ঝুঁকি নিয়ে সাঁকো পার, জনপ্রতিনিধিরা শুধু আশ্বাসই দেন, কাজ কিছুই হয় না

আপডেট : ১৩ মে ২০২৬, ১১:০৫ এএম

‘আমাদের কষ্ট দেখার কেউ নেই। সরকার বদলায়, কিন্তু আমাদের ভাগ্য বদলায় না। ভোট দেই, কিন্তু মরার পর লাশ নেওয়ারও ব্যবস্থা থাকে না’। কথাগুলো বলছিলেন মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার আশিদ্রোন ইউনিয়নের বিলাসের পাড় গ্রামের বাসিন্দা আফির উদ্দিন। বাঁশের বোঝা কাঁধে ঝুঁকিপূর্ণ সাঁকো পার হওয়ার সময় ক্ষোভ আর হতাশার সুরেই তিনি কথাগুলো বলেন।

শ্রীমঙ্গলের আশিদ্রোন ইউনিয়নের বিলাসের পাড় গ্রামে গিয়ে দেখা যায় এক নির্মম বাস্তবতা। গ্রামের মাঝখানে থাকা একটি খালের ওপর বাঁশ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে অস্থায়ী সাঁকো। সেটিই এখন গ্রামের এক পাশের শতাধিক মানুষের চলাচলের একমাত্র ভরসা। জীবনের ঝুঁকি নিয়েই প্রতিদিন এই সাঁকো পার হচ্ছে নারী, শিশু, বৃদ্ধ ও শিক্ষার্থীরা।

গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দারা জানান, মৃত মানুষকেও সম্মানের সঙ্গে নেওয়ার ব্যবস্থা নেই এখানে। অনেক সময় নৌকায় করে মরদেহ নিতে হয়। এর চেয়ে কষ্টের আর কী হতে পারে? জনপ্রতিনিধিরা শুধু আশ্বাস দেন, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে একটি স্থায়ী সেতুর দাবি জানানো হলেও এখনো কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। জনপ্রতিনিধিদের কাছ থেকে বারবার আশ্বাস মিললেও বাস্তবে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। ফলে বছরের পর বছর দুর্ভোগ নিয়েই বসবাস করতে হচ্ছে এলাকাবাসীকে।

সরেজমিন দেখা যায়, সরু বাঁশের তৈরি সাঁকোটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। নিচে খালের পানি, আর ওপরে কয়েকটি বাঁশের ওপর দাঁড়িয়ে আছে পুরো কাঠামো। কোথাও বাঁশ বেঁকে গেছে, কোথাও আবার নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। সামান্য অসতর্কতায় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তারপরও প্রয়োজনের তাগিদে প্রতিদিন এই পথই ব্যবহার করছে গ্রামের মানুষ।

গ্রামবাসীরা জানায়, নিজেদের উদ্যোগে চাঁদা তুলে বাঁশ কিনে সাঁকোটি নির্মাণ করা হয়েছে। তবে এটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। প্রতি বছর বর্ষার পর সাঁকো মেরামত করতে হয়। অনেক সময় বাঁশ ভেঙে দুর্ঘটনাও ঘটে। বর্ষাকালে দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়। অতিবৃষ্টিতে খালের পানি বৃদ্ধি পেলে দুই পাশের যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এতে শিশুদের স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়, কৃষকেরা উৎপাদিত ফসল বাজারে নিতে পারেন না, এমনকি রোগীদের হাসপাতালে নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে।

স্থানীয় বাসিন্দা দুরুদ মিয়া বলেন, এই সাঁকো দিয়েই প্রতিদিন চলাচল করতে হয়। ছোট ছোট বাচ্চারা স্কুলে যায়, বৃদ্ধ মানুষ পারাপার হয়। বর্ষাকালে খুব ভয় লাগে। চেয়ারম্যান, এমপি সবার কাছেই ব্রিজের দাবি জানিয়েছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত শুধু আশ্বাসই পেয়েছি।

বাসিন্দা আনোয়ারা বেগম দেশ রূপান্তরকে বলেন, রাতে কেউ অসুস্থ হলে সবচেয়ে বেশি আতঙ্কে থাকতে হয়। হাসপাতালে নেওয়ার মতো পরিস্থিতি থাকে না। গর্ভবতী নারীদের সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয়। বর্ষায় আমরা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই।

গত ৬ মে গ্রামের নাজিম উল্লাহ নামে এক ব্যক্তি মারা গেলে জানাজার জন্য তার মরদেহ নৌকায় করে অন্যপাড়ে নিতে হয়। ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। স্থানীয়দের ভাষ্য, একটি সেতুর অভাবে এমন মানবিক দুর্ভোগ অত্যন্ত বেদনাদায়ক।

নিহতের মেয়ে হাজেরা বেগম দেশ রূপান্তরকে বলেন, একটি ব্রিজ না থাকায় আমার বাবাকে জানাজার জন্য নৌকায় করে মসজিদে নিতে হয়েছে। পরে পারিবারিক কবরস্থানে দাফনও করতে পারিনি। আমার বাবার মতো আর যেন কাউকে এমন কষ্ট পেতে না হয়।

শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে এবং আমরা পরিদর্শন করেছি। ব্রিজের জন্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে অনুমোদন আসলেই  কাজ শুরু হবে।

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত