প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আয়োজন ৩

স্রোতস্বিনীর দেশে সংগীত হারানোর সূচক

আপডেট : ২৫ মে ২০২৬, ০৫:০৬ পিএম

নদীমাতৃক বাংলাদেশের সভ্যতা, সংস্কৃতি, যোগাযোগ, উৎপাদন, সবই যখন নদীনির্ভর; তখন শিল্প, কলা, সাহিত্য ও সংগীতও এর প্রভাব এড়াবে কীভাবে? লালনগীতি থেকে রবীন্দ্রসংগীত, কাজী নজরুল ইসলাম থেকে সলিল চৌধুরী—কে না পড়েছেন নদীর প্রেমে?

সেই আলোচনা পণ্ডিতদের জন্য রেখে যদি স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের কথাই ধরি, স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মের সঙ্গেই জড়িয়ে রয়েছে নদীময় সংগীত। যেমন, একাত্তরের আগস্টের প্রথম দিন নিউ ইয়র্কের মেডিসন স্কয়ারে যে ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ আয়োজিত হয়েছিল, সেখানে বিশ্বখ্যাত মার্কিন গায়ক বব ডিলান পাঁচটি গান গেয়েছিলেন। কিন্তু পরিকল্পনায় থাকলেও সময়ের অভাবে ‘নদীমাতৃক’ দেশের স্বাধীনতার সপক্ষে তার ‘নদীময়’ গানটি গাইতে পারেননি।

বব ডিলানের শেকড় মিনেসোটা রাজ্যে; জন্মেছিলেন ডুলুথ শহরে বেড়ে উঠেছেন হিবিং শহরে। পঁচাত্তর কিলোমিটার দূরবর্তী ডুলুথ ও হিবিং শহরকে বেঁধে রেখেছে সেন্ট লুইস নদী ও এর উপনদী-শাখানদীগুলো। এই দুই শহরকে নিয়ে তার বিখ্যাত ‘ওয়াচিং দ্য রিভার ফ্লো’ গানটির কয়েকটি চরণ বাংলা করে দিচ্ছি : ‘যদি ফিরে যাওয়া যেত আমার সেই শহরে/ এই পুরাতন নদীর বালুভরা তীর ছেড়ে/ যেখানে সূর্য ডোবে চিমনির শীর্ষ ছুঁয়ে/ যেখানে হাতে হাত রেখে পাশে বসে প্রিয়ে/ পাখা থাকলে আমি উড়তাম, গন্তব্য নয় অজানা/ এখানেও আমি সন্তুষ্ট অদ্যাবধি, নয়ন সমুখে বহে নদী নিরবধি’। কথা হচ্ছে, ডিলান যে শহরেই ফিরে যান না কেন, নয়ন সমুখে বহমান থাকবে সেন্ট লুইস।

ম্যাডিসন স্কয়ারের ওই কনসার্টের অন্যতম প্রধান আয়োজক জর্জ হ্যারিসন কেবল ‘বাংলাদেশ বাংলাদেশ’ গানটিই গাননি; পরবর্তী সময়ে উপমহাদেশীয় সংস্কৃতি ও ধর্মে মগ্ন হয়েছিলেন। এও চেয়েছিলেন মৃত্যুর পর তার চিতাভস্ম যেন গঙ্গা নদীতে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এ নিয়ে গেয়েছিলেন ‘আই অ্যাম গোয়িং ডাউন টু দ্য রিভার’।

নদীর দেশ বাংলাদেশের পক্ষে একাত্তরে সোচ্চার ছিলেন লতা মঙ্গেশকরও। তাকে অনেকে আখ্যা দেন ‘সুরের সরস্বতী’ হিসেবে। বাস্তবেও তিনি জন্মেছিলেন সরস্বতী নদীর তীরে, ভারতের মধ্যপ্রদেশের ইন্দোর শহরে। তার গানে নদী এসেছিল কীভাবে? ৩৬টি ভাষায় যার ৫০ হাজারের বেশি গান রেকর্ড হয়েছে বলে জনশ্রুতি রয়েছে, তার ক্ষেত্রে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে যাওয়া বাতুলতা ছাড়া আর কী হতে পারে?

কিন্তু লতার বাংলা গানগুলো শুনলেই নদীর প্রভাব স্পষ্ট ধরা যায়। যেমন, ‘নিঝুম সন্ধ্যায় পান্থ পাখিরা বুঝিবা পথ ভুলে যায়’ গানটি বিশেষত গোধূলিবেলায় নদীর পাড়ে গেলে কোন বাঙালির মনে গুঞ্জরিত হবে না?

হিন্দিতেও লতা মঙ্গেশকর যে ‘মানো তো ম্যাঁয় গঙ্গা মা হুঁ, না মানো তো বহতা পানি’ (মানলে গঙ্গা সবার মা, না মানলে প্রবাহ মাত্র) গান গেয়েছেন, সেটা শুনলে কারও যদি লালন সাঁইজির ‘গঙ্গায় গেলে গঙ্গার জল হয়, গর্তে তারে কূপ জল কয়’ গানটির কথা মনে পড়ে, দোষ দেওয়া যাবে? বস্তুত, লতাকে যে ভারতের সীমানা ছাড়িয়ে বাংলাদেশেরও প্রত্যন্ত গ্রামে আপন করে তুলেছে, হতে পারে এর প্রধান কারণ তার সংগীতে নদীর বহমানতাই।

লতা মঙ্গেশকরের একটি গান ‘নদীয়া কিনারে হিরায়ি আয়ি কঙ্গনা, এইসে উলাঝ গ্যায়ে আনাড়ি সাজনা’। বাংলায়, নদীর পাড়ে গিয়ে কঙ্কন হারিয়ে এসেছি, আনাড়ি প্রেমিক তাতেই আটকে গেছে। সংগীত ততটা বুঝি নাা; কিন্তু ব্রহ্মপুত্র, গঙ্গা অববাহিকাজুড়ে হেলায় ফেরে রাখা লতা মঙ্গেশকরের সুরের কঙ্কনই হয়তো কোটি কোটি বাঙালি আনাড়ি প্রেমিক আটকে থাকবে অনাগত দিনগুলোতেও।

লতার মতোই আরেকজন শিল্পীর প্রভাবও বাংলা গানের রাজনৈতিক সীমানায় আটকে থাকেননি; তিনি ভূপেন হাজারিকা। বিশেষত ব্রহ্মপুত্র ও গঙ্গা নিয়ে তার গানগুলোর জনপ্রিয়তা প্রশ্নাতীত।

ভূপেনের বিখ্যাত গান ‘ও গঙ্গা বইছ কেন’ মূলত রচিত হয়েছিল ব্রহ্মপুত্রকে নিয়ে: ‘বুঢ়া লুইত তুই বুআ কিঅ’। হিন্দি ও বাংলায় ভাষান্তরিত হওয়ার সময় বুঢ়া লুইতের জায়গায় শুধু গঙ্গা প্রতিস্থাপিত হয়েছে। প্রসঙ্গত, ব্রহ্মপুত্রের ওপরের অংশের অহমীয়া নাম লুইত বা বুঢ়া লুইত।

‘মহাবাহু ব্রহ্মপুত্র’ গানটি যদিও বাংলায় ভাষান্তরিত হয়নি, সেখানে বলেছেন, ব্রহ্মপুত্র কীভাবে যুগ যুগ ধরে নানা ভাষা, সংস্কৃতি, জাতি ও ধর্মের ‘মহামিলনের তীর্থ’ হয়ে এবং ‘সমন্বয়ের অর্থ’ প্রকাশ করে আসছে। আর তার ‘গঙ্গা আমার মা, পদ্মা আমার মা/ ও আমার দুই চোখে দুই জলের ধারা মেঘনা যমুনা’ গানটি তো রাজনৈতিক সীমারেখায় বিচ্ছিন্ন বাংলা ভাষার চার সাংস্কৃতিক অংশকেই সংযুক্ত করেছে; বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও আসাম।

পরবর্তী সময়ে ভূপেন হাজারিকা যে বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন, সেই দলের রাজনৈতিক দর্শনের সঙ্গে মিল নেই; কিন্তু ভূপেন হাজারিকাই গেয়েছিলেন ‘পদ্মা নদীর ধুমুহাত পরি কত শতজন আহিলে/ লুইতর দুয়ো পারে কতনা অতিথি আদরিলে’। অহমিয়া ভাষায় ‘ধুমুহা’ অর্থ ঝড় বা দুর্যোগ। বোঝাই যাচ্ছে, পদ্মপাড়ের দুর্যোগ কবলিত মানুষের লুইতের দুই পাড়ে সাদর বসতির কথা বলা হচ্ছে।

ব্রহ্মপুত্র বা বরাক নদী যেমন আসাম হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশে করেছে, তেমনই ত্রিপুরা থেকে বাংলাদেশে বয়ে আসা গোমতী পাড়ের শচীন দেব বর্মণ বাংলা ভাটিয়ালি গানের ধারায় যোগ করেছেন নতুন নতুন মাত্রা।

বস্তুত ‘ভাটিয়ালি’ শব্দটির মধ্যেই নিহিত রয়েছে ‘ভাটি’ কথাটি; এর অর্থ ইংরেজিতে ‘ডাউন স্ট্রিম’। ভারতীয় উপমহাদেশের তিন প্রধান নদী গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, বরাক বা মেঘনার অভিন্ন ভাটি বা ডাউন স্ট্রিম হচ্ছে বাংলাদেশ। বিশ্বে আরও ব-দ্বীপ নিশ্চয়ই রয়েছে; কিন্তু সেগুলো যে কোনো একটি নদীর ভাটি। বাংলাদেশের মতো তিন প্রধান নদী বুকে ধারণ করে নেই আর একটিও। প্রাকৃতিক এই বৈশিষ্ট্যই তাই জন্ম দিয়েছিল ভাটিয়ালি নামে অনন্য সংগীত ধারা।

শচীন দেব বর্মণ বলতেন, ভাটিয়ালি গান তার কাছে বিশেষ অর্থ নিয়ে ধরা দেয়। এর গীতি ও গায়কি, এর ঐক্য ও স্বাতন্ত্র্য, এর আবেগ ও উল্লাস বাংলার নদীর কথা মনে করিয়ে দেয়।

মেঘনা অববাহিকারই আরেক সন্তান হেমাঙ্গ বিশ্বাস আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেছেন, বাংলার খোলা প্রকৃতি ও এর মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া নদী মাঝির মধ্যে যে দার্শনিকতার জন্ম দেয়, সেটারই সংগীতময় রূপ ভাটিয়ালি গান।

অবশ্য, বব ডিলান থেকে ভূপেন হাজারিকা, লতা মঙ্গেশকর থেকে শচীন দেব বর্মণ, বাংলাদেশের নদী ও সংগীতের এই সম্পর্ক সবই গত শতকের। পরবর্তী সময়ে এসে আমরা দেখি, অ্যান্ড্রু কিশোরের মতো আধুনিক বাংলা গানের আইকনদের কাছে নদী হয়ে উঠেছে নাগরিক প্রেমের মাধ্যম।

২০২০ সালের জুলাইতে অ্যান্ড্রু কিশোরের প্রয়াণের পর তার ‘নদীময় দশ গান’ নিয়ে লিখেছিলাম। এর মধ্যে রয়েছে : ঐ নদী চায় বারে বারে সাগর ডাকুক/ তরু চায় লতা তারে জড়িয়ে রাখুক (সবাই তো ভালোবাসা চায়/ সারেন্ডার)। সাগরেরই টানে যেমন নদী ছুটে যায়/ তেমনি করে আমার এ মন তোমায় পেতে চায় (আমার বুকের মধ্যখানে/ নয়নের আলো)। চাঁদের সাথে আমি দেব না তোমার তুলনা/ নদীর সাথে আমি দেব না তোমার তুলনা/ তুমি চাঁদ হতে যদি দূরেই চলে যেতে/ তুমি নদী হতে যদি দূরেই চলে যেতে (আশীর্বাদ)।

বাংলা গানের গত পাঁচ দশকের পরিক্রমায় প্রাকৃতিক প্রণোদনা থেকে নদী যে নাগরিক প্রেমের অংশ হয়ে উঠল, এর নেপথ্যে অবধারিতভাবেই রয়েছে খোদ নদীগুলোর ক্রমাবনতি। এটাই সম্ভবত অজান্তেই মূর্ত হয়ে উঠেছিল লাকী আখন্দের জনপ্রিয় গাটিনটিতে : ‘চলো না ঘুরে আসি অজানাতে/ যেখানে নদী এসে থেমে গেছে’। বিটিভিতে গানটি যদিও প্রথম গেয়েছিলেন তারই শিষ্যসম অনুজ হ্যাপী আখন্দ, হ্যাপীর মৃত্যুর পর গানটি লাকীর কণ্ঠেই শোভা পেত। লক্ষণীয়, গানটি রচিত হয় পঁচাত্তর সালে; তখনই নদীর থেমে যাওয়ার কথা ভাবছেন একজন শিল্পী! নদী থেমে গেলে এর রূপ, রস, গন্ধে উৎসারিত সংগীতও তখন থেমে যেতে থাকে।

এখন চারপাশে তাকালে দেখা যায়, অনলাইন ও অফলাইনে সংগীতের পরিসর বেড়েছে বটে, সেগুলোতে নদী আর নেই! এ নিয়ে গবেষণাও যেন দুর্লভ। অথচ সংগীত হতে নদীর সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যাওয়া বাংলা গানের সুরের সূচক। বিপরীতভাবে, সংগীতও হতে পারে আমাদের নদী হারানোর সূচক। প্রশ্ন জাগে, স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে কতজন শিল্পী বব ডিলানের মতো তার শেকড়ের নদী নিয়ে গান বেঁধেছেন?

ইতালীয় শিল্পী জিদিতা ভ্যান্দ্রামে ইউরোপে ‘নদীর গান’ নিয়ে গবেষণা করেন। এখন আগ্রহী বাংলাদেশের ভাটিয়ালি নিয়ে। গত বছর অক্টোবরে রিভারাইন পিপলের অফিসে এসেছিলেন আমাদের সঙ্গে কথা বলতে। বাংলাদেশে আসার আগে তার বিস্ময় ছিল একটি জনপদে কীভাবে নদীভিত্তিক সংগীতেরই ধারা গড়ে উঠতে পারে! আর এসে, আরও বিস্মিত হয়েছেন যে সেই গান আমরা কীভাবে হারিয়ে যেতে দিচ্ছি।

আমি বলেছিলাম, শুধু ভাটিয়ালি নয়; গোটা বিশ্বে যার নজির নেই, নদীর ক্রীড়া নৌকা বাইচের সংগীত ‘সারি গান’ আমরা ইতিমধ্যেই সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলেছি। খোদ নদীকে যারা হারিয়ে যেতে দেয়, নদীজাত সংগীতে তাদের কী আসে যায়!

লেখক : নদী গবেষক; মহাসচিব, রিভারাইন পিপল

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত