কোরআনে জ্ঞানার্জনের আহ্বান

আপডেট : ১৫ মে ২০২৬, ০৮:৫১ এএম

জ্ঞান অন্বেষণে ইসলাম প্রচণ্ড গুরুত্ব দিয়েছে। একে ইবাদতের মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছে। পবিত্র কোরআনের পাতায় পাতায় ছড়িয়ে আছে জ্ঞান অন্বেষণের আহ্বান। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন, ‘নিশ্চয় আসমানগুলো ও জমিনের সৃষ্টি এবং রাত-দিনের বিবর্তনের মধ্যে রয়েছে বিবেকসম্পন্নদের জন্য বহু নির্দশন। যারা আল্লাহকে স্মরণ করে দাঁড়িয়ে, বসে ও কাত হয়ে এবং আসমানগুলো ও জমিনের সৃষ্টি সম্পর্কে চিন্তা করে। (বলে) হে আমাদের রব, তুমি এসব অনর্থক সৃষ্টি করোনি। তুমি পবিত্র মহান। সুতরাং তুমি আমাদেরকে আগুনের আজাব থেকে রক্ষা করো।’ (সুরা আলে ইমরান ১৯০-১৯১) এই আয়াতসমূহে আল্লাহ প্রকৃতির দিকে মানুষের দৃষ্টি টেনেছেন। বলেছেন দেখো, ভাবো এবং বোঝার চেষ্টা করো। এই দেখা ও ভাবাই গবেষণার প্রথম পদক্ষেপ।

শুধু তাই নয়, আল্লাহতায়ালা কোরআনকেই গবেষণার উপজীব্য করে দিয়েছেন। সুরা সোয়াদের ২৯ নম্বর আয়াতে তিনি বলেছেন, এই কল্যাণময় কিতাব নাজিল করা হয়েছে যাতে মানুষ এর আয়াতগুলো নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে এবং জ্ঞানবানরা উপদেশ গ্রহণ করে। কেবল তেলাওয়াত বা মুখস্থ নয়, আল্লাহ চান মানুষ তার বাণীর গভীরে ডুব দিক, অর্থ খুঁজুক এবং জীবনের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করুক। এটাই তো প্রকৃত গবেষণার স্পিরিট। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আমি তোমার প্রতি নাজিল করেছি এক বরকতময় কিতাব, যাতে তারা এর আয়াতগুলো নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে এবং যাতে বুদ্ধিমানরা উপদেশ গ্রহণ করে।’ (সুরা সোয়াদ ২৯)

যে মানুষ চিন্তা করে আর যে করে না, এই দুজনকে আল্লাহ কখনো সমান মনে করেন না। সুরা জুমারের ৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ প্রশ্ন রেখেছেন, বলো তো, যারা জানে আর যারা জানে না তারা কি সমান?

আল্লাহর এই প্রশ্ন মানুষকে শুধু তাকাতে নয়, বরং চিন্তা করতে ও হৃদয় দিয়ে সত্য উপলব্ধি করতে আহ্বান জানায়। যে মানুষ চিন্তা করে না, প্রশ্ন করে না এবং অনুসন্ধান করে না, সে দৃষ্টিহীন। যদিও তার দুটি সুস্থ চোখ আছে। পক্ষান্তরে যে প্রতিনিয়ত জানতে চায়, বুঝতে চায় এবং সত্যের পেছনে ছুটে চলে। সে আলোকিত মানুষ।

প্রকৃতির জগতেও আল্লাহ গবেষকদের জন্য অফুরন্ত উপকরণ রেখে দিয়েছেন। সুরা নাহলের ১২ নম্বর আয়াতে তিনি বলেছেন যে রাত ও দিন, চাঁদ ও সূর্য এবং নক্ষত্ররাজি সবই তার বিধানে পরিচালিত এবং এতে বিবেকবান মানুষের জন্য রয়েছে অনেক নিদর্শন। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তিনি তোমাদের জন্য নিয়োজিত করেছেন রাত ও দিনকে, সূর্য ও চাঁদকে এবং তারকাগুলোও তার নির্দেশে নিয়োজিত। নিশ্চয় এতে অনেক নিদর্শন রয়েছে এমন কওমের জন্য যারা বুঝে।’ (সুরা নাহাল ১২)

একটি বীজ কীভাবে মহিরুহে পরিণত হয়, বৃষ্টির ফোঁটা কীভাবে মাটিকে সজীব করে, মানবদেহের অসংখ্য কোষ কীভাবে একটি সুশৃঙ্খল জগৎ গড়ে তোলে, এই রহস্যগুলো উন্মোচন করাই গবেষণা আর এই রহস্য জানার মধ্যেই লুকিয়ে আছে স্রষ্টাকে আরও গভীরভাবে চেনার পথ।

ইতিহাসের দিকে তাকালেই দেখা যায়, যে জাতি জ্ঞান ও গবেষণায় মনোযোগ দিয়েছে, সে জাতি কালের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। ইসলামের স্বর্ণযুগে ইবনে সিনা, আল-বিরুনি, ইবনে খালদুন প্রমুখের মতো মনীষীরা কোরআনের এই আহ্বানকে জীবনে ধারণ করেছিলেন বলেই তারা মুসলিম বিশ্বসহ সমগ্র মানবজাতির গর্ব হয়ে উঠেছিলেন।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বাণীও এই সত্যকে আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তিনি বলেছেন, ‘শিক্ষা নিয়ে গবেষণা করা জিহাদতুল্য।’ (আত-তারগিব ওয়াত-তারহিব) কথাটির গভীরতা একটু ভেবে দেখুন। জিহাদ ইসলামে এক মহান আমল, যাতে রয়েছে ত্যাগ, সংগ্রাম ও আত্মোৎসর্গের বিষয়। সেই মহান আমলের সঙ্গে গবেষণাকে তুলনা করা হয়েছে।

লেখক : শিক্ষক ও ইসলামবিষয়ক গবেষক, আসাম, ভারত

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত