প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আয়োজন ৩

বাংলাদেশের হস্তশিল্পের সম্ভাবনা ও সমস্যা

আপডেট : ২৫ মে ২০২৬, ০৭:৩৬ পিএম

হস্তশিল্প ও কুটির শিল্প ছিল আদি ও মধ্যযুগীয় বাংলার গুরুত্বপূর্ণ শিল্প যা কারিগরের নিজস্ব সৃজনশীলতা, ঐতিহ্য এবং স্থানীয় সহজলভ্য উপকরণের সমন্বয়ে তৈরি হয়ে থাকে। বাংলাদেশের হস্তশিল্প খাত দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনানুষ্ঠানিক শিল্প খাত যা গ্রামীণ কর্মসংস্থানের সংস্কৃতি সংরক্ষণে মুখ্য ভূমিকা পালন এবং রপ্তানি বৃদ্ধির ব্যাপক সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। এই শিল্প গ্রাম পর্যায়ে প্রান্তিক মানুষের ব্যাপক কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা ও বিশেষ করে নারীর ক্ষমতায়নকে উৎসাহিত করে। হস্তশিল্পের সাথে যুক্ত কর্মীদের প্রায় ৫৬ শতাংশ নারী, যা গ্রামীণ নারীর স্বাবলম্বী হওয়ার বড় পথ। সরকার ২০২৪-২৬ সালকে হস্তশিল্প বর্ষ হিসেবে ঘোষণা করে এই শিল্পের গুরুত্ব বাড়িয়েছে। বাংলাক্রাফট, বিসিক, এসএমই ফাউন্ডেশন ও পিকেএসএফ-এর মাধ্যমে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড এ খাতের সম্ভাবনা বৃদ্ধি করেছে। ব্যক্তি উদ্যোগে কিছু রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানও এ শিল্পকে অনেক দূরে এগিয়ে নিয়েছে। কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি ও পণ্যের মান উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকারি ও বেসরকারিভাবে মাঠপর্যায়ে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে রপ্তানিমুখী পণ্য উৎপাদনের দক্ষতা বৃদ্ধি কার্যক্রম অব্যাহত আছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে হস্তশিল্পের রপ্তানি বড় ভূমিকা পালন করে। হস্তশিল্প স্থানীয় কর্মসংস্থান তৈরিতে এবং দেশীয় প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করে অর্থনীতিতে সম্মুখ ও পশ্চাৎ-অন্বয়ী (Retrospective) সংযোগশিল্প হিসেবে কাজ করছে। চূড়ান্তভাবে উৎপাদিত শিল্পজাত পণ্য রপ্তানিতে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশ তীব্র প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হয়, প্রধান প্রতিযোগী দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম চীন, ভারত, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া। বাংলাদেশ থেকে হস্তশিল্পজাত পণ্য যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম, স্পেন, জাপানসহ বিশ্বের ৫০টি দেশে যায়। কভিড মহামারীর পর বিশ্বব্যাপী প্রাকৃতিক পণ্য ব্যবহারের আগ্রহ বৃদ্ধিতে বাংলাদেশি হস্তশিল্পের জন্য অনন্য সুযোগ সৃষ্টি হয়। বর্তমানে রপ্তানির ৬০ শতাংশের ক্রেতা ইউরোপ। হস্তশিল্পের বৈশ্বিক বাজার প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলারের। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী ২০৩২ সালের মধ্যে হস্তশিল্পের বিশ্ববাজারের আকার হবে প্রায় আড়াই ট্রিলিয়ন ডলারের। বিশাল এ বাজারে বাংলাদেশের অংশীদারত্ব ১ শতাংশেরও কম। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ হস্তশিল্প রপ্তানির ক্ষেত্রে অনেক উন্নত দেশ কর্তৃক প্রদত্ত অগ্রাধিকারমূলক সুবিধাও ভোগ করে থাকে।

হস্তশিল্পজাত পণ্যগুলো পরিবেশবান্ধব প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে তৈরি। দেশীয় কাঁচামাল ব্যবহারের ফলে হস্তশিল্পে প্রায় ৮০ শতাংশ মূল্য সংযোজন সম্ভব, যা দেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখতে পারে। এমন সম্ভাবনাময় যে শিল্প খাত, অন্যান্য দেশের সাথে তুলনা করলে দেখা যায় বিভিন্ন সমস্যার ও প্রতিবন্ধকতার কারণে বেশি দূর এগোতে পারেনি। প্রায় ৮২ শতাংশের বেশি হস্তশিল্প-উদ্যোক্তা মূলধন বা অর্থের সংকটে ভুগছেন যা ব্যবসা প্রসারের অন্তরায়। হস্তশিল্প খাতে প্রয়োজনীয় ব্যাংকঋণ পাওয়া যায় না। এ কারণে উদ্যোক্তারা বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) থেকে চড়া সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হন। বিবিএসের জরিপে দেখা গেছে, হস্তশিল্প প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ব্যবসা নিবন্ধন বা ট্রেড লাইসেন্স রয়েছে মাত্র ৪ শতাংশের। ব্যাংকঋণ পেতে হলে ট্রেড লাইসেন্স থাকতে হয়। এনজিওর ঋণে সুদের হার অনেক বেশি থাকে, যা ব্যবসার খরচ আরও বাড়িয়ে দেয়। হস্তশিল্পের বড় চ্যালেঞ্জ পরিবর্তিত চাহিদা অনুযায়ী নতুন ও মানসম্মত পণ্য উৎপাদন করা। এই খাতের রপ্তানি বাজার বাড়াতে হলে মানসম্মত পণ্য উৎপাদন, উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ প্রদান ও তাদের আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং মাধ্যমে যুক্ত করা প্রয়োজন। এ ছাড়া যেসব প্রতিষ্ঠান হস্তশিল্প নিয়ে কাজ করছে, তাদের মধ্যেও সমন্বয়হীনতা, বিপণনব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক বাজার সম্বন্ধে সঠিক ধারণার অভাব রয়েছে ফলে ব্যবসায়িক সুফল আসছে না। প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের অভাবে নকশার মানোন্নয়ন ব্যাহতসহ মানসম্মত পণ্য ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার না করার কারণে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকা ক্রমশ কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। কাঁচামালের সরবরাহ কমে যাওয়াও বর্তমানে এক বড় সমস্যা।

