লিচুর রঙে রঙিন ঈশ্বরদী

আপডেট : ০৩ জুন ২০২৬, ০৬:৫৪ পিএম

লিচুর রাজধানীখ্যাত ঈশ্বরদী এখন পাকা লিচুর রঙে রঙিন। ঈশ্বরদী পৌরসভাসহ সাতটি ইউনিয়নের যেদিকেই তাকানো যায়, চোখে পড়ে লাল টসটসে পাকা লিচুর সমারোহ। গত বছরের তুলনায় এ বছর ঈশ্বরদীতে লিচুর বাম্পার ফলন হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়া ও সময়মতো বৃষ্টিপাতের কারণে গাছে প্রচুর মুকুল আসে এবং অধিকাংশই টিকে থাকে। ফলে চাষিরা যেমন ভালো ফলন পেয়েছেন, তেমনি বাজারেও পাচ্ছেন সন্তোষজনক দাম। তবে বর্ষা মৌসুম হওয়ায় ঝড়-বৃষ্টির আশঙ্কা এখনও রয়েই গেছে।

গত বছর বৈরী আবহাওয়ার কারণে লিচুর ফলন আশানুরূপ না হলেও এ বছর সেই ক্ষতি পুষিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। বর্তমানে লিচু ঘিরে জমজমাট হয়ে উঠেছে ঈশ্বরদীর অর্থনীতি।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে ঈশ্বরদীতে প্রায় ৭০০ কোটি টাকার লিচু বিক্রির সম্ভাবনা রয়েছে। অতীতে এ অঞ্চলে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার লিচু বিক্রি হয়েছে। প্রতিবছরই কৃষকরা অন্যান্য ফসলের আবাদ কমিয়ে লিচু চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। এ বছর ৩ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে লিচুর আবাদ হয়েছে। গত বছর যেখানে মাত্র ৩০ শতাংশ গাছে লিচু ধরেছিল, সেখানে এ বছর প্রায় ৯০ শতাংশ গাছে প্রচুর মুকুল আসে। মুকুল ও গুটি অবস্থায় অনুকূল আবহাওয়া থাকায় ফলনও হয়েছে বাম্পার।

সম্প্রতি উপজেলার বিভিন্ন লিচুবাগান ঘুরে দেখা গেছে, বাতাসে দুলছে থোকায় থোকায় পাকা লাল লিচু। প্রতিটি বাগান যেন লাল রঙের উৎসবে মেতে উঠেছে।

লিচু চাষের কারণে অনেকের নামের সঙ্গে ‘লিচু’ শব্দটি যুক্ত হয়েছে। তাঁদেরই একজন আব্দুল জলিল কিতাব মণ্ডল, যিনি ‘লিচু কিতাব’ নামে পরিচিত। লিচু চাষে বিশেষ অবদানের জন্য তিনি জাতীয় কৃষি পদকও পেয়েছেন।

লিচু কিতাব জানান, অনুকূল আবহাওয়ার কারণে এবার বাম্পার ফলন হয়েছে। দামও ভালো পাওয়া যাচ্ছে। গত বছরের ক্ষতি অনেকটাই পুষিয়ে যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। তাঁর তিনটি বাগানে প্রায় ২০০টি লিচুগাছ রয়েছে। গত বছর প্রায় ৫ লাখ টাকার লিচু বিক্রি করলেও এ বছর প্রায় ২০ লাখ টাকার লিচু বিক্রির আশা করছেন। তাঁর বাগানের লিচু ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও মালয়েশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও ঈশ্বরদীর লিচুর সুনাম রয়েছে।

কোলেরকান্দি এলাকার লিচুচাষি আহমদুল্লাহ মিলন জানান, গত বছরের তুলনায় এ বছর তাঁর বাগানে অনেক বেশি লিচু হয়েছে। ফলন বেশি হওয়ায় দাম কিছুটা কমলেও লাভের পরিমাণ বেশি হবে। গত বছর প্রতি হাজার লিচু ৪ থেকে ৬ হাজার টাকায় বিক্রি হলেও এবার বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকায়। তবে ফলন বেশি হওয়ায় কৃষকরা সন্তুষ্ট।

মানিকনগর গ্রামের লিচুচাষি আব্দুল হক জানান, গত তিন বছর নানা কারণে লিচু চাষিরা সংকটে ছিলেন। তবে এ বছর পরিস্থিতি অনেক ভালো। তাঁর পাঁচটি বাগানে প্রায় ২০০টি লিচুগাছ রয়েছে। তিনি প্রায় ২০ লাখ লিচু বিক্রির আশা করছেন।

চরমিরকামারী গ্রামের চাষি হাবিবুল ইসলাম মালিথা জানান, তাঁর বাগানেও এবার বাম্পার ফলন হয়েছে। লিচু চাষই তাঁর পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস। ফলে এ বছর ভালো আয় হওয়ার আশা করছেন তিনি।

ঈশ্বরদীতে আবাদ হওয়া লিচুর মধ্যে আঁটি, চায়না-৩, চায়না-৪, বেদানা ও বোম্বাই জাত উল্লেখযোগ্য। সাহাপুর, ছলিমপুর, দাশুড়িয়া, মিরকামারী, জয়নগর, মানিকনগর, ভাড়ইমারী, বক্তারপুর, জগন্নাথপুর ও শেখেরদাইড়সহ প্রায় সব এলাকাতেই উর্বর মাটির কারণে উন্নতমানের ও সুস্বাদু লিচু উৎপাদিত হয়। এ কারণে দেশের পাশাপাশি বিদেশি ক্রেতাদের কাছেও ঈশ্বরদীর লিচুর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।

মৌসুমের শুরুতেই দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ব্যবসায়ীরা এসে আগাম বাগান কিনে পরিচর্যা করেন। ফলে অধিকাংশ বাগানেই ভালো ফলন হয়েছে। বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, প্রায় প্রতিটি বাড়ির আঙিনায় লিচুগাছ রয়েছে—যা এলাকার সবুজ পরিবেশ আরও সমৃদ্ধ করেছে।

লিচু কিনতে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, ভোলা ও বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হাজার হাজার পাইকার ও ব্যবসায়ী ঈশ্বরদীতে ভিড় করছেন। তাঁরা বিভিন্ন আবাসিক হোটেল ও চাষিদের বাড়িতে অবস্থান করে লিচু সংগ্রহ করছেন।

লিচু কেনাবেচার জন্য জয়নগর শিমুলতলা, বোর্ড অফিস মোড়, দাশুড়িয়া ও আওতাপাড়াসহ বিভিন্ন স্থানে মৌসুমি হাট বসে। প্রতিদিন ভোর ৫টা থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত চলে জমজমাট বেচাকেনা। ক্রেতা-বিক্রেতার উপস্থিতিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।

ঈশ্বরদী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল মমিন বলেন, অনুকূল আবহাওয়ার কারণে এবার লিচুর বাম্পার ফলন হয়েছে। গত বছরের তুলনায় প্রায় ২০০ হেক্টর বেশি জমিতে লিচুর আবাদ হয়েছে। এ মৌসুমে প্রায় সাড়ে ৭ লাখ গাছের মধ্যে ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ গাছে লিচু উৎপাদন হয়েছে। প্রায় ১২ হাজার কৃষক ৩ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে লিচুর আবাদ করে প্রায় ৭০০ কোটি টাকার উৎপাদনের আশা করছেন। শেষ পর্যন্ত এ অঙ্ক আরও বাড়তে পারে।

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত