকিৎসকে পদায়ন করা হয়নি। জরুরি বিভাগের জন্য চিকিৎসকের কোনো পদ নেই। কিন্তু তিনজন চিকিৎসককে জরুরি বিভাগে পর্যায়ক্রমে দায়িত্ব পালন করতে হয়। সার্জারি, অ্যানেসথেসিয়াসহ অন্য বিভাগের চিকিৎসক দিয়ে মেডিসিন ওয়ার্ডের রোগীদের নিয়মিত রোগের চিকিৎসা প্রদান করা হচ্ছে। এ ছাড়া বহির্বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে জরুরি বিভাগের কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে বলে কর্মকর্তারা জানান।
গতকাল মঙ্গলবার হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, জেলার দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগীরা কাউন্টার থেকে টিকিট সংগ্রহ করে চিকিৎসক দেখাতে লাইনে দাঁড়িয়েছেন। শিশু চিকিৎসকের কক্ষের সামনে রোগীদের জটলা তৈরি হয়েছে। রোগীরা অভিভাবকরা আগে প্রবেশ করতে ধাক্কাধাক্কি করছেন। ছোট বাচ্চারা কান্নাকাটি করছে। মায়েরা তাদেরকে শান্ত রাখার চেষ্টা করছেন। মহিলা ওয়ার্ডের সামনে দীর্ঘ লাইনে নারীরা দাঁড়িয়ে আছেন।
সেবাপ্রত্যাশী সাবিনা খাতুন বলেন, ‘আমার স্বামী শ্রমিকের কাজ করেন। তিনি কাজে গিয়েছেন। দুই দিন ধরে বাচ্চার জ¦র। বাইরে কোনো ডাক্তারের কাছে দেখাতে গেলে কমপক্ষে ৬০০ টাকা ফি দিতে হয়। হাসপাতালে এসেছি একটু সাশ্রয়ের জন্য। সকাল ৯টার দিকে এসে কাউন্টার থেকে টিকিট নিয়ে এখানে লাইনে দাঁড়িয়েছি। শুনেছি ১১টার দিকে ডাক্তার এসেছেন। সাড়ে ১২টা বেজে গেছে, কিন্তু এখনও বাচ্চাকে দেখাতে পারিনি।’
বহির্বিভাগে রোগী দেখছিলেন মেডিকেল অফিসার উম্মে জোহরা। তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন তাকে ৫০০ রোগীকে পরামর্শ দিতে হয়। এখানে কমপক্ষে দুজন চিকিৎসকের প্রয়োজন। একজন রোগী দেখতে হলে কমপক্ষে ৫ মিনিট সময় দরকার। কিন্তু এখানে কোনো কোনো সময় ১ মিনিটেরও কম সময়ে রোগী দেখতে হচ্ছে। মাঝেমধ্যে একটু বিশ্রাম নেওয়ার প্রয়োজন হয়। সে সুযোগও হয় না। মানুষিকভাবে আমাকে খুবই চাপের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। অনেক সময় হাসপাতাল থেকে বাসায় যাওয়ার পর অসুস্থবোধ করি।’
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক শেখ মোহাম্মদ আব্দুল হান্নান বলেন, ‘একজন শিশু চিকিৎসক ছিল, তিনি হজ পালন করতে গিয়েছেন। পাংশা থেকে একজনকে এনে শিশু ওয়ার্ডের চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। চিকিৎসক সংকটের বিষয়টি বারবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।’