হস্তশিল্পজাত পণ্যে বৈচিত্র্যের সুযোগ থাকলেও এ খাতে অল্প কিছু পণ্যের প্রাধান্যই দেখা যায়। বিবিএসের জরিপ বলছে, এ খাতের বড় অংশ মূলত বাঁশ ও বেতনির্ভর। দেশে ৩২ হাজার ২২৪টি বাঁশ ও বেতশিল্প প্রতিষ্ঠান রয়েছে; যা মোট হস্তশিল্প প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৪৪ শতাংশ। এর পরে রয়েছে মৃৎপাত্র, টেপাপুতুল, নকশিকাঁথা, কুরুশকাঁটা প্রভৃতি পণ্য। তবে প্রতিষ্ঠান কম হলেও পণ্যের মূল্যমানের দিক থেকে এগিয়ে রয়েছে হাতে বোনা জামদানি, কাঠের কারুপণ্য, শতরঞ্জি ও মৃৎপাত্র। পণ্যের বৈচিত্র্য অনেক রয়েছে, তবে মানসম্মত পণ্যের সংখ্যা কম হওয়ায় সব পণ্যই রপ্তানিযোগ্য নয়। এজন্য হস্তশিল্পের উদ্যোক্তাদের যথাযথ প্রযুক্তি সহায়তা ও প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন।

হস্তশিল্পের জন্য কেন্দ্রীয়ভাবে একটি গবেষণা, নকশা কেন্দ্র প্রণয়ন ও প্রদর্শনী কেন্দ্র স্থাপনের জন্য উদ্যোক্তারা দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছেন। তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯৯ সালে তৎকালীন সরকার হস্তশিল্পের জন্য একটি নকশা ও গবেষণাকেন্দ্র স্থাপনের ঘোষণা দিলেও এখন পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। এ কারণে কেন্দ্রীয়ভাবে এসব পণ্যের তদারকি, নকশার মানোন্নয়ন ও বৈচিত্র্য আনা সম্ভব হচ্ছে না। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দক্ষ ক্রাফট্ ডিজাইনারদের সমন্বয়ে গবেষণা ও নকশা কেন্দ্র স্থাপন তাই সময়ের দাবি।

হস্তশিল্প খাতে অনেক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সরকারের মনোযোগের অভাবে সব সম্ভাবনাই মুখ থুবড়ে পড়েছে। নগদ সহায়তা ২০ শতাংশ থেকে কমে ৬ শতাংশে নেমেছে। আগামীতে হয়তো তাও থাকবে না। অন্যদিকে, দিনদিন কমে আসছে প্রয়োজনীয় লোকবল ও কাঁচামালের সরবরাহ। ইতিমধ্যে পেশা পরিবর্তন করেছে অনেক শ্রমিক। সহজলভ্য বিদেশি পণ্য ও প্লাস্টিক পণ্যের বাজার দখলের প্রতিযোগিতায় দেশীয় হস্তশিল্পের বাজার ছোট হয়ে আসছে।

অপরিকল্পিত আবাসনের কারণে সারা দেশে বাঁশ, বেত, পাটিগাছ ও শণ চাষ আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। কাঁচামালের দাম বেড়ে গেছে। সরকারের পক্ষ থেকে এসব কাঁচামাল চাষের জন্য উদ্যোক্তাদের খাসজমি বরাদ্দ দেওয়া যেতে পারে। কাঁচামাল স্থানীয়ভাবে আবার চাষ করা সম্ভব হলে পণ্যের উৎপাদন খরচ কমে আসবে। রপ্তানি বাড়বে।

উন্নয়ন এবং নীতিসহায়তা ছাড়া এ খাতের সম্ভাবনাকে ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না। সহজ শর্তে ঋণ, বাজার সম্প্রসারণ, ডিজিটাল মার্কেটপ্লেস, নকশাকেন্দ্র স্থাপন, প্রশিক্ষণ ও রপ্তানি সহজ করাসহ প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করলে ভবিষ্যতে এ খাত বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অংশীদারত্ব এ খাতকে আরও সংগঠিত, টেকসই ও আন্তর্জাতিকভাবে মানসম্পন্ন শিল্পে রূপান্তরিত করবে।

লেখক : চারু ও কারুশিল্পী

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত