ভেজাল পাটবীজ বিএডিসির কুষ্টিয়া জোন পেল কীভাবে

আপডেট : ০৮ জুন ২০২৬, ০৩:২২ এএম

বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন বিএডিসির কুষ্টিয়া জোনের কৃষি প্রণোাদনা কার্যক্রমের আওতায় পাটবীজ সংগ্রহ ও বিতরণের ক্ষেত্রে ব্যাপক অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে। নিম্নমানের বীজ সংগ্রহ করে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে একটি চক্র। প্রতিষ্ঠানটির নিম্নমানের মেয়াদোত্তীর্ণ ও ভেজাল বীজ ব্যবহার করে প্রতারিত ও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন চাষিরা। এখন মাঠে চারা গজাচ্ছে না। সরকারেরই একটি বিভাগ বীজগুলো ভেজাল ও নিম্নমানের বলে বাতিল করেছে। কিন্তু তারপরও অভিযোগকেও আমলে নিচ্ছেন না বিএডিসি সংশ্লিষ্টরা।

বিএডিসি পাটবীজ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, চলতি অর্থবছরে কৃষি পুনর্বাসন সহায়তা খাতের আওতায় পাট উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় ১৮০ টন পাটবীজ সংগ্রহে কৃষি মন্ত্রণালয় বরাদ্দ দেয় ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা। যদিও কুষ্টিয়া জোনের সংশ্লিষ্ট পাটবীজ বিভাগের দাবি, তারা এ বছর ২৮৩ টন পাটবীজ সংগ্রহ করেছে; সেগুলো দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহও করেছে। কিন্তু এই বীজগুলো ভেজাল, মানহীন বলে অভিযোগ উঠেছে। সরবরাহকৃত বীজের মধ্যে প্রায় সাড়ে ২৪ টন বীজ এরই মধ্যে ফরিদপুর পাটবীজ বিভাগ বাতিল ঘোষণা করে কুষ্টিয়া জোনের পাটবীজ গুদামে ফেরত পাঠিয়েছে। সেখানকার বিপণন বিভাগের উপপরিচালক সৈয়দ কামরুল ইসলাম এ সংক্রান্ত চিঠিতে ফেরত পাঠানোর কারণ হিসেবে এসব বীজের কাক্সিক্ষত জার্মিনেশন বা চারা না গজানোর কথা উল্লেখ করেছেন। ওই চিঠির উল্লেখিত অভিযোগ মানতে নারাজ কুষ্টিয়া জোনের পাটবীজ বিভাগের উপপরিচালক মনিরা খাতুন। তিনি দাবি করেন বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ডিল করছে।

ওই চিঠির তথ্য সূত্র ধরে বিএডিসির পাটবীজ বিভাগের এসব বীজের মান নিয়ে সরেজমিন অনুসন্ধানে এসব বীজ ক্রয়, সংগ্রহ, প্রক্রিয়াকরণ ও বিপণনে নানা অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে। এ বছর সরকারি প্রণোদনার পাটবীজ মাঠে রোপণের পর তা থেকে চারা গজায়নি বলে অভিযোগ করেছেন চাষিরা।

নিয়মানুযায়ী তালিকাভুক্ত উদ্যোক্ত চাষিদের নানাবিধ প্রণোদনা, পরামর্শ ও প্রত্যক্ষ সহযোগিতার মাধ্যমে উৎপাদিত বীজ সরকারি প্রত্যয়ন এজেন্সির মাধ্যমে নমুনা পরীক্ষা করে গুণগত মান নিশ্চিত হয়ে প্রক্রিয়াজাত ও বিপণন করার কথা। কিন্তু মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার চিৎলায় অবস্থিত কুষ্টিয়া জোনের পাটবীজ গুদামে এ সবের কিছুই মানা হয়নি বলে অভিয়োগ উঠেছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে গাংনী উপজেলার উদ্যোক্তা পাটবীজ চাষিরা অভিযোগ করে জানান, বিএডিসি এ বছর ২৮৩ টন পাটবীজ ক্রয় করার দাবি করলেও এগুলো কোথা থেকে, কীভাবে সংগ্রহ করা হয়েছে তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। বাস্তবে কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, ঝিনাইদহ, মাগুড়াসহ আশপাশের ১০ জেলায় ৫০ টন পাটবীজ উৎপাদন হয়নি। তাহলে এত পরিমাণ বীজ কোথা থেকে, কোন মানদ-ে ক্রয় করা হয়েছে?

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মেহেরপুর জেলা বীজ প্রত্যায়ন কর্মকর্তা মো. আলমগীর হোসেন জানান, কুষ্টিয়া পাটবীজ জোনের আওতায় বিএডিসির তালিকাভুক্ত উদ্যোক্তা চাষিসহ নিজস্ব খামারের প্রায় ৭৫ হেক্টর জমি থেকে উৎপাদিত ৫৬ টন পাটবীজের প্রত্যায়ন ট্যাগ দেওয়া হয়েছে।

চাষিদের অভিযোগ, বিএডিসির কতিপয় অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজসে সিংহভাগ বীজ পাশর্^বর্তী ভারত থেকে হ্যাচারি ফিড হিসেবে অল্পমূল্যে আমদানি করা নিম্নমানে বীজ গুদামে সরবরাহ করে টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। সেগুলো প্যাকেটজাত করে বিভিন্নভাবে চাষিদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে।   

কুষ্টিয়া সদর উপজেলার বটতৈল ইউনিয়নের যে চাষিরা সরকারি পাটের বীজ বুনন করে প্রতারিত হয়েছেন। মাঠে কোনে চারা গজায়নি। পাট চাষি আলাউদ্দিন ম-ল অভিযোগ করে বলেন, ‘নিম্নমানের বাতিলকৃত বীজ নতুন করে প্যাকেটে ভরি চাষিদের কাছে দিয়েছে কৃষি অফিস। এই বীজে চারা না গজানোই। আমি এক বিঘি পাটচাষের ভুঁই (জমি) প্রস্তুতে খরচ করেছি ১২ হাজার টাকা। একদিকে আমার একটা বতর (মৌসুম) জমি পাকাল পড়ে থাকল। আবার আমার গাট্যের ট্যেকাও খরচ হইলু। ইর দায় নিবি কিডা?’

বটতৈল ইউনিয়নের সহকারী কৃষি কর্মকর্তা রেজাউল ইসলাম স্বীকার করেছেন, ‘চলতি মৌসুমে বিএডিসির পাটবীজ বিভাগের মাধ্যমে যে বীজ প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে তাতে কাক্সিক্ষত জার্মিনেশন না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন চাষিরা।’

চাষিদের এমন অভিযোগের বিষয়ে আলাপকালে কুষ্টিয়া জেলা বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সির কর্মকর্তা একেএম কামরুজ্জামান বলেন, ‘চাষিরা যাতে গুণগত মানসম্পন্ন বীজ পায় এবং বীজ নিয়ে যাতে প্রতারিত না হয়, সেজন্য বীজ প্রত্যায়ন এজেন্সি কাজ করে। চলতি বছরেও প্রায় ১৭টি ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে বীজ বিক্রয় ও সরবরাহ সংশ্লিষ্টদের বিধি বহির্ভূত কার্যক্রমে যুক্ত থাকায় তাদের বিরুদ্ধে জরিমানাসহ নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে’।

বিএডিসি কুষ্টিয়ার পাটবীজ বিভাগের উপপরিচালক মনিরা খাতুন পাটবীজ বিষয়ের সব অভিযোগকে নাকচ দিয়ে বলেন, ‘বিষয়টি সংশ্লিষ্ট বিভাগের বড় স্যারেরা দেখছেন। আমাদের বীজের গুণগত মান নিয়ে যে অভিযোগ উঠেছে, সেই অভিযোগ দেওয়ার কোনো এখতিয়ার কারও নেই’।

এ বিষয়ে কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসক মো. তৌহিদ বিন হাসান বলেন, ‘এ বছর চাষিদের দেওয়া পাটবীজের সমস্যা কি তা তদন্ত করে প্রতিবেদন দেয়ার জন্য একজন ম্যাজিস্ট্রেটকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালকসহ তদন্ত করা হবে। অভিযোগের সত্যতা পেলে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত